নতুন জাতীয় বেতনস্কেল অনুযায়ী দেশের সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধির আনুষ্ঠানিক প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। গত শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ ‘চাকরি (বেতন ও ভাতাদি) আদেশ, ২০২৬’ শীর্ষক এই সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন প্রকাশ করে। তবে সরকারি চাকরিজীবীরা চলতি অক্টোবর মাস থেকেই নবম জাতীয় পে-স্কেলের ভিত্তিতে বেতন পাওয়ার প্রস্তুতি নিলেও, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের বিষয়ে এই প্রজ্ঞাপনে তাৎক্ষণিক কোনো সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা রাখা হয়নি।
এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীরা যাতে দ্রুত নতুন বেতনকাঠামো অনুযায়ী বেতন-ভাতা পেতে পারেন, সে বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা চলছে বলে জানিয়েছেন মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক। তবে নতুন পে-স্কেলের মূল প্রজ্ঞাপনে এমপিওভুক্তদের বেতন নিয়ে কোনো দিকনির্দেশনা না থাকায়, সরকারি বেতনস্কেলের সঙ্গে তাদের বেতন সমন্বয় কীভাবে হবে—তা নিয়ে নতুন করে সংশয় তৈরি হয়েছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে যে, এই বিষয়ে পরবর্তী আদেশ জারি করবে অর্থ বিভাগ। তবে নির্দিষ্ট করে এখনই কিছু বলা যাচ্ছে না এবং প্রশাসনিক এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে কিছুটা সময় লাগবে। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারী এবং বিচার বিভাগীয় কর্মীদের নতুন বেতনস্কেল পুরোপুরি বাস্তবায়নে নভেম্বর বা ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত সময় গড়ায় যেতে পারে। বিশেষ করে এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে মাদরাসা ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে বেতন হিসাব করার প্রক্রিয়া এখনো হাতে-কলমে (অ্যানালগ পদ্ধতিতে) করতে হয় বিধায় প্রজ্ঞাপন জারিতে এই বিলম্ব ঘটছে।
এর আগে গত ১ সেপ্টেম্বর নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন স্পষ্ট করে বলেছিলেন যে, এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদেরও নতুন বেতনকাঠামোতে বেতন দেওয়া হবে। উল্লেখ্য, বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) তথ্যমতে, বর্তমানে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের অধীনে প্রায় ৩ লাখ ৯৮ হাজার, মাদরাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের অধীনে প্রায় পৌনে দুই লাখ এবং কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের অধীনে ২৩ হাজারের বেশি শিক্ষক-কর্মচারী কর্মরত রয়েছেন।
সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন পে-স্কেলের মূল বৈশিষ্ট্যসমূহ:
অর্থ বিভাগের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, নতুন এই বেতনকাঠামো চলতি বছরের গত ১ জুলাই থেকে কার্যকর ধরা হয়েছে। তবে পুরো নির্ধারিত বেতন একবারে কার্যকর না হয়ে ধাপে ধাপে বাস্তবায়িত হবে। ফলে জুলাই মাস থেকেই কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বর্ধিত বেতনের নির্ধারিত অংশ এবং সেই অনুযায়ী বকেয়া অর্থ পাবেন।
বাস্তবায়নের ধাপসমূহ: চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত নবম ও তদূর্ধ্ব গ্রেডের কর্মকর্তারা বাড়তি মূল বেতনের ৪০ শতাংশ এবং ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীরা বাড়তি মূল বেতনের ৫০ শতাংশ পাবেন। আগামী বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত নবম ও তদূর্ধ্ব গ্রেডের জন্য ৭০ শতাংশ এবং ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের জন্য ৭৫ শতাংশ কার্যকর হবে। এরপর ২০২৭ সালের ১ জুলাই থেকে নতুন বেতনকাঠামোয় নির্ধারিত পুরো বেতন কার্যকর হবে এবং ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে অন্যান্য সব ভাতা ও পেনশনভোগীদের সুবিধা কার্যকর হবে।
মূল বেতন বৃদ্ধি: নতুন কাঠামোয় গ্রেডভেদে মূল বেতন ১০০ থেকে সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। গ্রেড-২০-এর প্রারম্ভিক মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বেড়ে ২০ হাজার টাকা এবং গ্রেড-১-এর মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা হয়েছে।
বাড়িভাড়া ও চিকিৎসাভাতা: ঢাকা সিটি করপোরেশনে বাড়িভাড়ার হার ৪০ থেকে ৬০ শতাংশ এবং অন্যান্য এলাকায় তা কমিয়ে যথাক্রমে ৩০-৫০ ও ২৫-৪৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে; তবে মূল বেতন বাড়ায় প্রকৃত টাকার পরিমাণ বাড়বে। চিকিৎসাভাতা বয়সভেদে বাড়িয়ে ৫০ বছর পর্যন্ত ৩ হাজার, ৬০ বছর পর্যন্ত ৪ হাজার, ৭০ বছর পর্যন্ত ৫ হাজার এবং তার বেশি বয়সীদের জন্য ৬ হাজার টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব রয়েছে।
ইনক্রিমেন্ট ও অন্যান্য সুবিধা: বার্ষিক ইনক্রিমেন্টের ক্ষেত্রে গ্রেড-২০ থেকে ৬ পর্যন্ত ৫ শতাংশ, গ্রেড-৫ এ ৪ শতাংশ, গ্রেড-৪ ও ৩ এ ৩.৫ শতাংশ এবং গ্রেড-২ এ ২.৭৫ শতাংশ প্রস্তাব করা হয়েছে। এছাড়া সব গ্রেডের জন্য মোবাইল ভাতা (প্রথম থেকে পঞ্চম গ্রেডে ৫০০ টাকা ও ষষ্ঠ থেকে ২০তম গ্রেডে ১৫০ টাকা), যাতায়াত ভাতা ৬০০ টাকা, টিফিন ভাতা ৫০০ টাকা, ধোলাই ভাতা ৩০০ টাকা এবং বিশেষ চাহিদা-সম্পন্ন প্রতি সন্তানের জন্য ৩ হাজার টাকা (সর্বোচ্চ দুই সন্তান) নতুনভাবে চালুর প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে বাংলা নববর্ষ ভাতা ২০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশ করা হয়েছে এবং ২০২৪ সালের বিশেষ প্রণোদনা নতুন পে-স্কেল চালুর পর বাতিল হবে।
সরকারের হিসাব অনুযায়ী, এই নতুন বেতন কাঠামোর সুফল পাবেন প্রায় ২৪ লাখ সামরিক ও বেসামরিক কর্মচারী এবং সোয়া ৯ লাখ অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী ও অন্যান্য যোগ্য সুবিধাভোগী।
পড়ুন :
সা/


