যন্তর মন্তরে বাধা, নতুন মাঠে প্রতিবাদ কতটা সহজ?

ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে বিক্ষোভস্থল হিসেবে যন্তর মন্তরকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্তের পরও সেখানে প্রতিবাদ থামানো যায়নি। নিষেধাজ্ঞার এক দিন পর মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) সকালে লোহার গেট ও পুলিশের ব্যারিকেড টপকে যন্তর মন্তরে প্রবেশ করেন ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) নেতাকর্মীরা। বিক্ষোভের পর তাঁদের আটক করে দিল্লি পুলিশ। অন্যদিকে, যন্তর মন্তরের পরিবর্তে নির্ধারিত তিনটি স্থানে কর্মসূচি পালনের ক্ষেত্রে ভাড়া, দূরত্ব, ছায়ার অভাব ও জায়গা পাওয়ার জটিলতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

বিজ্ঞাপন

দলের নেতা আশুতোষ রানকা ও সৌরভ দাসের নেতৃত্বে সিজেপির একদল কর্মী এদিন যন্তর মন্তরে প্রবেশ করে প্রতিবাদ জানান। দলের প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত একটি ভিডিওতে এ ঘটনার দৃশ্য তুলে ধরেন। ভিডিওতে দেখা যায়, হাতে দলের পতাকা নিয়ে রানকা, দাসসহ কয়েকজন কর্মী গেট টপকে ভেতরে ঢুকছেন। এ সময় তাঁরা ‘ভারত মাতা কি জয়’ ও ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ স্লোগান দেন। পুলিশ বাধা দিলে কিছুক্ষণ ধস্তাধস্তির মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়। পরে বিক্ষোভকারীদের আটক করে নিয়ে যায় পুলিশ।

ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অভিজিৎ দীপকে লেখেন, ‘আপনারা প্রতিরোধকে নিষিদ্ধ করতে পারবেন না।’ যন্তর মন্তরকে বিক্ষোভস্থলের তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার কেন্দ্রীয় সরকারের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে তিনি এ মন্তব্য করেন।

দিল্লির কেন্দ্রীয় ও নিরাপত্তাসংবেদনশীল এলাকায় অবস্থিত যন্তর মন্তর দীর্ঘদিন ধরে নির্ধারিত বিক্ষোভস্থল হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছিল। তবে কেন্দ্রীয় সরকারের সিদ্ধান্তের পর সেখানে বিক্ষোভ ও অবস্থান কর্মসূচি পালনের সুযোগ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।

কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন একটি কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে দিল্লিতে বিক্ষোভ ও অবস্থান কর্মসূচির জন্য নতুন তিনটি স্থান নির্ধারণ করা হয়েছে। সেগুলো হলো রামলীলা ময়দান, উত্তর দিল্লির বুরারি ময়দান এবং পূর্ব দিল্লির সিবিডি গ্রাউন্ড। তবে বিকল্প এসব স্থানের কোনোটিই যন্তর মন্তরের মতো সহজে ব্যবহারযোগ্য কি না, তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে।

গত ১০ অক্টোবর থেকেই যন্তর মন্তরে নিরাপত্তা জোরদার করেছে দিল্লি পুলিশ। বিক্ষোভকারীদের সেখানে প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না। ওই দিন যন্তর মন্তরে বিক্ষোভের ডাক দিয়েছিল সিজেপি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১০ অক্টোবর সকালে দিল্লিতে পৌঁছানোর পর দলের শীর্ষ নেতা অভিজিৎ দীপকে, সৌরভ দাস ও আশুতোষ রানকাকে উড়োজাহাজের ভেতর থেকেই আটক করা হয়। এদিকে, শনিবার ও রোববার রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে বিক্ষোভ ও পুলিশের অভিযান ঘিরে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। ওই সময় হাজারো বিক্ষোভকারীকে আটক করা হয় বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিক্ষোভের স্থান বদলের সিদ্ধান্তে শুধু অবস্থান নয়, আন্দোলনের খরচ ও মানুষের কাছে পৌঁছানোর সক্ষমতা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তিনটি বিকল্পের মধ্যে রামলীলা ময়দান দিল্লির কেন্দ্রীয় এলাকার সবচেয়ে কাছে। তবে সেখানে কর্মসূচি আয়োজন করতে ভাড়া দিতে হয়। উৎসবের মৌসুমে মাঠটির চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় জায়গা পাওয়াও কঠিন হতে পারে। সিবিডি গ্রাউন্ড ঘনবসতিপূর্ণ আবাসিক ও বাণিজ্যিক এলাকার মধ্যে অবস্থিত। আর বুরারি ময়দান রাজধানীর কেন্দ্র থেকে অনেক দূরে। ফলে এসব স্থানে বিক্ষোভ করলে যন্তর মন্তরের মতো রাজনৈতিক ও সাধারণ মানুষের মনোযোগ আকর্ষণ করা সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

লেখক ও দিল্লির নগরজীবনের ইতিহাসবিদ সোহেল হাশমির মতে, ইন্ডিয়া গেটের কাছে বোট ক্লাবের সবুজ চত্বর থেকে যন্তর মন্তরে বিক্ষোভ সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্তই ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। এখন প্রতিবাদের স্থান ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে আরও দূরে সরিয়ে নিলে সাধারণ মানুষের দাবি-দাওয়া সরকারের কাছে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়বে।

তিনি বলেন, আগে খোলা জায়গায় মানুষ একত্র হয়ে সরকারের কাছে নিজেদের দাবি জানাতে পারতেন। ক্ষমতার কেন্দ্রের কাছেই কয়েক হাজার, এমনকি কয়েক দশ হাজার মানুষ জড়ো হতে পারতেন। ওয়াশিংটনে মানুষ ক্যাপিটল হিলের ঠিক বাইরেও সমবেত হতে পারেন। তাহলে দিল্লিতে কেন প্রতিবাদকারীদের আরও দূরে সরিয়ে নেওয়া হবে?

যন্তর মন্তর থেকে প্রায় চার কিলোমিটার দূরে অবস্থিত রামলীলা ময়দান। তিনটি বিকল্পের মধ্যে এটি দিল্লির কেন্দ্রীয় প্রশাসনিক এলাকার সবচেয়ে কাছাকাছি। দীর্ঘদিন ধরে এখানে রাজনৈতিক সমাবেশ, মিছিল ও বিভিন্ন গণআন্দোলনের কর্মসূচি হয়ে আসছে। তবে সেখানে কর্মসূচি আয়োজনের জন্য নির্ধারিত অর্থ দিতে হবে।

দিল্লি পৌর করপোরেশনের (এমসিডি) এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, প্রায় ১২ একর আয়তনের এই মাঠ ভাড়া নিতে প্রতিদিন ৫০ হাজার রুপি দিতে হয়। এর পাশাপাশি ফেরতযোগ্য জামানত হিসেবে জমা দিতে হয় ৫৫ হাজার রুপি। এ ছাড়া দিল্লি ট্রাফিক পুলিশের অনাপত্তিপত্রও নিতে হবে।

ওই কর্মকর্তা জানান, মাঠের অর্ধেক অংশ ভারী যানবাহন পার্কিংয়ের জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে। বাকি অংশ বুকিং দেওয়া হয়। তবে মাঠের ছোট কোনো অংশ আলাদাভাবে ভাড়া নেওয়ার সুযোগ নেই; পুরো নির্ধারিত অংশই বুক করতে হয়।

এ কারণে ছোট সংগঠন কিংবা যেসব গোষ্ঠীর বড় জায়গার প্রয়োজন নেই, তাদের জন্য রামলীলা ময়দান ব্যবহার করা ব্যয়বহুল ও অসুবিধাজনক হতে পারে। যন্তর মন্তরের মতো গাছপালায় ঘেরা পরিবেশও সেখানে নেই। খোলা মাঠে পর্যাপ্ত ছায়া না থাকায় গরমের মধ্যে দীর্ঘ সময় ধরে বিক্ষোভ চালানো কঠিন হতে পারে।

এমসিডির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মাঠটি ২৭ বার বুক করা হয়েছে। এরই মধ্যে রামলীলা অনুষ্ঠান ও মেলার প্রস্তুতি শুরু হওয়ায় উৎসবের মৌসুমে সেখানে কর্মসূচি আয়োজনের জন্য খালি সময় পাওয়া আরও কঠিন হতে পারে।

পূর্ব দিল্লির শাহদারায় অবস্থিত ১২ একর আয়তনের সিবিডি গ্রাউন্ডের দেখভাল করে দিল্লি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (ডিডিএ)। বিয়ে ও বড় ধরনের অনুষ্ঠান আয়োজনের জন্য পরিচিত এই মাঠের চারপাশে রয়েছে ঘনবসতিপূর্ণ আবাসিক এলাকা, বিপণিবিতান ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান। ফলে এখানে বিক্ষোভ হলে যানজট ও স্থানীয় বাসিন্দাদের ভোগান্তি বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

পূর্ব দিল্লির আবাসিক কল্যাণ সমিতিগুলোর যৌথ সংগঠন ইস্ট দিল্লি আরডব্লিউএ জয়েন্ট ফ্রন্টের প্রধান বি এস ভোহরা বলেন, আশপাশের ভবন ও ব্যস্ত সড়কের কারণে জায়গাটি বিক্ষোভের জন্য উপযুক্ত নয়।

তাঁর ভাষ্য, মাঠের কাছেই একটি হোটেল, দুটি বিপণিবিতান, অসংখ্য বিয়ের অনুষ্ঠানস্থল এবং আবাসিক এলাকা রয়েছে। মাঠের মাঝখানে কিছু খোলা জায়গা থাকলেও সেখানে বিক্ষোভ আয়োজন করা কতটা বাস্তবসম্মত, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এমনকি মাঠের ভেতরেও বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও বিয়ের প্যান্ডেল দেখা যায়।

ভোহরার মতে, বিক্ষোভের সময় প্রায়ই ব্যারিকেড বসানো ও যান চলাচল নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন হয়। ঘনবসতিপূর্ণ এই এলাকায় তা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা কঠিন হবে।

ডিডিএর এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সিবিডি গ্রাউন্ডও ভাড়া দিয়ে ব্যবহার করতে হয়। সেখানে বিনা মূল্যে বিক্ষোভ করার কোনো ব্যবস্থা থাকবে কি না, সে বিষয়ে দিল্লি পুলিশের নির্দেশনার অপেক্ষায় রয়েছে কর্তৃপক্ষ।

তিনটি বিকল্পের মধ্যে সবচেয়ে বড় বুরারি ময়দান, যা নিরঙ্কারি ময়দান নামেও পরিচিত। উত্তর-পশ্চিম দিল্লিতে অবস্থিত প্রায় ৫০ একর আয়তনের এই মাঠ যন্তর মন্তর থেকে আনুমানিক ১৮ কিলোমিটার দূরে। রাজধানীর কেন্দ্রীয় প্রশাসনিক এলাকা থেকেও এটি বেশ দূরে অবস্থিত।

বড় আয়তনের কারণে এখানে বিপুলসংখ্যক মানুষের সমাবেশ আয়োজন করা সম্ভব। তবে মূল উদ্বেগ হলো, এখানে বিক্ষোভ হলে তা নীতিনির্ধারক, সংবাদমাধ্যম ও সাধারণ মানুষের নজরে কতটা আসবে।

২০২৪-২৫ সালের কৃষক আন্দোলনের সময়ও বিক্ষোভকারীদের জন্য সম্ভাব্য স্থান হিসেবে বুরারি ময়দানের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু কৃষক সংগঠনগুলো সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে জায়গাটিকে ‘খোলা কারাগার’ বলে আখ্যা দেয়। তাদের অভিযোগ ছিল, জনবিচ্ছিন্ন অবস্থান ও চারপাশের বেড়ার কারণে বিক্ষোভকারীদের সেখানে সীমাবদ্ধ রাখা সম্ভব হবে। এতে আন্দোলন জনসাধারণের দৃষ্টির আড়ালে চলে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল।

সোহেল হাশমির মতে, বিক্ষোভের স্থান নির্ধারণের ক্ষেত্রে শুধু কত মানুষ জড়ো হতে পারবেন, তা বিবেচনা করলেই হবে না। বরং প্রতিবাদকারীরা যাদের কাছে নিজেদের দাবি পৌঁছাতে চান, তাদের কাছাকাছি থাকার সুযোগও থাকতে হবে।

তিনি বলেন, বিক্ষোভস্থল এমন জায়গা হওয়া উচিত, যেখানে মানুষের কথা শোনা যাবে, সংবাদমাধ্যম সহজে পৌঁছাতে পারবে এবং জনপ্রতিনিধিরা এসে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে কথা বলতে পারবেন।

হাশমির মতে, যন্তর মন্তরের জায়গা ছোট ছিল এবং সেখানে কিছু সমস্যা ছিল ঠিকই। কিন্তু বুরারি, রামলীলা ময়দান ও সিবিডি গ্রাউন্ডেরও নিজস্ব সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এসব স্থান ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে দূরে হওয়ায় প্রতিবাদকারীদের দাবি তুলে ধরা আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন