সীমান্তের শূন্যরেখায় মায়ের শেষ মুখ দেখলেন বাংলাদেশি মেয়ে জান্নাতুল

মা আর মেয়ের মাঝে দূরত্ব খুব বেশি ছিল না। সীমান্তের ওপারে ভারতের একটি গ্রামে থাকতেন মা, আর এপারে বাংলাদেশের মেহেরপুরে মেয়ে। মাঝখানে ছিল আন্তর্জাতিক সীমান্ত আর কাঁটাতারের বেড়া। সেই সীমান্তের বাধায় জীবিত অবস্থায় দীর্ঘদিন মায়ের মুখ দেখতে পারেননি মেয়ে জান্নাতুল। অবশেষে মায়ের মৃত্যুর পর সীমান্তের শূন্যরেখায় দাঁড়িয়ে শেষবারের মতো মায়ের মুখ দেখার সুযোগ পেলেন তিনি। বিজিবি ও বিএসএফের সহযোগিতায় মা-মেয়ের শেষ এই সাক্ষাৎ এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি করে।

বিজ্ঞাপন

বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) সকাল ১০টার দিকে ভারতের দিক থেকে বৃদ্ধা জায়ারা খাতুনের মরদেহ নাজিরাকোনা সীমান্তের ১০৯ নম্বর প্রধান সীমান্ত পিলারের শূন্যরেখায় আনা হয়। সেখানে স্বামী ফিজির আলীকে সঙ্গে নিয়ে উপস্থিত হন জান্নাতুল। মায়ের নিথর দেহের পাশে দাঁড়িয়ে শেষবারের মতো মুখ দেখেন তিনি। দীর্ঘদিনের বিচ্ছেদ আর মাকে হারানোর বেদনায় ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ।

জানা গেছে, জায়ারা খাতুন ভারতের পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলার চাপড়া থানার মালিয়াপোতা গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন। তাঁর মেয়ে জান্নাতুলের বাড়ি বাংলাদেশের মেহেরপুরের মুজিবনগর উপজেলার ভবানীপুর গ্রামে। দুই গ্রামের দূরত্ব খুব বেশি না হলেও মাঝখানে আন্তর্জাতিক সীমান্ত থাকায় দীর্ঘদিন মায়ের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ পাননি জান্নাতুল।

বার্ধক্যজনিত কারণে ভারতের নিজ বাড়িতে মৃত্যুবরণ করেন জায়ারা খাতুন। মায়ের মৃত্যুর খবর জানার পর শেষবারের মতো তাঁর মুখ দেখার আকাঙ্ক্ষা জাগে জান্নাতুলের মনে। কিন্তু আন্তর্জাতিক সীমান্তের নিয়ম ও কাঁটাতারের বেড়ার কারণে মায়ের কাছে যাওয়া সহজ ছিল না। এমন পরিস্থিতিতে দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সহযোগিতায় মায়ের শেষ মুখ দেখার সুযোগ তৈরি হয়।

বৃহস্পতিবার সকালে সীমান্তের শূন্যরেখায় মরদেহ আনার পর জান্নাতুল সেখানে উপস্থিত হয়ে মায়ের মুখ দেখেন। এ সময় তাঁর সঙ্গে ছিলেন স্বামী ফিজির আলী। ঘটনাস্থলে বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবির হাবিলদার মো. শরিফুল ইসলাম এবং ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের ইন্সপেক্টর এস কে রায়সহ দুই দেশের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।

মায়ের শেষ মুখ দেখার এই মুহূর্তটি ছিল জান্নাতুলের জন্য অত্যন্ত আবেগের। যে মায়ের সঙ্গে জীবিত অবস্থায় দীর্ঘদিন দেখা হয়নি, সেই মায়ের নিথর দেহের সামনে দাঁড়িয়ে শেষ বিদায় জানানোর সুযোগ পেলেন তিনি। মায়ের স্নেহ, ভালোবাসা আর স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা সম্পর্কের এমন পরিণতি যে কতটা বেদনাদায়ক, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন।
এ ঘটনায় সীমান্তের কঠোর বাস্তবতার পাশাপাশি মানবিকতার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিকও সামনে এসেছে। আন্তর্জাতিক সীমান্ত দুই দেশের ভূখণ্ডকে আলাদা করলেও মানুষের পারিবারিক সম্পর্ক, আবেগ ও ভালোবাসাকে আলাদা করতে পারে না। একজন মেয়ের কাছে মায়ের শেষ মুখ দেখার আকাঙ্ক্ষা শুধু ব্যক্তিগত আবেগ নয়, এটি মা-মেয়ের চিরন্তন সম্পর্কেরই বহিঃপ্রকাশ।
জান্নাতুলের জীবনে মায়ের সঙ্গে শেষবার দেখা করার এই সুযোগ হয়তো দীর্ঘদিনের আক্ষেপ কিছুটা কমিয়েছে। তবে জীবিত অবস্থায় মায়ের সঙ্গে দেখা করতে না পারার বেদনা তাঁর মনে থেকে যাবে। মৃত্যুর পর মায়ের মুখ দেখতে পারলেও হারানো সময় আর ফিরে পাওয়ার সুযোগ নেই।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মানবিক উদ্যোগ দুই দেশের মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সহমর্মিতা ও সৌহার্দ্যের বার্তা বহন করে। সীমান্তের নিরাপত্তা রক্ষা করা বিজিবি ও বিএসএফের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। পাশাপাশি বিশেষ মানবিক পরিস্থিতিতে নিয়মের মধ্যে থেকে সহযোগিতার উদ্যোগ মানুষের কাছে ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে।
জায়ারা খাতুনের মৃত্যুর পর মেয়ে জান্নাতুলের শেষবারের মতো মায়ের মুখ দেখার এই ঘটনা তাই শুধু একটি সীমান্তের খবর নয়; এটি বিচ্ছেদ, ভালোবাসা, হারানোর বেদনা এবং মানবিকতার গল্প। যে কাঁটাতারের বেড়া দীর্ঘদিন মা-মেয়ের সাক্ষাতের পথে বাধা হয়ে ছিল, সেই সীমান্তের শূন্যরেখাতেই শেষবারের মতো মায়ের মুখ দেখার সুযোগ পেলেন জান্নাতুল।
সীমান্তের দুই পাশে দুটি দেশ, মাঝখানে কাঁটাতারের বেড়া—কিন্তু মায়ের প্রতি সন্তানের ভালোবাসা সব সীমারেখার ঊর্ধ্বে। বিজিবি ও বিএসএফের সহযোগিতায় মায়ের শেষ মুখ দেখার এই সুযোগ সীমান্তের কঠিন বাস্তবতার মধ্যেও মানবিকতার এক স্মরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।

পড়ুন:বইয়ের ভেতর ইয়াবার চালান! নেত্রকোনায় পুলিশের জালে পাচারকারী

ইমি/ ‎

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন