জন্ম অন্য দেশে হলেও জীবনের বড় একটি অংশ কেটেছে ভারতে। পড়াশোনা, কর্মজীবন, সাফল্য, ব্যর্থতা থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত জীবনের নানা স্মৃতি—সবকিছুর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে দেশটির নাম। অথচ প্রতিবাদ কর্মসূচিতে অংশ নেওয়াকে কেন্দ্র করে এবার সেই ভারতই ছাড়ার নির্দেশ পেয়েছেন বলিউড অভিনেতা ইমরান খান। আগামী ২৮ অক্টোবরের মধ্যে দেশ ছাড়তে বলা হয়েছে তাঁকে। এ ঘটনায় ইমরানের পাশে দাঁড়িয়েছেন নির্মাতা কিরণ রাও ও অভিনেত্রী সাবা আজাদ। সামাজিক মাধ্যমে তাঁরা অভিনেতার প্রতি সমর্থন জানিয়ে এ সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) মুম্বাইয়ের বিদেশি নাগরিকদের আঞ্চলিক নথিভুক্তিকরণ দপ্তর (এফআরআরও) ইমরানকে ভারত ছাড়ার নির্দেশ দিয়ে নোটিশ জারি করে। মার্কিন পাসপোর্টধারী এই অভিনেতার কাছে রয়েছে ওভারসিজ সিটিজেন অব ইন্ডিয়া (ওসিআই) কার্ড। গত ১০ অক্টোবর মুম্বাইয়ের আগস্ট ক্রান্তি ময়দানে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে আয়োজিত এক প্রতিবাদ কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছিলেন তিনি। অভিবাসন ও বিদেশি নাগরিক আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে তাঁকে নোটিশ দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। বিজেপি নেতা কিরীট সোমাইয়ার অভিযোগের পর এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
ভারত ছাড়ার নির্দেশের খবর প্রকাশ্যে আসার পর সামাজিক মাধ্যমে প্রতিক্রিয়া জানান নির্মাতা কিরণ রাও। ইমরানের সঙ্গে ভারতের দীর্ঘদিনের সম্পর্কের কথা তুলে ধরে তিনি প্রশ্ন তোলেন, জীবনের প্রায় পুরোটা সময় যে দেশে কাটিয়েছেন, সেখান থেকে তাঁকে চলে যেতে বলা কতটা বিস্ময়কর।
প্রথমে বিস্ময় প্রকাশ করে কিরণ লেখেন, ‘বাহ, এবার মুম্বাই পুলিশও?’ এরপর ইমরানের বয়স ও ভারতে তাঁর বেড়ে ওঠার প্রসঙ্গ তুলে ধরে কিরণ লেখেন, ‘৪৩ বছর বয়স। এর মধ্যে ৪০ বছরই ভারতে। এখানেই পড়াশোনা করেছে, কাজ করেছে, সাফল্য পেয়েছে, ব্যর্থ হয়েছে, ভালোবেসেছে এবং লড়াই করেছে।’
কিরণের এই মন্তব্য সামাজিক মাধ্যমে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তাঁর বক্তব্যে উঠে এসেছে, ইমরানের জীবনের দীর্ঘ সময় ভারতের সঙ্গে যুক্ত থাকার বিষয়টি। দেশটির বিনোদনজগতে কাজ করার পাশাপাশি ব্যক্তিগত জীবনেও ভারতে তাঁর বহু স্মৃতি রয়েছে।
উল্লেখ্য, কিরণ রাও বলিউড অভিনেতা আমির খানের সাবেক স্ত্রী। ইমরান খান সম্পর্কে আমির খানের ভাগনে। পারিবারিক সম্পর্কের বাইরেও ইমরানের প্রতি সমর্থন জানিয়ে কিরণ সামাজিক মাধ্যমে নিজের প্রতিক্রিয়া তুলে ধরেছেন।
ইমরানের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন অভিনেত্রী সাবা আজাদও। এফআরআরওর নোটিশের খবর সামনে আসার পর তিনি সামাজিক মাধ্যমে বিস্ময় প্রকাশ করেন। সংক্ষিপ্ত প্রতিক্রিয়ায় সাবা লেখেন, ‘কী! এটা একেবারেই উদ্ভট!’
ইমরানকে ভারত ছাড়ার নির্দেশ দেওয়ার ঘটনায় বিনোদনজগতের পরিচিত ব্যক্তিদের এমন প্রতিক্রিয়া বিষয়টিকে আরও আলোচনায় নিয়ে এসেছে। তবে নোটিশের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিস্তারিত ব্যাখ্যা এবং আইনি প্রক্রিয়ার পরবর্তী পদক্ষেপের দিকেও নজর রয়েছে।
গত ১০ অক্টোবর মুম্বাইয়ের আগস্ট ক্রান্তি ময়দানে প্রতিবাদ কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার পর ইমরান খান, তাঁর সঙ্গী লেখা ওয়াশিংটন এবং চাচাতো বোন জেইন মেরি খানকে সাময়িকভাবে আটক করেছিল মুম্বাই পুলিশ। কর্মসূচিতে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবি জানানো হয়েছিল।
আটকের পর পুলিশের গাড়িতে বসে তোলা একটি ছবি সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশ করেন ইমরান। ছবির সঙ্গে রসিকতার সুরে তিনি লেখেন, ‘মনে হচ্ছে, গাড়িতে করে ঘুরতে যাচ্ছি।’
আটকের আগে সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেও নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছিলেন অভিনেতা। তিনি জানিয়েছিলেন, কোনো ব্যক্তিগত দাবি নিয়ে সেখানে যাননি; বরং একজন নাগরিক এবং ওই শহরে বসবাসকারী মানুষ হিসেবে প্রতিবাদে অংশ নিয়েছিলেন।
ইমরান বলেন, ‘আমার কোনো দাবি নেই। আমি এখানে একজন নাগরিক হিসেবে, এই শহরে বসবাসকারী একজন মানুষ হিসেবে এসেছি। কেন মানুষের চলাফেরার স্বাধীনতা সীমিত করা হচ্ছে, কেন মানুষের কণ্ঠস্বর দমিয়ে রাখা হচ্ছে, সেটাই দেখতে এসেছি।’
তাঁর বক্তব্যে নাগরিক অধিকার, চলাফেরার স্বাধীনতা এবং মানুষের মতপ্রকাশের সুযোগের বিষয়গুলো উঠে আসে।
ভারত ছাড়ার নির্দেশের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছেন ইমরান খান। তাঁর আইনজীবীর দাবি, ওসিআই কার্ডধারীদের প্রতিবাদ কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া নিষিদ্ধ—এমন নির্দিষ্ট বিধান সংশ্লিষ্ট আইনে নেই।
এ কারণে নোটিশের আইনি ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবে ইমরানের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ, সংশ্লিষ্ট অভিবাসন আইনের বিধান এবং কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের বৈধতা নিয়ে চূড়ান্ত অবস্থান নির্ধারণে আইনি প্রক্রিয়া গুরুত্বপূর্ণ হবে।
ওসিআই কার্ডধারীরা ভারতীয় নাগরিক নন; তাঁদের ভারতে বসবাস ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা নির্দিষ্ট নিয়মের অধীন। ফলে এ ধরনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট আইন ও বিধিনিষেধের ব্যাখ্যা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ইমরানের আইনজীবী সেই আইনি কাঠামোর মধ্যেই নোটিশের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছেন।
সব মিলিয়ে প্রতিবাদ কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার পর ইমরান খানের ভারত ছাড়ার নির্দেশ পাওয়ার ঘটনা বলিউড ও সামাজিক মাধ্যমে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। কিরণ রাও ও সাবা আজাদের প্রকাশ্য প্রতিক্রিয়ায় বিষয়টি আরও গুরুত্ব পেয়েছে। এখন ইমরানের আইনি পদক্ষেপ এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পরবর্তী সিদ্ধান্তের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন তাঁর সমর্থকেরা।
পড়ুন:হলিউডের তারকাবহুল ‘স্ট্রিট ফাইটার’ ও দেশীয় ৩ ছবি মুক্তি পাচ্ছে দুর্গাপূজায়
ইমি/


