টাকা ছাড়া যেখানে আজকের দিনে পড়াশোনা কল্পনা করা যায় না, সেখানে গত ৫ দশকেরও বেশি সময় ধরে মাত্র ১ টাকার বিনিময়ে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষার আলো বিলিয়ে যাচ্ছেন গাইবান্ধার ৮০ বছরের প্রবীণ শিক্ষক মোঃ লুৎফর রহমান। স্থানীয়দের কাছে তিনি পরিচিত ‘এক টাকার মাস্টার’ নামে। নিঃস্বার্থ এই আত্মত্যাগের স্বীকৃতিস্বরূপ অবশেষে বিশ্ব শিক্ষক দিবস ২০২৬-এ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হাত থেকে রাষ্ট্রীয় বিশেষ সম্মাননা, ২ লাখ টাকার চেক, ক্রেস্ট ও সম্মাননাপত্র গ্রহণ করেছেন এই গুণী শিক্ষক।
১৯৭২ সালে ম্যাট্রিক পাস করলেও চরম দারিদ্র্য ও অর্থের অভাবে কলেজে পড়তে পারেননি লুৎফর রহমান। ১৯৭৪ সালের ভয়াবহ বন্যায় ভিটামাটি হারিয়ে তিনি আশ্রয় নেন ওয়াপদা বাঁধের পাশের এক টুকরো টিনের ঘরে। জীবনে উচ্চশিক্ষার সেই ‘না পাওয়ার কষ্ট’ আজও তাঁর অন্তরে দাগ কেটে আছে। আর সেখান থেকেই তিনি প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, টাকার অভাবে এলাকার কোনো শিশুর পড়াশোনা যেন মাঝপথে থেমে না যায়।
এরপর ১৯৭৪ সাল থেকেই শুরু হয় তাঁর এই মহৎ ব্রত। আজ অবধি ৩ থেকে ৪ বার নদীভাঙনের শিকার হয়ে তিনি বর্তমানে বসবাস করছেন গাইবান্ধা সদর উপজেলার ১১ নং উত্তর গিদারী ইউনিয়নের বাঘুরিয়া গ্রামের বাঁধের নিচে। চরম দারিদ্র্যকে সঙ্গী করে এবং পরিবারের কষ্ট সহ্য করেও তিনি তাঁর এই মহান আদর্শ থেকে সরে দাঁড়াননি।
কখনও গাছের নিচে, কখনও রাস্তার পাশে, আবার কখনও বাঁধের ওপর বসে চলে তাঁর ক্লাস। প্রতিদিন ভোরে পুরোনো সাইকেলে চড়ে কিংবা হেঁটে ঘুরে বেড়ান শিশুদের বাড়ি বাড়ি। বর্তমানে সকাল ও বিকাল দুই শিফটে তিনি প্রায় শতাধিক প্রাথমিক ও শিশু শ্রেণীর শিশুকে পড়াচ্ছেন। মাস শেষে সব মিলিয়ে প্রতিটি শিক্ষার্থীর কাছ থেকে পান মাত্র ১ টাকা করে (অর্থাৎ মাসিক মাত্র ৩০ টাকা) সামান্য এই আয়েই চলে তাঁর জীবনসংগ্রাম।
প্রাতিষ্ঠানিক কোনো স্কুলের শিক্ষক না হয়েও লুৎফর রহমানের হাত ধরে পড়ালেখা শিখে বহু শিশু আজ সমাজে প্রতিষ্ঠিত। তাঁর শিক্ষা পেয়ে অনেকে হয়েছেন জজ, ব্যারিস্টার, ডাক্তার ও সরকারি বিভিন্ন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। অনেকে আবার শিক্ষকতার মতো মহৎ পেশায় নিয়োজিত থেকে দেশসেবা করে যাচ্ছেন।
বিশ্ব শিক্ষক দিবস উপলক্ষে গত সোমবার (৫ অক্টোবর ২০২৬) রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে দেশের সেরা ১০২ জন শিক্ষকের একজন হিসেবে লুৎফর রহমানকে এই সম্মাননা জানানো হয়। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হাত থেকে তিনি সম্মাননা গ্রহণ করেন।
সবচেয়ে আনন্দের খবর হলো, প্রাতিষ্ঠানিকভাবে স্কুলের শিক্ষক না হয়েও তাঁকে সরকারি অবসর ভাতার আওতাভুক্ত করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
বড় কোনো পরিবর্তনের জন্য সবসময় বিশাল সম্পদের প্রয়োজন হয় না, কেবল একটি বড় হৃদয়ের প্রয়োজন হয় লুৎফর রহমান সেটিই প্রমাণ করে দিলেন। রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তাঁকে এই সম্মান জানানোর মধ্য দিয়ে যেন পুরো শিক্ষক সমাজ ও সততাকেই সম্মানিত করা হলো।
পড়ুন: ল্যাবকর্মীর মৃত্যু ঘিরে প্লেগ আতঙ্ক, ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা কতটা


