নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তার দায়িত্ব যাদের হাতে, তাদেরই একটি অংশের বিরুদ্ধে উঠেছে ভয়ংকর অভিযোগ। জাতীয় পরিচয়পত্র, মোবাইল সিমের অবস্থান, কল ডিটেইল রেকর্ড (সিডিআর), খুদেবার্তা, পাসপোর্টসহ নাগরিকের নানা গোপন তথ্য সংগ্রহ করে তা বাইরের বিভিন্ন চক্রের কাছে বিক্রি করার অভিযোগে পুলিশের চার সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, সরকারি ইমেইল ব্যবহার করে ভুয়া মামলা ও সাধারণ ডায়েরির (জিডি) তথ্য দেখিয়ে সাধারণ মানুষের সিডিআর সংগ্রহ করতেন তারা। পরে এসব তথ্য বিভিন্ন গ্রুপের কাছে বিক্রি করা হতো। সম্প্রতি তাদের আইনের আওতায় আনা হলেও বিষয়টি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে সামনে আসেনি। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।
সূত্র জানিয়েছে, পুলিশের শনাক্ত সদস্যদের বিরুদ্ধে গত ২৯ সেপ্টেম্বর দণ্ডবিধির তিনটি পৃথক ধারা ও সরকারি গোপন আইনে পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করেছে। তাদের বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাচারের অভিযোগ আনা হয়েছে। গ্রেপ্তার চারজন হলেন—তুরাগ থানার কনস্টেবল জিহাদ মিয়া, ডেমরা থানার সাইমুম হোসেন রাশেদ ও মাসুম মিয়া এবং ওয়ারী থানার নিজাম উদ্দীন।
ঘটনার সূত্র ধরে এখন খোঁজ চলছে এই চক্রে আরও কারা জড়িত এবং কীভাবে তারা নাগরিকের গোপন তথ্য সংগ্রহ ও পাচারের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। রমনা থানায় করা মামলাটির তদন্ত করছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের সাইবার ও অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগ।
মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, সরকারি কর্মচারী হয়েও আসামিরা প্রতারণার মাধ্যমে সিডিআর সংগ্রহ করে সামাজিক মাধ্যমে বিক্রি করেছেন। এভাবে তারা বিশ্বাসভঙ্গ করেছেন এবং আইনগতভাবে যাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়ার সুযোগ ছিল, সেই ক্ষমতার অপব্যবহার করে তথ্য অন্যের কাছে তুলে দিয়েছেন। বেআইনিভাবে নাগরিকের মোবাইল সিম, কললিস্ট, সিডিআর, মোবাইল ফোনের সর্বশেষ অবস্থান, জাতীয় পরিচয়পত্রসহ বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগও আনা হয়েছে।
এজাহার অনুযায়ী, গত ১ সেপ্টেম্বর তুরাগ থানার ওসির সরকারি ইমেইল নম্বর থেকে ১১টি মোবাইল নম্বরের তিন মাসের সিডিআর চেয়ে ডিবির কাছে একটি ইমেইল পাঠানো হয়। ওই আবেদনে তুরাগ থানায় ১৩ জুলাই করা একটি সাধারণ ডায়েরির কথা উল্লেখ করা হয়েছিল।
ওই ইমেইলে অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা ও প্রেরক হিসেবে এএসআই শাহীনুল কবিরের নাম ব্যবহার করা হয়। একই দিনে গ্রামীণফোনের চারটি মোবাইল নম্বরের সিডিআর সংগ্রহ করে ডিবি তা তুরাগ থানায় পাঠায়। কিন্তু পরবর্তী অনুসন্ধানে দেখা যায়, কনস্টেবল জিহাদ মিয়া যে জিডির কথা উল্লেখ করে ১১টি নম্বরের সিডিআর চেয়েছিলেন, সেই তারিখে তুরাগ থানায় এ ধরনের কোনো জিডিই হয়নি।
অর্থাৎ ভুয়া জিডির সূত্র এবং এএসআই শাহীনুল কবিরের নাম ব্যবহার করেই সিডিআর সংগ্রহ করা হয়েছিল। পরে সেই তথ্য বিক্রি করে দেন কনস্টেবল জিহাদ মিয়া।
একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে ডেমরা থানার ক্ষেত্রেও। ২০১৬ সালের ২৮ মে ডেমরা থানার ওসির সরকারি ইমেইল ব্যবহার করে একটি মামলার সূত্র দেখিয়ে চারটি মোবাইল নম্বরের সিডিআর চাওয়া হয়। ওই আবেদনে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও ইমেইল প্রেরক হিসেবে এসআই শাহ আলমের নাম ব্যবহার করা হয়েছিল।
পরবর্তী অনুসন্ধানে জানা যায়, ওই তারিখে ডেমরা থানায় এ ধরনের কোনো মামলাই হয়নি। এমনকি এসআই শাহ আলমও কোনো সিডিআরের তথ্য চাননি। তদন্তে উঠে আসে, কনস্টেবল সাইমুম হোসেন ও মাসুম মিয়া ভুয়া মামলা এবং তদন্ত কর্মকর্তার নাম ব্যবহার করে সিডিআর সংগ্রহ করেছিলেন।
এ ঘটনায় জড়িত পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪২০, ৪০৯ ও ১০৯ ধারা এবং সরকারি গোপন আইনে মামলা হয়েছে। ৪২০ ধারায় অসৎ উদ্দেশ্যে প্রতারণার অভিযোগ, ৪০৯ ধারায় সরকারি কর্মচারী বা ব্যাংকারের অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গ এবং ১০৯ ধারায় অপরাধে প্ররোচনা বা সহায়তার বিষয়টি রয়েছে।
রমনা থানার ওসি ইয়াছিন মিয়া বলেন, সম্প্রতি ডিবির সাইবার ক্রাইম বিভাগ থেকে একটি মামলা হয়েছে। সেটির তদন্তও করছেন তারা। সেই মামলায় অভিযুক্তদের ব্যাপারে তদন্ত সংস্থা বলতে পারবে।
গোয়েন্দা পুলিশের সাইবার ক্রাইম বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, এ ধরনের একটি মামলার তদন্ত তারা করছেন। পুরো চক্রকে তারা বের করার চেষ্টা করছেন। বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। যারা যেভাবে সংশ্লিষ্ট, তাদের সবাইকে আইনে আওতায় আনতে চান তারা। পুরো চক্রকে শনাক্ত করার পর আনুষ্ঠানিকভাবে তারা বিষয়টি গণমাধ্যমকে জানানোর কথা ভাবছেন।
তবে পুলিশের সদস্যদের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ ওঠার আগেই নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্য অনলাইনে কেনাবেচার একটি বড় চিত্র সামনে এসেছিল। তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠান ডিসমিসল্যাবের সাম্প্রতিক অনুসন্ধানে ব্যক্তিগত তথ্য বিক্রিকারী ১০টি সক্রিয় ওয়েবসাইটের সন্ধান পাওয়া যায়। একই সঙ্গে শুধু ফেসবুকেই এক মাসে এ ধরনের ৬০০টির বেশি বিজ্ঞাপন পাওয়া গেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বেশ কিছুদিন ধরে অনলাইনে বিজ্ঞাপন দিয়ে সাধারণ নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্য কেনাবেচা চলছে। নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা দিলেই বিভিন্ন চক্রের কাছ থেকে সিডিআর, পাসপোর্টের তথ্য, রেডিও লোকেশন, আইএমইআই সার্চ তথ্য, সিমের মালিকানা, মোবাইল ব্যাংকিং-সংক্রান্ত তথ্য এবং লেনদেনের বিবরণী পাওয়া যাচ্ছে।
একটি সূত্র বলছে, মামলা বা তদন্তের প্রয়োজনে মোবাইল ফোন অপারেটরের কাছ থেকে নাগরিকের মোবাইল ফোন ব্যবহারের তথ্য নিতে পারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। বিভিন্ন মামলার রহস্য উদ্ঘাটনে সন্দেহভাজনদের সিডিআর বিশ্লেষণ করে ক্লু খোঁজা হয়। এ ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অনেক কর্মকর্তা তদন্তের প্রয়োজনে মোবাইল ফোন অপারেটরের কাছে তথ্য চেয়ে যে ইমেইল বা চিঠি পাঠান, তা অধস্তন সদস্যরা করে থাকেন।
নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্য টাকার বিনিময়ে বাইরে পাচার করা ব্যক্তিরা কীভাবে এসব প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন, তা এখন গভীরভাবে অনুসন্ধান করা হচ্ছে।
এর আগে গত ১৩ সেপ্টেম্বর স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)-২ নাগরিকের তথ্য কেনাবেচায় জড়িত একটি চক্রের সন্ধান পাওয়ার কথা জানায়। তখন র্যাব পাঁচজনকে গ্রেপ্তারের কথা জানিয়েছিল। তারা হলেন আব্দুস সালাম সরকার, সুব্রত চন্দ্র পাল, ইসমাইল হোসেন সোহাগ, এসএম নাফি ও মো. মেহেদী হাসান। র্যাব জানিয়েছিল, ওই সময় পর্যন্ত ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কারও যোগসাজশ পাওয়া যায়নি। এ ঘটনায় পাঁচটি মামলা করা হয়।
এসআরবির অধিনায়ক অতিরিক্ত ডিআইজি নয়মুল হাসান তখন বলেছিলেন, সরকারি সার্ভার থেকে কারা অর্থের বিনিময়ে তথ্য ফাঁস করেছে, তদন্তের স্বার্থে তা প্রকাশ করা যাচ্ছে না। তবে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে একজন নির্বাচন কমিশনে চুক্তিভিত্তিক কাজ করতেন। সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে তিনি এসব কাজ করে থাকতে পারেন।
এসআরবি জানায়, অনলাইনে বিজ্ঞাপন দিয়ে গ্রাহক সংগ্রহ করা হতো। এরপর নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকার বিনিময়ে নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্য বিক্রি করা হতো। ডার্কওয়েবে নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্য বিক্রির বিষয়টি জানার পর এসব তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কাজ শুরু করে র্যাব। প্রাথমিকভাবে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় বিভিন্ন লিংক ও ওয়েবসাইটে প্রবেশ করে কারা এবং কীভাবে নাগরিকদের তথ্য অনলাইনে বিক্রি করছে, তা শনাক্ত করা হয়।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের বরাত দিয়ে এসআরবি জানায়, নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্য অনলাইনে বিক্রির উদ্দেশ্যে আব্দুস সালাম সরকার ‘ই-সেবা২৪ডটটপ’ নামে একটি এনক্রিপ্টেড ওয়েবসাইট তৈরি করেন। সেখানে অর্ডার করার পর নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকার বিনিময়ে বিভিন্ন ধরনের তথ্য গ্রাহকের কাছে পৌঁছে দেওয়া হতো।
আব্দুস সালাম সরকার ও তার পরিচিত কয়েকজন ‘ই-সেবা২৪ডটটপ’ ওয়েব পেজ এবং বিভিন্ন হোয়াটসঅ্যাপ ও টেলিগ্রাম গ্রুপের মাধ্যমে মোবাইল সিমের সর্বশেষ কলের অবস্থান, রেডিও লোকেশন, আইএমইআই সার্চ তথ্য, কল ডিটেইল রেকর্ড, সিমের মালিকানা-সংক্রান্ত তথ্য, মোবাইল ব্যাংকিং বিকাশ ও নগদ নিবন্ধন-সংক্রান্ত তথ্য এবং লেনদেনের বিবরণী বিক্রি করতেন।
এসআরবি জানায়, চলতি বছরের এপ্রিলেই ওয়েবসাইটটি তৈরি করা হয়। সালাম নিজেই ওয়েবসাইটটির প্রশাসক ছিলেন। ২০১৮ সাল থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন অফিসে অস্থায়ী ভিত্তিতে বিভিন্ন কাজে নিয়োজিত ছিলেন তিনি।
অন্যদিকে গ্রেপ্তার সুব্রত, ইসমাইল, নাফি ও মেহেদী ফেসবুক মার্কেটপ্লেস ও বিভিন্ন ফেসবুক পেজে বিজ্ঞাপন দেওয়ার পাশাপাশি হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে অর্ডার সংগ্রহ করতেন। এরপর নাগরিকদের গোপনীয় তথ্য বিক্রি করতেন তারা।
গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যায় যোগাযোগ করা হলে এসআরবি-২ এর অধিনায়ক ও অতিরিক্ত ডিআইজি নয়মুল হাসান বলেন, নাগরিকের তথ্য বিক্রির সঙ্গে আরও কারা কীভাবে যুক্ত– তা বের করতে আমরা কাজ করছি। সাইবার অপরাধ প্রতিরোধে আমরা আগের চেয়ে তৎপর।
দেশের চারটি মোবাইল ফোন অপারেটরে ১৯ কোটির কিছু বেশি গ্রাহক রয়েছেন। সর্বশেষ ২০২২ সালের বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর জনশুমারি ও গৃহগণনার তথ্য অনুযায়ী, দেশে পাঁচ বছরের বেশি বয়সীদের ৫৬ শতাংশ মোবাইল ফোন ব্যবহার করেন। এসব ফোনে ব্যবহারকারীদের কল ও খুদেবার্তার তথ্য মোবাইল অপারেটরগুলো সংরক্ষণ করে। আইনগত বাধ্যবাধকতার কারণেই তারা এসব তথ্য সংরক্ষণ করে থাকে। সিডিআরে এসব তথ্য জমা থাকে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থাসহ ১২টি সংস্থা মোবাইল অপারেটরদের তথ্যভান্ডার ব্যবহারের সুযোগ পায়। তবে সিডিআরে হোয়াটসঅ্যাপ, সিগন্যাল, টেলিগ্রামসহ মোবাইল ফোনের বিভিন্ন অ্যাপের তথ্য পাওয়া যায় না।
সূত্র: সমকাল
পড়ুন: বিমান বহরে আসছে আরও ১০ উড়োজাহাজ, এয়ারবাসের সঙ্গে চুক্তি আজ
আর/


