এলপি গ্যাস ব্যবসায়ীদের হয়রানির প্রতিবাদ জানিয়ে আগামী বৃহস্পতি ও শুক্রবার (১৫ ও ১৬ অক্টোবর) সারাদেশে টানা দুই দিন সকল এলপি গ্যাসের দোকান বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছে এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লিমিটেড।
আজ সোমবার (১২ অক্টোবর) রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের সভাপতি সেলিম খান এই ধর্মঘটের ঘোষণা দেন।
অনিয়ম ও সরবরাহে অচলবস্থার চিত্র
এর আগে গত ৪ অক্টোবর বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) দাম পুনর্নির্ধারণ করে। নতুন মূল্যে ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ২৫২ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৮৩৭ টাকা নির্ধারণ করা হলেও সরকারের ঠিক করা এই দামে দেশের কোথাও এলপিজি মিলছে না বলে ব্যাপক অভিযোগ উঠেছে।
আমদানি পর্যাপ্ত রয়েছে বলে দাবি করা হলেও পাইকারি পর্যায়ে ব্যবসায়ীরা চাহিদা অনুযায়ী সিলিন্ডার পাচ্ছেন না। পাইকারি ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, আমদানিকারকদের প্ল্যান্টে ট্রাক আটকে থাকার দরুন সরবরাহ প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হচ্ছে। তিন থেকে চার দিন অপেক্ষার পর ট্রাক পৌঁছালেও কাঙ্ক্ষিত পরিমাণ সিলিন্ডার মিলছে না। ফলে খুচরা বাজারে সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার পাশাপাশি পরিবহনসহ অন্যান্য বাড়তি খরচের চাপে পোহাতে হচ্ছে ব্যবসায়ীদের।
এক হিসাব মতে, ১২ কেজির ১৪৭টি সিলিন্ডারের জন্য তিন দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হচ্ছে। এরপর পাইকারি বাজার থেকে ভাগ পেয়ে খুচরা বিক্রেতারা মাত্র ৫ থেকে ৭টি সিলিন্ডার পাচ্ছেন। একটি ট্রাক প্ল্যান্টে পাঠালে তা চার থেকে পাঁচ দিন আটকে থাকে; এমনকি তিন দিন আগে পাঠানো ট্রাক কখন ফিরবে তার কোনো নিশ্চয়তা মিলছে না। ফলে পুরো সরবরাহ ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েই প্রশ্ন দেখা দিয়েছে এবং আমদানিকারকদের কাছে এর স্পষ্ট ব্যাখ্যা চাইছেন পরিবেশক ও ব্যবসায়ীরা।
আমদানিকারকদের যুক্তি ও ব্যবসায়ীদের পাল্টা প্রশ্ন
তবে বাজারে বড় ধরনের কোনো সংকট নেই দাবি করে এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (লোয়াব) জানিয়েছে, চলতি মাসে দেশে দেড় লাখ টনের বেশি এলপিজি আমদানির লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে যা চাহিদার তুলনায় পর্যাপ্ত। সংস্থাটির মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে চড়া দাম এবং মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক অস্থিরতার প্রভাবে পরিবহন ও আমদানিতে অতিরিক্ত সময় লাগছে।
সমন্বয়ের মাধ্যমে চলতি মাসে বাজারে এলপিজির সরবরাহ নিশ্চিত করার আশ্বাস দিয়ে লোয়াবের সহসভাপতি হুমায়ুন রশীদ বলেন, “প্রায় এক লাখ ৫০ হাজার টন এলপিজি আমদানির লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে কাজ চলছে। আমদানির ক্ষেত্রে একাধিক ক্রয়ব্যবস্থা থাকলেও স্পট মার্কেট থেকে কেনা কার্গো নির্ধারিত সময়ে না পৌঁছানোর ঘটনা ঘটছে।”
বিলম্বের উদাহরণ তুলে ধরে তিনি বলেন, “একটি কার্গো ১০ তারিখে আসার কথা থাকলেও সেটি এসেছে ১৫ তারিখে। পাঁচ দিনের এ বিলম্বে ট্রাকগুলো প্ল্যান্টে আটকে থাকে। ফলে সরবরাহে বিঘ্ন ঘটেছে বলে ব্যবসায়ীদের ধারণা তৈরি হয়।” একই সাথে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী এ পরিস্থিতির সুযোগ নিচ্ছেন বলে তিনি অভিযোগ করেন।
তবে লোয়াবের এই ব্যাখ্যার সাথে দ্বিমত পোষণ করেছে এলপিজি ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি। বিইআরসির মধ্যস্থতায় আমদানিকারকদের সাথে আলোচনার তাগিদ দিয়ে সংগঠনটির অর্থ সম্পাদক আবু তাহের কোরেশী বলেন, বিইআরসির তথ্যমতে গত ছয় মাসের অনুপাত অনুযায়ী এলসি খোলা এবং গ্যাস আসার কথা রয়েছে এবং কোম্পানিগুলোও পর্যাপ্ত মজুতের দাবি করছে। তাহলে পরিবেশক ও ব্যবসায়ীরা কেন পণ্য পাচ্ছেন না—সেই প্রশ্ন তুলে তিনি সব পক্ষকে একসাথে বসে দ্রুত সরবরাহ নিশ্চিতের আহ্বান জানান।
বিশেষজ্ঞদের মত ও দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের তাগিদ
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু বিইআরসি কর্তৃক দাম ঘোষণা বা সমন্বয় করলেই বাজার স্থিতিশীল হবে না; বরং আমদানি, খালাস, প্ল্যান্টে মজুত, পরিবহন এবং পরিবেশক পর্যায় পর্যন্ত নিবিড় তদারকি নিশ্চিত করতে হবে।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম এ প্রসঙ্গে বলেন, “বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হচ্ছে কি না, তা রাষ্ট্রকে নিশ্চিত করতে হবে। কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি এবং অবৈধভাবে মজুত গড়ে তোলার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ সরকারের রয়েছে। কিন্তু সেই ব্যবস্থা কার্যকর হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করা জরুরি।”
এলপিজি বাজারে দীর্ঘমেয়াদি স্বস্তি ফেরাতে অন্তর্বর্তী সরকারের উদ্যোগে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) মাধ্যমে এলপিজি আমদানির পরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়নের পরামর্শ দিয়েছেন বিশ্লেষকেরা। তাদের মতে, আমদানির পাশাপাশি সরবরাহের স্বচ্ছতা, মজুত পর্যবেক্ষণ ও নিয়মিত তদারকির সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমেই বর্তমান সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব।
পড়ুন : দাম বাড়ানোর পরও চাহিদামতো মিলছে না এলপিজির বাজার
সা/


