তরুণ প্রজন্মের জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী তাসরিফ খানের কণ্ঠ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে নকল করে তৈরি করা হয়েছে একটি গান। সেই গানের সঙ্গে তাসরিফ খানের একটি কনসার্টের ভিডিও ফুটেজ জুড়ে দিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। ‘আই হ্যাভ আ প্ল্যান’ শিরোনামের ওই অডিও-ভিডিও এরই মধ্যে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ভাইরাল হয়েছে। ভিডিওটি ঘিরে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে শুরু হয়েছে নানা আলোচনা ও সমালোচনা।
তবে ভাইরাল হওয়া এই কনটেন্ট নিয়ে সরব হয়েছেন তাসরিফ খান নিজেই। তার অভিযোগ, কোনো ধরনের অনুমতি ছাড়াই তার কণ্ঠ ও কনসার্টের ভিডিও ব্যবহার করে কনটেন্টটি তৈরি করা হয়েছে। শুধু বিনোদনের উদ্দেশ্যে এটি তৈরি করা হয়নি; বরং তাকে হয়রানি এবং বিভ্রান্ত করার উদ্দেশ্যেই পরিকল্পিতভাবে ভিডিওটি তৈরি ও ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে বলে মনে করছেন তিনি।
মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) বিষয়টি নিয়ে নিজের অবস্থান জানান এই সংগীতশিল্পী। তিনি দাবি করেন, ভাইরাল হওয়া গানটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে তৈরি করা হয়েছে—এ বিষয়ে তিনি প্রায় নিশ্চিত। এ ঘটনায় শিগগিরই আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও জানিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে একটি সাধারণ ডায়েরি বা জিডি করার প্রস্তুতির কথাও জানান তাসরিফ।
ভাইরাল গানটির বিষয়ে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করে তাসরিফ খান বলেন, তিনি ৯৯ দশমিক ৯৯ শতাংশ নিশ্চিত যে গানটি এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে তৈরি করা হয়েছে। তার মতে, এটি কোনো শিল্পীর প্রকৃত কম্পোজিশন হওয়ার সম্ভাবনা নেই।
তাসরিফের অভিযোগ, তার কোনো কনসার্টের ভিডিও ফুটেজ সংগ্রহ করে সেটির সঙ্গে এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে তৈরি করা অডিও যুক্ত করা হয়েছে। এরপর অডিও ও ভিডিও মিলিয়ে একটি নতুন কনটেন্ট তৈরি করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
তার দাবি, পুরো বিষয়টি নিছক মজা বা বিনোদনের জন্য করা হয়নি। বরং উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তাকে হয়রানি করার লক্ষ্যেই এমনটি করা হয়েছে। এতে তার ব্যক্তিগত ও পেশাগত ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলেও মনে করছেন তিনি।
ভাইরাল ভিডিওটির পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থাকতে পারে বলেও সন্দেহ প্রকাশ করেছেন তাসরিফ খান। তার দাবি, ভিডিওটিতে সরকারকে নিয়ে মানহানিকর মন্তব্যের সঙ্গে তার ছবি ও কনসার্টের ফুটেজ ব্যবহার করা হয়েছে।
তাসরিফের ভাষ্য অনুযায়ী, এভাবে একই কনটেন্টের মাধ্যমে একদিকে সরকারকে বিতর্কিত করার চেষ্টা করা হয়েছে, অন্যদিকে তার ছবি ও ভিডিও ব্যবহার করে তাকে সেই বিতর্কের সঙ্গে জড়িয়ে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছে।
তিনি বলেন, তার কাছে মনে হয়েছে, ‘এক ঢিলে দুই পাখি’ মারার চেষ্টা করা হয়েছে। অর্থাৎ, একই ভিডিওর মাধ্যমে সরকারকে হেয় করার পাশাপাশি তার ভাবমূর্তিতেও আঘাত করার চেষ্টা করা হয়েছে।
শুরুতে বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন বলেও জানান তাসরিফ। কিন্তু পরে দেখতে পান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের শতাধিক পেজে ভিডিওটি আপলোড করা হয়েছে। ফলে বিষয়টি আর উপেক্ষা করার সুযোগ নেই বলে মনে করছেন তিনি।
ভাইরাল ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে সরিয়ে ফেলার জন্য শুরুতে প্রচলিত কনটেন্ট রিপোর্টিং ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতে চেয়েছিলেন তাসরিফ খান। তবে বিভিন্ন পেজ থেকে ভিডিওটি আপলোড হওয়ায় সেই প্রক্রিয়ায় কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাচ্ছে না বলে জানিয়েছেন তিনি।
একটি ভিডিও একাধিক পেজ থেকে ছড়িয়ে পড়ায় প্রতিটি কনটেন্ট আলাদাভাবে রিপোর্ট করা এবং সেগুলো সরানোর প্রক্রিয়া সময়সাপেক্ষ হয়ে উঠেছে। ফলে শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অভ্যন্তরীণ রিপোর্টিং ব্যবস্থার ওপর নির্ভর না করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এই গায়ক।
এ কারণে একটি সাধারণ ডায়েরি করার পাশাপাশি বিষয়টি আইনিভাবে মোকাবিলা করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে জানিয়েছেন তিনি। তার লক্ষ্য, ভিডিওটির প্রচার বন্ধ করা এবং অনুমতি ছাড়া তার কণ্ঠ ও ভিডিও ব্যবহার করে এমন কনটেন্ট তৈরির সঙ্গে যারা জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিকাশের ফলে বর্তমানে কারও কণ্ঠ, ছবি বা ভিডিও ব্যবহার করে নতুন কনটেন্ট তৈরি করা আগের তুলনায় অনেক সহজ হয়েছে। বিশেষ করে এআইভিত্তিক ভয়েস ক্লোনিং প্রযুক্তির মাধ্যমে কোনো ব্যক্তির কণ্ঠস্বরের অনুরূপ কণ্ঠ তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে।
এর ফলে বিনোদন ও সৃজনশীলতার পাশাপাশি ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, কপিরাইট, পরিচয় ও সম্মতির মতো বিষয়গুলো নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠছে। কোনো ব্যক্তির অনুমতি ছাড়া তার কণ্ঠ ব্যবহার করে গান, বক্তব্য বা অন্য কোনো অডিও তৈরি করা হলে সেটির আইনগত ও নৈতিক দায় কার—তা নিয়েও বিভিন্ন মহলে আলোচনা চলছে।
তাসরিফ খানের ঘটনাটিও সেই বিতর্ককে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। বিশেষ করে একটি পরিচিত শিল্পীর প্রকৃত কণ্ঠের আদলে এআই দিয়ে অডিও তৈরি করে তার কনসার্টের ভিডিওর সঙ্গে জুড়ে দেওয়ার অভিযোগ বিষয়টিকে আরও গুরুত্বের সঙ্গে দেখার প্রয়োজন তৈরি করেছে।
এদিকে ভাইরাল হওয়া ভিডিওটির প্রকৃত উৎস, কারা এটি তৈরি করেছে এবং কী উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছে—এসব বিষয়ে এখনো বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ্যে আসেনি। তাসরিফ খান আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানানোয় বিষয়টি ভবিষ্যতে তদন্তের আওতায় আসতে পারে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়া কনটেন্টের ক্ষেত্রে যাচাই না করে তা শেয়ার না করার আহ্বানও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে তৈরি কণ্ঠ, ছবি বা ভিডিও অনেক সময় বাস্তব কনটেন্টের মতো দেখাতে বা শুনতে পারে।
তাসরিফ খানের অভিযোগের সত্যতা ও ভিডিওটির পেছনে কারা রয়েছেন, তা আইনগত প্রক্রিয়া ও তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট হতে পারে। তবে এই ঘটনা আবারও দেখিয়ে দিল, প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে ব্যক্তির কণ্ঠ, ছবি ও পরিচয়ের অননুমোদিত ব্যবহারের ঝুঁকিও বাড়ছে।
পড়ুন:১৫ বছর পর শাহরুখের সঙ্গে পর্দায় ফিরছেন কারিনা
ইমি/


