দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর জোট আসিয়ানের বিশাল বাজারে বাংলাদেশের প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্যের সম্ভাবনা থাকলেও সেই বাজারে এখনো শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারেনি দেশের রপ্তানিকারকরা। ৬৮ কোটির বেশি মানুষের এই অঞ্চলে খাদ্যপণ্যের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। ভোক্তাদের স্বাদ, খাদ্যাভ্যাস ও চাহিদার সঙ্গে বাংলাদেশের বিভিন্ন খাদ্যপণ্যেরও যথেষ্ট সামঞ্জস্য রয়েছে। ফলে সঠিক পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি থাকলে আসিয়ান হয়ে উঠতে পারে বাংলাদেশের খাদ্যপণ্য রপ্তানির বড় গন্তব্য।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর মানুষের ক্রয়ক্ষমতা তুলনামূলক বেশি। একই সঙ্গে প্রক্রিয়াজাত ও প্যাকেটজাত খাবারের ব্যবহারও দিন দিন বাড়ছে। দ্রুত নগরায়ণ, আধুনিক জীবনযাত্রা, দ্বৈত আয়ের পরিবারের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং ব্যস্ত কর্মজীবী মানুষের কারণে সহজে প্রস্তুত ও দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করা যায়—এমন খাবারের চাহিদা তৈরি হয়েছে। আর এখানেই বাংলাদেশি খাদ্যপণ্যের জন্য বড় বাজার তৈরির সুযোগ দেখছেন ব্যবসায়ীরা।
উৎপাদন ব্যয়ের দিক থেকেও বাংলাদেশ কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে বলে মনে করেন তারা। অনেক প্রতিযোগী দেশের তুলনায় দেশে শ্রমিক সহজলভ্য এবং শ্রমব্যয়ও তুলনামূলক কম। ফলে আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে উৎপাদন করা গেলে দামের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশি খাদ্যপণ্য প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান তৈরি করতে পারে।
তবে সম্ভাবনার পাশাপাশি আসিয়ান বাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে বেশ কিছু বাধাও রয়েছে। পণ্যের মান, আন্তর্জাতিক সনদ, প্যাকেজিং, খাদ্যনিরাপত্তা এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর আমদানি নীতিমালা যথাযথভাবে মেনে চলতে হবে। এসব ক্ষেত্রে সক্ষমতা বাড়ানো গেলে আসিয়ান বাংলাদেশের প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্য রপ্তানির বড় বাজার হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তথ্য বলছে, আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোতে খাদ্য ও পানীয়ের বাজারের আকার প্রায় ৬৫০ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে শুধু প্যাকেটজাত খাদ্যের বাজারই প্রায় ২০০ বিলিয়ন ডলারের। মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ায় হালাল খাদ্যের বাজারও ১০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি।
আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর ভোক্তাদের মধ্যে নুডলস, পাস্তা, স্যুপ, স্ন্যাকস, বিভিন্ন ধরনের হিমায়িত খাদ্য, বিস্কুট, চানাচুর, জুস ও পানীয়ের চাহিদা রয়েছে। এসব দেশ প্রতি বছর চীন, ভারতসহ আশপাশের বিভিন্ন দেশ থেকে বিপুল পরিমাণ খাদ্যপণ্য আমদানি করে।
আসিয়ানের দেশগুলোর মধ্যে মালয়েশিয়ার বাজারে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠান প্রাণ ইতোমধ্যে ভালো অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। সরাসরি রপ্তানির পাশাপাশি দেশটির পরিবেশক পিনাকল ফুডসের মাধ্যমে প্রাণের পণ্য বাজারজাত করা হচ্ছে।
গত অর্থবছরে মালয়েশিয়ায় প্রায় ২০ মিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে প্রাণ। ফিলিপাইন, ভিয়েতনাম ও ব্রুনাইসহ আসিয়ানের অন্য দেশগুলোতেও প্রতিষ্ঠানটির পণ্য যাচ্ছে। তবে এসব দেশে রপ্তানির পরিমাণ এখনো তুলনামূলক কম। সব মিলিয়ে আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোতে প্রাণের রপ্তানি প্রায় ৩০ মিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি।
পিনাকল ফুডসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ সেলিম ভূঁইয়া বলেন, ‘প্রাণের বড় লক্ষ্য আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোতে বড় বাজার তৈরি করা। আগামী পাঁচ বছরে আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোতে বাংলাদেশ থেকে ১০০ মিলিয়ন ডলারের বেশি পণ্য রপ্তানি করতে চায় প্রাণ গ্রুপ। সেক্ষেত্রে সম্ভাবনাময় বাজার হিসেবে ফিলিপাইন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, কম্বোডিয়া ও সিঙ্গাপুরকে টার্গেট করে এগোচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। এসব দেশে ডিস্ট্রিবিউটরশিপ খুঁজে তাদের মাধ্যমে প্রাণ ব্র্যান্ডের প্রসার ঘটাতে কাজ করছে।’
ব্যবসায়ীদের মতে, সম্ভাবনাময় এই বাজারে প্রবেশের পথে অন্যতম বড় বাধা হচ্ছে উচ্চ শুল্কহার। এর সঙ্গে রয়েছে বাংলাদেশি হালাল সনদের গ্রহণযোগ্যতার প্রশ্ন। এসব প্রতিবন্ধকতা সরকারি পর্যায়ে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া গেলে আসিয়ান অঞ্চলে কয়েক বিলিয়ন ডলারের খাদ্যপণ্য রপ্তানির সুযোগ তৈরি হতে পারে।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (বিএমসিসিআই) সভাপতি মো. আনোয়ার শহীদ বলেন, ‘আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোতে রপ্তানির প্রধান প্রতিবন্ধকতা সেখানে বাংলাদেশের সঙ্গে কোনো চুক্তি না থাকা। এ কারণে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে বড় শুল্ক দিয়ে পণ্য প্রবেশ করাতে হয়। এতে প্রতিযোগিতা সক্ষমতায় বাংলাদেশি পণ্য ভারত কিংবা অন্যদের থেকে পিছিয়ে পড়ছে। ভারতের সঙ্গে আসিয়ানভুক্ত দেশে বিনা শুল্কে পণ্য পাঠানোর জন্য চুক্তি রয়েছে। ফলে তারা এসব বাজারে ব্যাপক ভালো করছে।’
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আসিয়ানের সদস্যপদ অর্জন করতে পারলে বাংলাদেশের সামনে বড় ধরনের সুযোগ তৈরি হতে পারে। এ কারণে সরকারকে বিষয়টিতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করার পরামর্শ দিচ্ছেন তারা। তবে সদস্যপদ অর্জনের প্রক্রিয়া সময়সাপেক্ষ হওয়ায় দেশের অর্থনীতির স্বার্থে আসিয়ান জোট কিংবা এর সদস্য দেশগুলোর সঙ্গে আলাদা বাণিজ্য চুক্তির উদ্যোগ নেওয়ার কথাও বলছেন তারা।
এ ক্ষেত্রে ফ্রি ট্রেড এগ্রিমেন্ট (এফটিএ) কিংবা কম্প্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ এগ্রিমেন্ট (সিইপিএ) হতে পারে কার্যকর সমাধান বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ব্রুনাই ও সিঙ্গাপুরে হালাল পণ্যের বড় বাজার রয়েছে। এসব দেশে খাদ্যপণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে হালাল সনদ গুরুত্বপূর্ণ। প্রাণ বর্তমানে মালয়েশিয়ার জন্য জাকিম হালাল, ইন্দোনেশিয়ার জন্য মজলিস উলামা ইন্দোনেশিয়া (মুই) হালাল, বিপিজেপিএই এবং ভারতের হালাল বোর্ডের মাধ্যমে সনদ নিয়ে পণ্য রপ্তানি করছে।
তবে এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করে সনদ নেওয়া সময়সাপেক্ষ এবং ব্যয়বহুল। মালয়েশিয়ার জন্য প্রাণ অনেক পণ্যের সনদ নিতে সক্ষম হলেও তা এখনো প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। ইন্দোনেশিয়াতেও স্বল্প পরিমাণ পণ্য রপ্তানি শুরু হয়েছে।
শুধু প্রাণ নয়, আসিয়ানের বিভিন্ন দেশের বাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে ছোট-বড় অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোকেও একই ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। অলিম্পিক ইন্ডাস্ট্রিজের হেড অব এক্সপোর্ট দেবাশীষ সিংহ বলেন, হালাল সনদসহ অন্য সনদ আন্তর্জাতিক মানের হলে শুধু হালাল মার্কেট নয়, আসিয়ানসহ ইউরোপ-আমেরিকার বাজারেও খাদ্যপণ্য রপ্তানি প্রচুর বাড়বে।’
সংশ্লিষ্টদের মতে, এ ক্ষেত্রে সরকার একটি হালাল বোর্ড গঠন করে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ হালাল সংস্থার সঙ্গে সহযোগিতার মাধ্যমে সনদ দেওয়ার ব্যবস্থা করতে পারে। এতে বাংলাদেশের সনদ আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
একই সঙ্গে সরকারের সনদায়নের সঙ্গে যুক্ত দুটি আলাদা কর্তৃপক্ষ বিএসটিআই ও ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়ার কথাও বলছেন তারা। জনবল, পরীক্ষাগারসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামো শক্তিশালী করার পাশাপাশি রপ্তানিমুখী শিল্পগুলোর জন্য সনদ পাওয়ার প্রক্রিয়া সহজ ও সময়সাশ্রয়ী করা জরুরি।
আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী প্রশিক্ষণ ও অবকাঠামোগত সক্ষমতা বাড়ানো গেলে বাংলাদেশের প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্যের জন্য আসিয়ানের বিশাল বাজারে প্রবেশের সুযোগ আরও বাড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সূত্র: জাগো নিউজ
পড়ুন: নাগরিকের ব্যক্তিগত-গোপন তথ্য বিক্রি করছে পুলিশের চক্র
আর/


