কেন্দুয়ায় স্কুলছাত্রীকে ধর্ষণচেষ্টা: বিচারের বদলে সালিশ?

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিশুদের কাছে নিরাপদ আশ্রয়স্থল- এমনটাই আমাদের বিশ্বাস। সেই নিরাপদ আশ্রয়ই যখন আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তখন অভিভাবকেরা সন্তানদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন না হয়ে পারেন না। নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলার মজলিশপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে এমনই উদ্বেগজনক ও অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে। নতুন পাঠ্যবই দেওয়ার কথা বলে ষষ্ঠ শ্রেণির এক শিশু শিক্ষার্থীকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ উঠেছে বিদ্যালয়টির দপ্তরি দিদারুল আলম ওরফে বিদ্যুতের বিরুদ্ধে।

বিজ্ঞাপন

বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) সকালের দিকে বিদ্যালয়ের একটি নির্জন কক্ষে এ ঘটনা ঘটে। স্থানীয় ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণে জানা যায়, ভুক্তভোগী ওই ছাত্রী তার একটি পাঠ্যবই হারিয়ে ফেলায় দপ্তরির কাছে নতুন বইয়ের খোঁজ করতে গিয়েছিল। বিদ্যালয়ের শিক্ষক মো. নাসির উদ্দিনও ছাত্রীর বই হারানোর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

অভিযোগ উঠেছে, আজ সকাল ৯টার দিকে স্কুলে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কম থাকার সুযোগ নেয় ধূর্ত দপ্তরি বিদ্যুৎ। সে বই দেওয়ার ছল করে ওই শিশু শিক্ষার্থীকে একটি ফাঁকা কক্ষে নিয়ে যায় এবং শ্লীলতাহানির চেষ্টা চালায়। একপর্যায়ে শিশুটি সাহসিকতার সঙ্গে ধস্তাধস্তি করে নিজেকে ছাড়িয়ে নেয় এবং কাঁদতে কাঁদতে স্কুল থেকে দৌড়ে পালিয়ে আসে। স্থানীয়রা তার কান্নার কারণ জানতে চাইলে সে দপ্তরির ওই পাশবিক আচরণের কথা খুলে বলে।

যেকোনো ফৌজদারি অপরাধের পর দ্রুত আইনি পদক্ষেপ নেওয়াটাই নিয়ম। এক্ষেত্রে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের ভূমিকা নিয়ে তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। বিদ্যালয় ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি মো. শফিকুল ইসলাম (দিলু মাস্টার) ঘটনার সত্যতা স্বীকার করেছেন। তিনি জানান, বিষয়টি জানার পর অভিযুক্ত দপ্তরিকে মৌখিকভাবে স্কুল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। তবে বৃহস্পতিবার প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো লিখিত নির্দেশনা জারি হয়নি।

সবচেয়ে বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, এমন গুরুতর অপরাধের বিচার স্থানীয়ভাবে ‘সালিশের’ মাধ্যমে নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সভাপতি নিজেই জানিয়েছেন, আগামীকাল শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) সালিশের মাধ্যমে বিষয়টি মীমাংসার দিন ধার্য করা হয়েছে।

ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে স্থানীয় প্রভাবশালী মহল উঠেপড়ে লেগেছে। জানা গেছে, পেমই তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ (আইসি) আসাদুজ্জামানের উপস্থিতিতেই বিদ্যালয়ের অ্যাডহক কমিটির সদস্য ও উপজেলা বিএনপির মৎস্যবিষয়ক সম্পাদক শফিকুল ইসলাম শফিক এমন একটি স্পর্শকাতর ঘটনাকে ‘কোনো ব্যাপার না’ বলে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেন। পাশাপাশি তিনি আপাতত সংবাদ প্রকাশ না করার জন্যও গণমাধ্যমকর্মীকে অনুরোধ জানান।

শুধু তাই নয়, মজলিশপুর গ্রামের আবু চান মিয়ার (৫৫) নেতৃত্বে একদল গ্রামবাসী সাংবাদিকদের তথ্য সংগ্রহে সরাসরি বাধা প্রদান করে। এদিকে ঘটনার পর থেকে ভুক্তভোগী শিশু ও অভিযুক্ত- উভয়ের বাড়িই তালাবদ্ধ পাওয়া গেছে। স্থানীয়দের ধারণা, এলাকার প্রভাবশালীদের প্রবল চাপের মুখে পড়ে ভুক্তভোগীর পরিবার আত্মগোপনে যেতে বাধ্য হয়েছে। ফলে তাদের সরাসরি কোনো বক্তব্য বা প্রতিক্রিয়া জানা সম্ভব হয়নি।

সালিশের নামে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টায় সাধারণ মানুষের মাঝে চরম ক্ষোভ বিরাজ করছে। স্থানীয় বাসিন্দা আতিক মিয়া ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেন, “একটি পক্ষ ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করছে। আমরা এ ঘটনার সুষ্ঠু ও আইনানুগ বিচার চাই। স্কুল ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি বিনা বিচারে তাকে কেন ছেড়ে দিলেন? তাকে কেন পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হলো না?”

এ বিষয়ে পুলিশ প্রশাসনের অবস্থান জানতে চাইলে কেন্দুয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুহাম্মদ তরিকুল ইসলাম জানান, খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পেমই তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জকে পাঠানো হয়েছে। ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষ থেকে লিখিত অভিযোগ পেলে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

যৌন নিপীড়নের মতো গুরুতর অপরাধ যেখানে প্রচলিত আইনে কঠোরভাবে শাস্তিযোগ্য, সেখানে সালিশের মাধ্যমে তা মীমাংসার উদ্যোগ সচেতন মহলে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, দ্রুততম সময়ের মধ্যে নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করে দোষীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং ভুক্তভোগী শিশুটির পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হোক, যাতে ভবিষ্যতে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে।

পড়ুন:দুর্গোৎসবে বিএনপির নেতা কর্মীরা প্রহরীর দায়িত্ব পালন করবেন

ইমি/ ‎

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন