বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দামে কিছুটা পতন ঘটেছে। রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে একে অপরের জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা বন্ধের সম্ভাবনা এবং বৈশ্বিক বাজারে রাশিয়ার ডিজেল সরবরাহ বাড়ানোর ঘোষণার প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য হ্রাস পেয়েছে। তবে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত এবং গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজে হামলার কারণে সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার শঙ্কা বহাল থাকায় আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুডের দাম এখনও ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে অবস্থান করছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সোমবার (১২ অক্টোবর) সকাল ৭টা ৫৪ মিনিটের দিকে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১ দশমিক ৫৪ ডলার বা ১ দশমিক ৪৭ শতাংশ কমে ১০৩ দশমিক ১৮ ডলারে নেমেছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটের (ডব্লিউটিআই) দামও ১ দশমিক ৫৪ ডলার বা ১ দশমিক ৬৮ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ৯০ দশমিক ৩১ ডলারে এসে দাঁড়িয়েছে।
ডিজেল সরবরাহ ও যুদ্ধবিরতির ঘোষণা:
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত শুক্রবার জানান, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্ববাজারে তাৎক্ষণিকভাবে ৩ লাখ টন (প্রায় ২২ লাখ ৫০ হাজার ব্যারেল) ডিজেল সরবরাহ করবে রাশিয়া। এছাড়া আগামী নভেম্বরে আরও ৫ লাখ টন এবং এর পরপরই অতিরিক্ত ১০ লাখ টন ডিজেল সরবরাহের পরিকল্পনা রয়েছে।
পরবর্তীতে রোববার ট্রাম্প আরও জানান, রাশিয়া ও ইউক্রেন পরস্পরের জ্বালানি স্থাপনায় হামলা বন্ধ করতে সম্মত হয়েছে। তবে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি জানিয়েছেন, তিনি এই যুদ্ধবিরতির পূর্ণাঙ্গ শর্ত জানার অপেক্ষায় আছেন। অন্যদিকে, ক্রেমলিন বা রাশিয়ার পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করা হয়নি।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়ার ডিজেল সরবরাহ বৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি এবং হামলা বন্ধের খবর তেলের বাজারকে কিছুটা স্বস্তি দিয়েছে। কেসিএম ট্রেডের প্রধান বিশ্লেষক টিম ওয়াটারার জানান, যুদ্ধবিরতি কতটা স্থায়ী ও কার্যকর হবে তা নিয়ে স্পষ্ট প্রমাণ না পাওয়া পর্যন্ত তেলের দামে বড় পতনের সম্ভাবনা কম।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও সমুদ্রপথে হামলা:
রাশিয়া-ইউক্রেন সংকটের কিছুটা শিথিলতা আসলেও মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি তেলের বাজারকে উত্তপ্ত রাখছে। ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা শনিবার সৌদি আরবের রিয়াদ বিমানবন্দরে ভয়াবহ হামলার দায় স্বীকার করে, যাতে ১৩ জন নিহত ও ৩০০ জনের বেশি আহত হন। পরবর্তীতে রোববার সেখানে পুনরায় হামলা ও হতাহতের খবর আসে। ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন, হুতিদের বিরুদ্ধে সৌদির এই লড়াইয়ে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি অংশ নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করছে, যা ইরানকে কেন্দ্র করে গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের শুরু করা বৃহত্তর যুদ্ধেরই বিস্তার।
অন্যদিকে, চলতি মাসে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় জাহাজে একাধিক হামলা হয়েছে। যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস জানিয়েছে, ওমানের সোহর নোঙর এলাকায় একটি তেলবাহী জাহাজ ড্রোন হামলার শিকার হয়েছে এবং হরমুজ প্রণালি অতিক্রমের সময় অন্য একটি জাহাজ অজ্ঞাত আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেপ্টেম্বর মাসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে অপরিশোধিত তেল রপ্তানি যুদ্ধপূর্ব অবস্থার চেয়ে বাড়লেও এই ঘটনাগুলো রপ্তানি পুনরুদ্ধারে বাধার সৃষ্টি করছে।
গোল্ডম্যান স্যাকসের পূর্বাভাস ও মার্কিন পরিস্থিতি:
সংকটময় এই পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ ব্যাংক গোল্ডম্যান স্যাকস চলতি বছরের ডিসেম্বরের জন্য ব্রেন্ট ক্রুডের পূর্বাভাস পরিবর্তন করে ব্যারেলপ্রতি ৮৫ ডলারের জায়গায় ৯০ ডলার নির্ধারণ করেছে। তাদের হিসাবে, বর্তমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে বাজারে তেলের দামে ব্যারেলপ্রতি ২০ ডলারের বেশি বাড়তি ‘ঝুঁকি মূল্য’ যোগ হয়ে আছে। ব্যাংকটির বিশ্লেষকরা আরও পূর্বাভাস দিয়েছেন, ডব্লিউটিআইয়ের গড় দাম ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে ৮১ ডলার এবং ২০২৭ সালে ৭৩ ডলারে নামতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে ইউরোপে তেল পরিবহনের অতিরিক্ত খরচের কারণে ব্রেন্টের চেয়ে ডব্লিউটিআইয়ের দাম কম থাকবে বলে তারা মনে করছেন।
এদিকে, ঘূর্ণিঝড় হারিকেন ইসাইয়াসের আঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের মেক্সিকো উপসাগরীয় অঞ্চলে তেল উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পর শেল, শেভরন ও বিপি-র মতো বড় প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের কর্মীদের প্ল্যাটফর্মে ফিরিয়ে এনে পুনরায় তেল উৎপাদন চালুর কাজ শুরু করেছে।
পড়ুন : অক্টোবরের ১০ দিনে রেমিট্যান্স এলো ১২ হাজার কোটি টাকার বেশি
সা/


