বিশ্ব হাত ধোয়া দিবস আজ

দিন দিন সংক্রামক ব্যাধির প্রকোপ বৃদ্ধি পাওয়া এবং স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে বিশ্বজুড়ে একটি সাধারণ কিন্তু অত্যন্ত কার্যকরী অভ্যাসের প্রয়োজনীয়তা নতুন করে সামনে আসছে—আর তা হলো সঠিক নিয়মে হাত ধোয়া। প্রতি বছর ১৫ অক্টোবর বিশ্বজুড়ে পালিত হয় ‘বিশ্ব হাত ধোয়া দিবস’ (Global Handwashing Day)। জনস্বাস্থ্য রক্ষায় কেবল সাবান ও পানি দিয়ে সঠিক উপায়ে হাত ধোয়ার অভ্যাস তৈরি ও প্রচারের উদ্দেশ্যে এই বিশেষ দিবসটি পালন করা হয়।

বিজ্ঞাপন

দিবসটির পটভূমি ও গুরুত্ব

২০০৮ সালে বিশ্ব পানি সপ্তাহের অংশ হিসেবে সুইডেনের স্টকহোমে প্রথম ‘বিশ্ব হাত ধোয়া দিবস’ পালিত হয়েছিল। পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক হাত ধোয়া জোট (Global Handwashing Partnership)-এর উদ্যোগে বিশ্বব্যাপী প্রতি বছর দিবসটি পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

সংক্রামক রোগ প্রতিরোধে প্রাত্যহিক জীবনের ক্ষুদ্র এই অভ্যাসের প্রভাব অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী। চিকিৎসা বিজ্ঞানের তথ্য মতে, বিশ্বজুড়ে শিশুদের ডায়রিয়া ও নিউমোনিয়ার মতো মারাত্মক রোগ প্রতিরোধের সবচেয়ে সহজ ও সাশ্রয়ী উপায় হলো পরিষ্কার পানিতে সাবান দিয়ে হাত ধোয়া।

রোগের ঝুঁকি হ্রাস: খাবারের আগে এবং শৌচাগার ব্যবহারের পর সাবান দিয়ে হাত ধুলে ডায়রিয়াজনিত রোগের ঝুঁকি প্রায় ৪০-৪৫% কমে যায়।

শ্বাসকষ্টজনিত সংক্রমণ: সঠিক নিয়মে হাত ধোয়ার মাধ্যমে নিউমোনিয়া ও শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণজনিত ঝুঁকি প্রায় ২০-২৩% হ্রাস পায়।

অন্যান্য জীবাণু থেকে সুরক্ষা: করোনা, ইনফ্লুয়েনজা ও বিভিন্ন পেটের অসুখ তৈরিকারী ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ ছড়ানো রোধে হাত ধোয়া প্রাথমিক ঢাল হিসেবে কাজ করে।

হাত ধোয়ায় বাংলাদেশের চিত্র: অগ্রগতি ও চ্যালেঞ্জ

বাংলাদেশের মতো জনবহুল ও উন্নয়নশীল দেশে জনস্বাস্থ্য নিশ্চিতকরণে হাত ধোয়ার গুরুত্ব অপরিসীম। বিগত কয়েক দশকে বিশুদ্ধ খাবার পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন ব্যবস্থায় দৃশ্যমান সফলতা মিললেও সার্বিক হাত ধোয়ার অভ্যাসে এখনো বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে।

১. দৃশ্যমান অগ্রগতি ও সচেতনতা

কয়েক বছর ধরে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে দেশব্যাপী স্বাস্থ্য সচেতনতামূলক প্রচারণা জোরদার করা হয়েছে।

প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ: দেশের অধিকাংশ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে হাত ধোয়ার বিশেষ ব্যবস্থা ও কর্নার তৈরি করা হয়েছে। ওয়াশ (WASH) প্রজেক্টের আওতায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে নিয়মিত হাত ধোয়ার চর্চা গড়ে তোলা হচ্ছে।

করোনা মহামারীর প্রভাব: বৈশ্বিক অতিমারীর সময়ে বাংলাদেশের মানুষ হাত ধোয়ার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে ব্যাপকভাবে সচেতন হয়েছিল। পাবলিক প্লেস, বাসস্ট্যান্ড ও শপিং মলে সাময়িক হাত ধোয়ার ব্যবস্থা ও হ্যান্ড স্যানিটাইজারের ব্যবহার বৃদ্ধি পেয়েছিল।

২. প্রধান চ্যালেঞ্জসমূহ

সচেতনতা কিছুটা বাড়লেও নিয়মিত চর্চার ক্ষেত্রে বেশ কিছু অবকাঠামোগত ও আচরণগত ঘাটতি স্পষ্ট:

পানি ও সাবানের সংকট: বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (BBS) এবং ইউনিসেফ (UNICEF)-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশের অনেক প্রান্তিক ও গ্রামীণ পরিবারে শৌচাগারের কাছাকাছি সাবান ও পানির সহজলভ্যতা নেই।

শহরাঞ্চলের বস্তি এলাকা: শহরাঞ্চল বিশেষ করে বস্তি এবং জনবহুল এলাকাগুলোতে নিরাপদ পানির মারাত্মক ঘাটতি রয়েছে। যৌথ শৌচাগার ব্যবহার এবং পানি সংকটের কারণে ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও বস্তিবাসী পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে পারেন না।

আচরণগত অনীহা: জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে বড় সমস্যা হলো ‘জ্ঞান ও আচরণের ব্যবধান’ (Knowledge-Practice Gap)। অনেকেই হাত ধোয়ার গুরুত্ব সম্পর্কে জানলেও গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে (যেমন: রান্নার পূর্বে, খাবার গ্রহণের আগে, কিংবা অসুস্থ ব্যক্তির পরিচর্যা করার পর) সাবান দিয়ে হাত ধুতে আলস্য বা অনীহা প্রকাশ করেন।

স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও পাবলিক প্লেসের দুর্বল চিত্র: দেশের অনেক হাট-বাজার, বাস ও ট্রেন স্টেশন এবং মাঝারি আকারের হাসপাতালে হাত ধোয়ার পর্যাপ্ত অবকাঠামো ও সাবান থাকে না।

সঠিক নিয়মে হাত ধোয়ার নিয়মাবলী

হাত শুধু ভিজিয়ে ফেলা বা নামমাত্র সাবান ঘষলেই হাত ধোয়ার উদ্দেশ্য সফল হয় না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) নির্দেশিত ৬টি ধাপে অন্তত ২০ সেকেন্ড ধরে সাবান দিয়ে হাত ধোয়া উচিত:

১. হাতের তালু দিয়ে অপর তালু ঘষা।

২. এক হাতের তালু দিয়ে অন্য হাতের পিঠ ও আঙুলের ফাঁকগুলো পরিষ্কার করা।

৩. দুহাত একত্র করে আঙুলের ভেতরের অংশ পরিষ্কার করা।

৪. বুড়ো আঙুল চক্রাকারে ঘোরাতে ঘোরাতে পরিষ্কার করা।

৫. নখের নিচের অংশ ও আঙুলের ডগা পরিষ্কার করা।

৬. কবজি পর্যন্ত ভালো করে সাবানের ফেনা ঘষে পরিষ্কার পানিতে ধুয়ে ফেলা।

ভবিষ্যৎ করণীয়

বাংলাদেশে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDG) অর্জনের অন্যতম শর্ত হলো সকলের জন্য নিরাপদ স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করা। হাত ধোয়ার মতো মৌলিক স্বাস্থ্যকর অভ্যাসকে সর্বজনীন করতে হলে নিচের বিষয়গুলোতে জোর দিতে হবে:

অবকাঠামোগত উন্নয়ন: দেশের প্রতিটি স্কুল, হাসপাতাল, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও গণপরিবহন টার্মিনালে সার্বক্ষণিক পানি ও সাবানসহ হাত ধোয়ার স্থায়ী ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।

চলমান প্রচার কর্মসূচি: কেবল ১৫ অক্টোবরের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বছরজুড়ে গণমাধ্যম ও সোশ্যাল মিডিয়ায় আচরণগত পরিবর্তন সংক্রান্ত প্রচার চালানো।

প্রান্তিক অঞ্চলে সাবান বিতরণ: সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির অংশ হিসেবে অতিদরিদ্র পরিবারগুলোকে সস্তা ও সাশ্রয়ী মূল্যে সাবান প্রদানে সহযোগিতা করা।

হাত ধোয়া কোনো সাধারণ কাজ নয়, এটি একটি জীবনরক্ষাকারী অভ্যাস। বিশ্ব হাত ধোয়া দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে খুব সামান্য খরচ ও সময়ে জীবনঘাতী অনেক সংক্রামক রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব। সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি ব্যক্তিগত সচেতনতা ও পারিবারিক চর্চা জোরদার করার মাধ্যমেই বাংলাদেশ এই স্বাস্থ্যঝুঁকি থেকে মুক্ত একটি নিরোগ সমাজ গড়ে তুলতে সক্ষম হবে।

পড়ুন : নভেম্বরেই জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহে প্রস্তুত হচ্ছে রূপপুর

সা/

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন