তাজমিন হত্যা মামলায় সিএনজিচালক সুমন গ্রেপ্তার, রহস্য উদ্‌ঘাটনে তদন্ত

কুমিল্লার লালমাইয়ে ফসলি জমি থেকে উদ্ধার হওয়া সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী জান্নাতুল তাজমিন হত্যা মামলায় সুমন নামে এক সিএনজিচালককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। শুক্রবার (৯ অক্টোবর) চট্টগ্রাম নগরী থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। নিহত কিশোরীকে বহনকারী সিএনজিচালিত অটোরিকশাটির চালক তিনি বলে জানিয়েছে পুলিশ।

বিজ্ঞাপন

কুমিল্লার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (মিডিয়া) লুৎফর রহমান গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে পুলিশের একাধিক দল অভিযান চালিয়ে সুমনকে গ্রেপ্তার করে। তাকে নিয়ে পুলিশ কুমিল্লার উদ্দেশে রওনা হয়েছে। সেখানে পৌঁছানোর পর সংবাদ সম্মেলন করে বিস্তারিত জানানো হবে।

১৫ বছর বয়সী তাজমিনের মরদেহ বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) সকালে লালমাই উপজেলার জগতপুর এলাকার একটি ধানক্ষেত থেকে উদ্ধার করা হয়। তার গলায় গামছা প্যাঁচানো ছিল। এ ঘটনায় তাজমিনের বাবা আবদুল আলীম বাদী হয়ে লালমাই থানায় অজ্ঞাতপরিচয় আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন।

সিসিটিভিতে বাস থেকে নামার দৃশ্য

তাজমিনের মৃত্যুর আগের রাতে পদুয়ার বাজারের নূরজাহান হোটেলের সামনে তার চলাচলের একটি সিসিটিভি ফুটেজ পাওয়া গেছে। এতে দেখা যায়, বুধবার (৭ অক্টোবর) রাত পৌনে ১২টার দিকে কক্সবাজার থেকে আসা আইকনিক পরিবহনের একটি বাস থেকে নামে সে।

বাস থেকে নেমে হোটেল নূরজাহানের পশ্চিম পাশে কয়েকটি স্টেশনারি দোকানের দিকে এগিয়ে যায় তাজমিন। একটি দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে দোকানির সঙ্গে কথাও বলে। এ সময় দোকানিকে তাকে কিছু দেখাতে বা কোনো দিকনির্দেশনা দিতে দেখা যায়।

ফুটেজে আরও দেখা যায়, রাত ১২টার দিকে দোকানের সামনে কিছু একটা দেখানোর পর সেখান থেকে অন্য পাশে সরে যায় তাজমিন। পরে রাত সোয়া ১২টার দিকে তাকে নূরজাহান হোটেল এলাকা ছেড়ে যেতে দেখা যায়।

তবে ওই এলাকা ছাড়ার পর সে কোন পথে গিয়েছিল, কারও সঙ্গে দেখা হয়েছিল কি না কিংবা কীভাবে ঘটনাস্থলে পৌঁছেছিল, তা এখনও নিশ্চিত হতে পারেনি পুলিশ। এসব বিষয় খতিয়ে দেখতে সিসিটিভি ফুটেজ ও অন্যান্য তথ্য বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।

বাবাকে পাঠিয়েছিল লাইভ লোকেশন

নিহত তাজমিন যশোর সদর উপজেলার চুড়ামনকাটি ইউনিয়নের ছাতিয়ানতলা গ্রামের আবদুল আলীমের মেয়ে। বাবার চাকরির কারণে পরিবারের সঙ্গে কুমিল্লা নগরীর রেসকোর্স এলাকার একটি ভাড়া বাসায় থাকত সে। কুমিল্লার ফরিদা বিদ্যায়তনের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল তাজমিন।

গত ৪ অক্টোবর বান্ধবীর বাসায় যাওয়ার কথা বলে বাড়ি থেকে বের হয় সে। পরে পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে জানা যায়, প্রথমে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় গিয়ে পরদিন কুমিল্লায় ফেরে তাজমিন। এরপর কক্সবাজারের উদ্দেশে রওনা হয়। ৭ অক্টোবর সেখান থেকে বাসে করে কুমিল্লায় ফেরার পথে পদুয়ার বাজারে নামে সে।

তাজমিনের বাবা আবদুল আলীম জানান, বুধবার গভীর রাতে মেয়ে তাকে মুঠোফোনে বার্তা পাঠানোর পাশাপাশি লাইভ লোকেশন শেয়ার করে। সেখানে গিয়ে তাকে নিয়ে আসতে বলেছিল তাজমিন। কিন্তু তখন ঘুমিয়ে থাকায় বার্তাটি দেখতে পারেননি তিনি। সকালে বার্তা দেখে লোকেশন অনুযায়ী সেখানে গিয়ে মেয়ের মরদেহ উদ্ধারের বিষয়টি জানতে পারেন।

আবদুল আলীমের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই রাতে তিনি মেয়েকে একাধিকবার ফোন করেছিলেন। তবে তাজমিন ফোন ধরেনি বলে তাদের মধ্যে কথা হয়নি।

পরিত্যক্ত অটোরিকশা ও ধানক্ষেতে ধস্তাধস্তির চিহ্ন

স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার সকালে কাঁচিকাটা-হরিশ্চর বাজার সড়কের জগতপুর উত্তরপাড়ার মানুমুড়া এলাকায় একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা যায়। পরে সড়ক থেকে প্রায় ৫০ গজ দূরে ফসলি জমির আইলের পাশে এক কিশোরীর মরদেহ দেখতে পান স্থানীয়রা। তার গলায় গামছা প্যাঁচানো ছিল এবং মুখ মাটির দিকে ছিল।

স্থানীয় বাসিন্দা তমাল বনিক জানান, পরিত্যক্ত অটোরিকশাটি দেখে স্থানীয়দের সন্দেহ হয়। পরে আশপাশে খোঁজ করতে গিয়ে ধানক্ষেতে মরদেহটি পাওয়া যায়।

আরেক স্থানীয় বাসিন্দা রুহুল আমিনের দাবি, অটোরিকশাটির ২০ থেকে ৩০ গজ দূরে একটি ভ্যানিটি ব্যাগ পড়ে ছিল। আশপাশের ধানক্ষেতে ধানগাছ এলোমেলো অবস্থায় দেখে ধস্তাধস্তির চিহ্ন রয়েছে বলে মনে হয়েছে তার। পরে তিনি জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বরে ফোন করে পুলিশকে খবর দেন।

জহিরুল ইসলাম নামের আরেক বাসিন্দাও ধানক্ষেতে ধস্তাধস্তির আলামত দেখেছেন বলে জানান। এ ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন তিনি।

ঘটনাস্থলের আশপাশের কয়েকটি ধানক্ষেতে ধানগাছ এলোমেলো অবস্থায় পাওয়া গেছে। তবে এসব চিহ্নের সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হতে হবে।

অটোরিকশা থেকে ব্যাগ ও জামা উদ্ধার

সদর দক্ষিণ সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার মোস্তাইন বিল্লাহ ফেরদৌস জানান, ঘটনাস্থলের কাছ থেকে জব্দ করা সিএনজিচালিত অটোরিকশার ভেতরে একটি ভ্যানিটি ব্যাগ ও জামা পাওয়া গেছে। জামাটি দেখে তাজমিনের বাবা সেটি তাঁর মেয়ের বলে শনাক্ত করেন।

তিনি জানান, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, গলায় গামছা প্যাঁচিয়ে তাজমিনকে হত্যা করা হয়েছে। তবে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন প্রয়োজন।

লালমাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মিজানুর রহমান জানান, প্রথমে মরদেহটির পরিচয় শনাক্ত করা যায়নি। পরে পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

কুমিল্লার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) পঙ্কজ বড়ুয়াও জানান, তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে। তদন্তের অংশ হিসেবে সিসিটিভি ফুটেজ, অটোরিকশা এবং অন্যান্য আলামত যাচাই করা হচ্ছে।

পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেপ্তার সুমনকে কুমিল্লায় নেওয়ার পর এ বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হবে। হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা এবং ঘটনার পুরো বিবরণ তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে।

পড়ুন : শান্তিতে নোবেল পেলেন মানবাধিকার কর্মী নাভি পিল্লাই

সা/

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন