দিল্লি আন্দেলন: লড়াই চালিয়ে যাবে ককরোচ জনতা পার্টি

ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে দেশজুড়ে চলা বিক্ষোভ দমনে টানা দ্বিতীয় দিনের মতো দিল্লিতে ধরপাকড় চালিয়েছে পুলিশ। তবে এত গ্রেপ্তার ও প্রশাসনিক বাধার পরও রাজপথ না ছাড়ার এবং নির্বাচন কমিশনের সংস্কার ও গণতন্ত্র রক্ষার দাবিতে আন্দোলন অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছে তরুণদের সংগঠন ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)।

বিজ্ঞাপন

সোমবার (১২ অক্টোবর) বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

নেতাদের মুক্তি ও কঠোর বার্তা

টানা আটকের পর নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নির্দেশে এক বছরের জন্য শান্তি বজায় রাখার শর্তে মুক্তি পেয়েছেন সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকেসহ দলের আরও দুই নেতা। কারাগার থেকে বের হয়েই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে ‘ভীতু’ বলে আখ্যা দেন দিপকে। অপর দুই নেতা সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কা প্রেসক্লাব অব ইন্ডিয়ায় আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করেন, সরকার তার নিজ দেশের মানুষের বিরুদ্ধেই যুদ্ধংদেহী অবস্থান নিয়েছে।

সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে আশুতোষ রাঙ্কা বলেন, গত ৭২ ঘণ্টায় দেশে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি করা হয়েছে, তা ১৯৭৫ সালের জরুরি অবস্থার সময়কেও ছাড়িয়ে গেছে। তিনি অভিযোগ করেন, আন্দোলনকারীদের মূল দাবি ছিল সিইসি জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ, কিন্তু প্রধানমন্ত্রী মোদী বিষয়টিকে নিজের বিরুদ্ধে নিয়ে নির্বাচন কমিশন প্রধানকে রক্ষার চেষ্টা চালাচ্ছেন। তারা জানান, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ দেশকে গৃহযুদ্ধের দিকে নিয়ে যাচ্ছেন এবং এজন্য তাদের লজ্জিত হওয়া উচিত।

একই সাথে আটক হওয়া জনপ্রিয় ইউটিউবার ধ্রুব রাঠিও মুক্তি পেয়েছেন। তবে তিনি দাবি করেছেন যে, তাকে আইনি প্রক্রিয়ায় আটক করা হয়নি, বরং ‘ অপহরণ করা হয়েছিল’।

রাজপথে উত্তেজনা ও শিক্ষার্থী আটকের চিত্র

প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাজধানীর রামকৃষ্ণ আশ্রম এলাকা থেকে আবারও আটক করা হয়েছে অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নেহা বোরাকে। এর আগে শনিবারও তাকে আটক করার পর ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। রবিবারেও দিল্লির বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভকারীদের গণহারে আটক করে পুলিশ।

ঘটনাস্থলে নিরাপত্তাকর্মীদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের সদস্যদের টেনেহিঁচড়ে বাসে তোলার অভিযোগ উঠেছে। আটক অনেক আন্দোলনকারীর শরীরে আঘাতের চিহ্ন দেখা গেছে। তা সত্ত্বেও এক আন্দোলনকারী স্পষ্ট জানিয়ে দেন, সরকার বিক্ষোভকারীদের আটক করে ও গণতন্ত্রের ওপর আঘাত হেনে আন্দোলন দমাতে পারবে না; সিইসির পদত্যাগ ও নির্বাচন কমিশনের সংস্কারের দাবিতে তারা রাজপথেই থাকবেন।

দিল্লির যন্তর মন্তর ও মেট্রো স্টেশনে কড়াকড়ি

সিজেপির পূর্বঘোষিত কর্মসূচিকে ঘিরে দিল্লির ঐতিহ্যবাহী যন্তর মন্তর এলাকায় নিরাপত্তা বলয় জোরদার করেছে পুলিশ। বিক্ষোভকারীদের জমায়েত রুখতে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অতিরিক্ত নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করা হয়। এ ছাড়া মেট্রো রেল চলাচল স্থগিত করা ও স্টেশন এলাকায় নানাবিধ বিধিনিষেধ আরোপ করা নিয়ে চরম উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। তবে মেট্রো স্টেশনে যাতায়াতে বিধিনিষেধ জারি ও বিভিন্ন রাস্তায় ব্যারিকেড দেওয়ার বিষয়ে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট বেশ কড়া অবস্থান নিয়েছে বলে রয়টার্সের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

কঠোর নিরাপত্তা ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা

সাধারণত প্রতিবাদের জন্য নির্ধারিত স্থান হিসেবে কেন্দ্রীয় দিল্লির ‘যন্তর মন্তর’-কে ব্যবহার করা হলেও সেখানে এই সমাবেশের অনুমতি দেয়নি পুলিশ। আবেদনের নির্দিষ্ট সময়সীমা পেরিয়ে যাওয়া এবং পূর্ববর্তী বিক্ষোভের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের অজুহাতে এ নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। পাশাপাশি নিষেধাজ্ঞা অমান্য করলে বিক্ষোভকারীদের ওপর কঠোর বলপ্রয়োগের হুঁশিয়ারিও দিয়েছে আইনশৃঙ্খল রক্ষাকারী বাহিনী।

ভারতীয় সংবাদ সংস্থা এএনআই (ANI)-এর সূত্রমতে, সমাবেশস্থলের দিকে যাওয়ার পথগুলোতে দেওয়া হয়েছে বহুস্তরের ধাতব ব্যারিকেড। শুক্রবার রাত থেকে ৫৭টি মেট্রো স্টেশন বন্ধ রাখা ছাড়াও বাতিল করা হয়েছে বেশ কয়েকটি দূরপাল্লার ট্রেন। শুধু তা-ই নয়, শনিবার রাত পর্যন্ত সমাবেশস্থলের চারপাশের ৪ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে মোবাইল ইন্টারনেট সেবা স্থগিত করা হয়েছে। তবে সুপ্রিম কোর্ট শুক্রবার স্পষ্ট করেছে যে, সব মেট্রো স্টেশন পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া অনুচিত এবং কিছু ট্রেন অবশ্যই চালু রাখতে হবে।

উত্তাল রাজনৈতিক অঙ্গন ও প্রবীণদের প্রতিক্রিয়া

সরকারের এই কঠোর পদক্ষেপে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সিজেপি প্রধান অভিজিৎ দিপকে। সোশ্যাল মিডিয়া এক্স-এ তিনি লেখেন, “একটি নির্ধারিত স্থানে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ করতে দেওয়ার চেয়ে স্বৈরাচারী শাসক পুরো জাতীয় রাজধানীকে স্তব্ধ করে দিতে এবং লক্ষ লক্ষ নাগরিককে ভোগান্তিতে ফেলতে বেশি পছন্দ করেন।”

এদিকে ট্রেনে করে দিল্লি আসার পথে বিক্ষোভকারীসহ দেশজুড়ে অন্তত ১০,০০০ মানুষকে আটক করা হয়েছে বলে দাবি করেছে সিজেপি। চলমান আন্দোলনের অন্যতম প্রধান মুখ ও অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের জাতীয় সভাপতি নেহা বোরা স্পষ্ট বার্তা দিয়ে বলেন, “আপনারা মানুষকে আটক করতে পারেন, কিন্তু আন্দোলনকে আটকে রাখতে পারবেন না।”

বিতর্কের মূলে ভোটার তালিকা ও নির্বাচন কমিশন

নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, আন্তর্জাতিক বা অভ্যন্তরীণ ভুয়ো ও অযোগ্য ভোটারদের বাদ দেওয়া এবং “বিদেশী অবৈধ অভিবাসীদের” ভোট প্রদান ঠেকাতেই ভোটার তালিকা সংশোধনের এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পক্ষান্তরে সমালোচকদের মতে, এ ব্যবস্থার ফলে প্রান্তিক ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়গুলো মারাত্মক বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর এক প্রতিবেদনে প্রকাশ পায় যে, গত ১০ মাসে ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়া নিয়ে মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের দুই ডেপুটিই অন্তত ১৪ বার আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বেগ জানিয়েছিলেন—যে খবরের পর বিক্ষোভ দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। অবশ্য বিজেপি ও নির্বাচন কমিশন উভয়েই এসব অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছে। বিজেপির পাল্টা দাবি, নির্বাচনে জয়ী হতে না পেরে বিরোধী দলগুলো জনগণকে বিভ্রান্ত করছে।

যেভাবে রাজনৈতিক শক্তিতে রূপ নিল ‘সিজেপি’

রাজনৈতিক ব্যঙ্গাত্মক পেজ হিসেবে মে মাসে অনলাইনে আত্মপ্রকাশ ঘটে ককরোচ জনতা পার্টি বা সিজেপি-র। ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত বেকার তরুণদের “তেলাপোকা” বলে মন্তব্য করার পর দেশজুড়ে যে ক্ষোভ তৈরি হয়, তা থেকেই দলটির সৃষ্টি। স্বল্প সময়ের মধ্যেই ভারতের যুবসমাজের বিশাল অংশ এর সাথে যুক্ত হয়। এর আগে গত জুলাই মাসে পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনাকে কেন্দ্র করে এই তরুণদের আন্দোলনের মুখেই পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলেন মোদীর শিক্ষামন্ত্রী।

২০২৭ সালের শুরুতেই ভারতের সবচেয়ে জনবহুল রাজ্য ও বিজেপি শাসিত উত্তর প্রদেশসহ বেশ কয়েকটি রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। গুরুত্বপূর্ণ এই রাজনৈতিক সমীকরণের ঠিক কয়েক মাস আগেই দেশজুড়ে তরুণদের এই প্রতিবাদ চরম রূপ ধারণ করল।

পড়ুন : ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন শুরু ২১ জানুয়ারি, ৫ ধাপে হবে ভোট: ইসি সানাউল্লাহ

সা/

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন