বেচাকেনা ভালো, তবু লোকসানে কাইকারটেকের বাঁশ ব্যবসায়ীরা

হাটে বাঁশের বেচাকেনা চলছে, ক্রেতাও আসছেন নিয়মিত। সপ্তাহের একটি দিন নয়, বছরের পর বছর সপ্তাহজুড়েই চলে এই ব্যবসা। এই ব্যবসার আয়েই কেউ গড়েছেন পাকা বাড়ি, বিয়ে দিয়েছেন মেয়েদের, আবার কারও সংসারের চাকা ঘুরছে বাপ-দাদার রেখে যাওয়া পেশায়। অথচ সেই ব্যবসায় এখন আর আগের মতো লাভ নেই। জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বেচাকেনা ভালো থাকার পরও লোকসান গুনছেন নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ের ঐতিহ্যবাহী কাইকারটেক হাটের বাঁশ ব্যবসায়ীরা।

রোববার (১১ অক্টোবর) সাপ্তাহিক হাটে গিয়ে দেখা যায়, বাঁশের বেচাকেনা চলছে বেশ ভালোই। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে বাঁশ কিনতে আসছেন ব্যবসায়ীরা। কিন্তু হাটে বেচাকেনার এই চিত্রের আড়ালে রয়েছে পরিবহন খরচের চাপ, বাঁশের সরবরাহ কমে যাওয়া এবং লাভ কমে যাওয়ার হিসাব। ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, আগের মতো দূরদূরান্ত থেকে বাঁশ আসে না। আর যা আসে, তা কিনতে হচ্ছে বেশি দামে।

মোগরাপাড়ার সোনা মিয়া প্রায় ৪০ বছর ধরে এই ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। বাঁশের ব্যবসা করেই তিনি পাকা বাড়ি করেছেন, দুই মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন। তাঁর এক ছেলে এখন অনার্সে পড়ছেন। দীর্ঘদিনের ব্যবসায় নিজের সংসার সামলালেও বর্তমান পরিস্থিতিতে লাভের হিসাব মেলাতে পারছেন না তিনি।

সোনা মিয়া বলেন, এখনো আমাদের বেচাকেনা ভালো। সারা সপ্তাহই ব্যবসা চলে। কিন্তু আগের মতো দূরদূরান্ত থেকে বাঁশ আসে না।

একই সংকটের কথা জানালেন ৫৫ বছর বয়সী ওয়ালী উল্লাহ মিয়া। তাঁর বাবা-দাদার আমল থেকেই পরিবারটি বাঁশের ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। তাঁর অধীনেও কাজ করেন কয়েকজন শ্রমিক। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের হিসাবে, এই হাটের বাঁশের ব্যবসার সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত প্রায় ২০০ পরিবার।

ওয়ালী উল্লাহ মিয়া জানান,বেচাকেনা ঠিক আছে, কিন্তু বাঁশ আনা-নেওয়ার খরচ বেড়ে যাওয়ায় লোকসান গুনতে হচ্ছে। কোনোরকমে ডাল-ভাত খেয়ে ব্যবসাটা ধরে রেখেছি।

ব্যবসায়ীদের এই সংকটের পেছনে রয়েছে বাঁশ পরিবহনের পুরোনো ব্যবস্থার পরিবর্তনও। একসময় দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে নদীতে ভাসিয়ে বাঁশ আনা হতো কাইকারটেক হাটে। এখন সেই ব্যবস্থা প্রায় হারিয়ে গেছে। বর্তমানে বেশির ভাগ বাঁশ আসে ময়মনসিংহসহ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে। দূরপাল্লার এই পরিবহনে জ্বালানি তেলের খরচ বেড়ে যাওয়ায় ট্রলারে বাঁশ নিয়ে আসতে আগ্রহী হচ্ছেন না অনেক ব্যবসায়ী। ফলে সরবরাহ কমছে, বাড়ছে ক্রয়মূল্য।

সোনারগাঁয়ের মোগরাপাড়া ইউনিয়নের কাফরদি এলাকার খোকন মিয়া জানান, তাঁর পরিবারের সবাই কোনো না কোনোভাবে এই ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে বাঁশ কিনে কাইকারটেক হাটে বিক্রি করেন তাঁরা। এখান থেকে বাঁশ কিনে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ব্যবসায়ীরা রাস্তাঘাট, স্থাপনাসহ নানা কাজে ব্যবহারের জন্য নিয়ে যান।

খোকন মিয়া বলেন, আগে দেশের অনেক অঞ্চল থেকে নদীতে ভাসিয়ে বাঁশ আনা হতো। এখন সেই দিন নেই। বেশির ভাগ বাঁশ ময়মনসিংহ থেকে আসে। তেলের দাম বাড়ায় ট্রলারের ব্যবসায়ীরা এত দূর থেকে বাঁশ আনতে চান না। তাই মালও কম আসে। আবার এলেও বেশি দামে কিনতে হয়।

কাইকারটেক হাটে বাঁশের বেচাকেনা এখনো থেমে নেই। কিন্তু ব্যবসায়ীদের কাছে বেচাকেনা আর লাভ এক বিষয় নয়। পরিবহন ব্যয় বাড়ায় বিক্রির পর হাতে থাকছে কম টাকা, কখনো লোকসানও হচ্ছে। তবু বাপ-দাদার পেশা, পরিবারের জীবিকা আর দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক সম্পর্ক ধরে রাখতে হাট ছাড়তে পারছেন না তাঁরা। ফলে শতবর্ষের ঐতিহ্য বহন করা এই বাঁশের ব্যবসায় এখন বড় প্রশ্ন বেচাকেনা ভালো থাকলেও বাড়তি খরচের চাপ সামলে কত দিন টিকে থাকতে পারবেন ব্যবসায়ীরা?

বিজ্ঞাপন

পড়ুন : সিএনজিতে গরু তুলে চম্পট দেওয়ার চেষ্টা, জনতার হাতে আটক দুই নারী

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন