চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালের (এনসিটি) পর এবার কনটেইনার টার্মিনাল (সিসিটি) পরিচালনার দায়িত্বও বিদেশি অপারেটরের হাতে তুলে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। সৌদি আরবভিত্তিক প্রতিষ্ঠান রেড সি গেটওয়ে টার্মিনালসকে (আরএসজিটি) এই দায়িত্ব দেওয়ার প্রক্রিয়া এগিয়ে নিচ্ছে ইনভেস্ট বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ।
এর আগে পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল (পিসিটি) এবং বর্তমানে সিসিটি পরিচালনার দায়িত্বও উন্মুক্ত দরপত্র ছাড়াই সরকারি-সরকারি (জিটুজি) পদ্ধতিতে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বন্দরের সাবেক এক কর্মকর্তা ও বিশ্লেষকদের মতে, একচেটিয়াভাবে জিটুজি পদ্ধতিতে এভাবে টার্মিনালগুলোর দায়িত্ব দেওয়া হলে প্রতিযোগিতার সুযোগ সীমিত হওয়ার পাশাপাশি দেশীয় উদ্যোক্তাদের সক্ষমতা বাড়ানোর পথও সংকুচিত হতে পারে। এছাড়া বন্দর ব্যবহারকারীদের পরামর্শ, অন্য কোনো টার্মিনাল বিদেশি অপারেটরকে দেওয়ার আগে এনসিটিতে ডিপি ওয়ার্ল্ডের কার্যক্রম ও কর্মদক্ষতা মূল্যায়ন করা উচিত। উল্লেখ্য, সিসিটি ছাড়াও জেনারেল কার্গো বার্থ (জিসিবি) এবং বে পোর্ট মাল্টিপারপাস টার্মিনাল পরিচালনায় আগ্রহ দেখিয়েছে আরএসজিটি।
এনসিটি চুক্তি ও বৃহস্পতিবারের বিক্ষোভ কর্মসূচি:
তীব্র আন্দোলন ও জনমতকে উপেক্ষা করে আগামী ১৫ বছরের জন্য এনসিটি পরিচালনার দায়িত্ব দুবাইভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডের হাতে তুলে দেওয়ার চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। ঢাকার ইনভেস্ট বাংলাদেশ অডিটোরিয়ামে এই কনসেশন চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। অনুষ্ঠানে নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম, ইনভেস্টমেন্ট বাংলাদেশের চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী এবং ডিপি ওয়ার্ল্ডের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান ইসা কাজিম উপস্থিত ছিলেন। চুক্তি অনুযায়ী, ডিপি ওয়ার্ল্ডকে নির্দিষ্ট নূন্যতম ট্যারিফ প্রদান করতে হবে এবং ১২ লাখ ৩০ হাজার কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের পর অতিরিক্ত কনটেইনারের জন্য ধাপে ধাপে ট্যারিফের হার বৃদ্ধি পাবে।
তবে এই চুক্তির খবর ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই বন্দর এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করছে। বন্দর এলাকায় মশাল মিছিল করেছে চট্টগ্রাম বন্দর জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল ও বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ। চুক্তিটিকে ‘কালো চুক্তি’ আখ্যা দিয়ে এর বিরোধিতায় চট্টগ্রাম বন্দর ভবনের সামনে থেকে বিক্ষোভ মিছিলের ঘোষণা দিয়েছে তারা। সেখান থেকেই পরবর্তী আন্দোলন কর্মসূচি ঘোষণা করবেন শ্রমিক নেতারা। এছাড়া বন্দর রক্ষা কমিটি ও শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদ (স্কপ) এই চুক্তি স্বাক্ষরের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে।
বিতর্ক ও পটভূমি:
১৯৬৮ সালে ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ হিসেবে যাত্রা শুরু করে ২০০৩ সালে পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপ নেওয়া চট্টগ্রাম বন্দরের কনটেইনার ওঠানামার প্রধান চার টার্মিনালের মধ্যে এনসিটি সবচেয়ে বড়। বিগত সরকারের আমলে এই প্রক্রিয়া শুরু হলেও ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এনসিটি বিদেশি অপারেটরের হাতে দেওয়ার কার্যক্রম আবার শুরু করে। পরবর্তীতে তীব্র আন্দোলনের মুখে তা স্থগিত করা হলেও বর্তমান সরকারের নির্দেশনায় গত জুনে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে পুনরায় আলোচনা শুরু হয় এবং ১২ সদস্যের একটি সাপোর্ট টিম গঠন করা হয়।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, বন্দরের অপারেশনাল দক্ষতা বৃদ্ধি, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং বিদেশি বিনিয়োগের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের পরিধি বাড়াতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অপরদিকে আন্দোলনকারীদের দাবি, এনসিটির ভার বিদেশियों হাতে গেলে বন্দর লোকসানের মুখে পড়বে, দক্ষ কর্মশক্তি হারাবে এবং ভূ-রাজনৈতিকভাবে বাংলাদেশ বড় বিপদের মুখে পড়বে। এছাড়া দেশ থেকে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা পাচার এবং বিপজ্জনক পণ্য খালাসের আশঙ্কাও রয়েছে।
চুক্তি স্বাক্ষর প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দরের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম জানান, অনুষ্ঠানটি ইনভেস্ট বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ আয়োজন করছে এবং বন্দর এক্ষেত্রে সরাসরি যুক্ত নয়। তবে বন্দর চেয়ারম্যান রিয়ার এডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামানকে ফোন করা হলেও তিনি কোনো সাড়া দেননি। অন্যদিকে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. জাকারিয়া চুক্তির বিভিন্ন শর্ত ও সর্বনিম্ন ট্যারিফের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
এদিকে বন্দর রক্ষা কমিটির আহ্বায়ক প্রকৌশলী দেলোয়ার মজুমদার ও সদস্য সচিব ফজলু কবির মিন্টু এক বিবৃতিতে বলেন, জনগণের মতামত উপেক্ষা করে একতরফা এই চুক্তি দেশের ইতিহাসে একটি ‘কালো চুক্তি’ হিসেবে চিহ্নিত হবে। স্কপ চট্টগ্রামের নেতারাও অবিলম্বে এই চুক্তি স্বাক্ষর প্রক্রিয়া বন্ধ, পূর্ণাঙ্গ শর্ত প্রকাশ এবং সংশ্লিষ্ট সবার মতামত গ্রহণের জোরালো দাবি জানিয়েছেন।
পড়ুন : সৌদির রিয়াদে বিমানবন্দরে হামলায় ২৪ বাংলাদেশি আহত
সা/


