আগামীকাল শুরু শারদীয় দুর্গোৎসব, সারাদেশে ৩৩,৮৫১ মণ্ডপে পূজার প্রস্তুতি

সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজার মূল আয়োজন আগামীকাল শুক্রবার থেকে শুরু হতে যাচ্ছে। এ উপলক্ষে ঢাক-ঢোল, কাঁসা ও শঙ্খের ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে উঠেছে সারাদেশের মণ্ডপগুলো। প্যান্ডেল নির্মাণ, অনন্য আলোকসজ্জা, প্রতিমা স্থাপন থেকে শুরু করে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান—সব ধরনের প্রস্তুতি এখন শেষ পর্যায়ে।

বিজ্ঞাপন

বৃহস্পতিবার সকালে রাজধানীর ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরে বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ ও ঢাকা মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটি যৌথভাবে এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে। সেখানে জানানো হয়, চলতি বছর দেশজুড়ে মোট ৩৩ হাজার ৮৫১টি মন্দির ও মণ্ডপে দুর্গোৎসব অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যা গত বছরের তুলনায় প্রায় ১ হাজার ৫০০টি বেশি।

সংবাদ সম্মেলনে পূজা উদযাপন পরিষদের পক্ষ থেকে মণ্ডপগুলোর নিরাপত্তা ও সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখতে ১১ দফা নির্দেশনা তুলে ধরা হয়। নির্দেশনার মধ্যে রয়েছে—স্থানীয় প্রশাসন, সেনাবাহিনী, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, রাজনৈতিক দল ও ছাত্র নেতৃত্বকে সম্পৃক্ত করা; সার্বক্ষণিক নিজস্ব স্বেচ্ছাসেবকদের মাধ্যমে দিনরাত পাহারা নিশ্চিত করা এবং তাদের তালিকা নিকটস্থ থানায় জমা দেওয়া। এছাড়া সংখ্যালঘু সুরক্ষা আইন প্রণয়ন, জাতীয় সংখ্যালঘু কমিশন ও পৃথক মন্ত্রণালয় গঠনসহ ৮ দফা দাবিও তুলে ধরা হয় সংবাদ সম্মেলনে।

সরকার নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে দুর্গাপূজার ছুটি তিন দিন বর্ধিত করায় সন্তোষ প্রকাশ করে কেন্দ্রীয় কমিটি। বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি বাসুদেব ধর বলেন, ‘এটি সত্যিই একটি ইতিবাচক সিদ্ধান্ত। এমন সিদ্ধান্তের জন্য আমরা প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানাই।’ সাপ্তাহিক ছুটিসহ এবার সনাতন ধর্মাবলম্বীরা টানা ৫ দিনের ছুটি উপভোগ করতে পারবেন।

নিরাপত্তা ও সরকারি ব্যবস্থাপনা:

দুর্গাপূজাকে নিরাপদ ও উৎসবমুখর করতে বাংলাদেশ পুলিশ বিশেষ দিকনির্দেশনা ও পরামর্শ জারি করেছে। জরুরি সহায়তায় পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস বা জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বরে যোগাযোগের অনুরোধ জানানো হয়েছে। দেশের প্রতিটি মণ্ডপের সুরক্ষায় পুলিশ, আনসার, বিজিবি ও র‍্যাবের পাশাপাশি কাজ করবে স্বেচ্ছাসেবক দল। ঢাকেশ্বরী মন্দির মেলাঙ্গনে একটি কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ কক্ষ চালু রাখা হবে।

এছাড়া স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে মণ্ডপগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আয়োজকদের সার্বক্ষণিক জেনারেটর প্রস্তুত রাখতে এবং জরুরি পরিস্থিতির জন্য বিকল্প হিসেবে রিচার্জেবল বাতি রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সরকারি অনুদানও ৪ কোটি থেকে বাড়িয়ে ৫ কোটি টাকা করা হয়েছে।

পঞ্জিকা অনুযায়ী পূজার সময়সূচি ও গুরুত্ব:

পঞ্জিকামতে, শুক্রবার ‘মহা ষষ্ঠী’তে দেবী দুর্গার আনুষ্ঠানিক ‘বোধন’ বা জাগরণের মধ্য দিয়ে পূজার সূচনা ঘটবে। এরপর শনিবার ও রোববার দু’দিন ধরে থাকবে ‘মহা সপ্তমী’র তিথি, যেখানে ‘নবপত্রিকা’ বা নয়টি উদ্ভিদের স্নান ও পূজার আনুষ্ঠানিকতা রয়েছে। সোমবার উদযাপিত হবে ‘মহা অষ্টমী’, যার মূল আকর্ষণ ‘সন্ধিপূজা’। মঙ্গলবার ‘মহা নবমী’তে প্রধান পূজা সম্পন্ন করে দেবীকে ‘ভোগ’ নিবেদন করা হবে। অবশেষে বুধবার (২১ অক্টোবর) বিজয়া দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনের মাধ্যমে সমাপ্তি ঘটবে পাঁচ দিনব্যাপী এই উৎসবের।

পঞ্জিকা অনুসারে, এবার দেবী দুর্গা মর্ত্যে আগমন করবেন ঘোড়ায় চড়ে এবং স্বর্গলোকে গমন করবেন নৌকায়। হিন্দুশাস্ত্র মতে, দেবী দুর্গা ভক্তদের যাবতীয় দুঃখ, ভয় ও জ্বালা-যন্ত্রণা থেকে রক্ষা করেন। ‘মহা চন্ডী’র তথ্যমতে, ত্রেতা যুগে রামচন্দ্র রাবণের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জয়লাভ এবং সীতাকে উদ্ধারের উদ্দেশ্যে শরৎকালে দেবী মহামায়ার পূজা করেছিলেন। সেই থেকেই শরৎকালে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা এই দুর্গোৎসব পালন করে আসছেন।

উৎসবের পরিবেশ ও সম্প্রীতি:

এর আগে গত ১০ অক্টোবর মহালয়ার মধ্য দিয়ে দেবীর আবাহন সূচিত হয়েছিল। এখন শেষ মুহূর্তে রাজধানীসহ দেশের মণ্ডপগুলো শৈল্পিক সাজসজ্জায় সেজে উঠেছে। ঢাকার ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির, রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশন, তাঁতীবাজার ও শাঁখারী বাজারসহ সর্বত্র চলছে ব্যাপক আয়োজন। ঢাকেশ্বরী মন্দিরে পূজার পাশাপাশি ভক্তিমূলক গান, বস্ত্র ও প্রসাদ বিতরণ, আরতি প্রতিযোগিতা এবং বিজয়া শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হবে।

দুর্গাপূজা কেবল একটি ধর্মীয় আচার নয়, এটি বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অনন্য প্রতীক। সনাতন ধর্মাবলম্বীসহ সকল নাগরিককে শারদীয় শুভেচ্ছা জানিয়েছেন হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতৃবৃন্দ।

পড়ুন : সৌদি আরবে মসজিদের পবিত্রতা লঙ্ঘনের দায়ে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর

সা/

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন