সেনাবাহিনীর প্রকৃত শক্তি শুধু অস্ত্র, সরঞ্জাম কিংবা জনবলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, শৃঙ্খলা, দক্ষতা, নেতৃত্ব, নৈতিকতা, প্রশিক্ষণ এবং জনগণের আস্থাই হলো একটি বাহিনীর মূল শক্তির ভিত্তি। দেশের সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থ সমুন্নত রাখতে সশস্ত্র বাহিনীকে আরও আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর, দক্ষ, শৃঙ্খলাবদ্ধ ও পেশাদার হিসেবে গড়ে তুলতে সরকারের কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
রোববার (১৮ অক্টোবর) সকালে সাভার সেনানিবাসে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সাতটি ইউনিটকে ‘ন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ড’ বা জাতীয় পতাকা প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। সাভার সেনানিবাসে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৯ পদাতিক ডিভিশনের তত্ত্বাবধানে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে ৭ ও ৩২ ফিল্ড রেজিমেন্ট আর্টিলারি, ২৫ এয়ার ডিফেন্স রেজিমেন্ট, ৯ ইঞ্জিনিয়ার ব্যাটালিয়ন, ৫৬ ও ৫৭ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট এবং প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্টকে ‘ন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ড’ বা জাতীয় পতাকা প্রদান করেন। জাতীয় পতাকা অর্জনকারী ইউনিটগুলোকে অভিনন্দন জানিয়ে তিনি বলেন, এই পতাকা শুধু একটি আনুষ্ঠানিক প্রতীক নয়; বরং এটি সংশ্লিষ্ট ইউনিটের গৌরবময় ইতিহাস, ঐতিহ্য, শৃঙ্খলা, আত্মত্যাগ এবং দেশের প্রতি অঙ্গীকারের প্রতীক। লাল-সবুজের এই পতাকার মান রক্ষা করা সকল সৈনিকের পবিত্র দায়িত্ব।
বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে সেনাবাহিনীর ঐতিহাসিক ভূমিকার কথা স্মরণ করে সরকারপ্রধান বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের সঙ্গে সেনাবাহিনীর জন্মের ইতিহাস অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর গণহত্যার বিরুদ্ধে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের বাঙালি সেনাসদস্যরা সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন।
ইতিহাস তুলে ধরে তিনি বলেন, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে চট্টগ্রামের অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের তৎকালীন উপ-অধিনায়ক মেজর জিয়াউর রহমান ‘উই রিভোল্ট’ উচ্চারণ করে সশস্ত্র সংগ্রামের নির্দেশ দেন এবং ২৭ মার্চ কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঐতিহাসিক ঘোষণা পাঠ করেন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও ঐতিহাসিক আত্মত্যাগের ধারাবাহিকতায় দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সেনাবাহিনীকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে তিনি বলেন, বিভিন্ন সময়ে সশস্ত্র বাহিনীর সুনাম ও ভাবমূর্তি বিনষ্টের অপচেষ্টা চালানো হলেও দেশপ্রেমিক জনগণ সেনাবাহিনীর যেকোনো সাফল্যকে দেশের সাফল্য বলেই মনে করে।
বর্তমান বিশ্বের পরিবর্তিত নিরাপত্তা পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যুদ্ধের ধরন ও কৌশল দ্রুত বদলাচ্ছে। স্থল, সমুদ্র ও আকাশের পাশাপাশি সাইবার স্পেস, মহাকাশ, ড্রোন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ এবং তথ্যভিত্তিক সক্ষমতা বর্তমানে জাতীয় নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রতিরক্ষা প্রস্তুতি এগিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি প্রতিরক্ষাসামগ্রী দেশীয়ভাবে উৎপাদনের লক্ষ্যে প্রতিরক্ষা শিল্প প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। তবে প্রযুক্তি কখনোই মানুষের বিকল্প নয় উল্লেখ করে তিনি সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর মধ্যে সমন্বিত সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর জোর দেন।
সশস্ত্র বাহিনীর বহুমুখী অবদানের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, দেশের প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করার পাশাপাশি দুর্যোগ, বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও জরুরি পরিস্থিতিতে সশস্ত্র বাহিনী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। পাশাপাশি বিদেশের শান্তিরক্ষা মিশনেও দেশের সদস্যরা সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন।
সেনাসদস্যদের জীবনমান উন্নয়নের বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে তাদের আবাসন, চিকিৎসা, শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও ক্যারিয়ার উন্নয়নকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। জাতীয় পে-স্কেলে সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের বেতন ও ভাতা ১০০ শতাংশ থেকে ১৩৮ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়েছে এবং সেনাসদস্যদের জন্য ‘ওয়ান র্যাঙ্ক, ওয়ান পেনশন’ বাস্তবায়নের বিষয়টি বর্তমানে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে সংবিধান, আইন, সামরিক বিধিবিধান এবং মানবিক মূল্যবোধের প্রতি অবিচল থাকার জন্য সেনাসদস্যদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সমতার ভিত্তিতে সব দেশের সঙ্গে বন্ধুত্ব ও সহযোগিতা সুদৃঢ় করতেই আগামীর বাংলাদেশ কাজ করে যাবে।
অনুষ্ঠানে মন্ত্রিপরিষদের সদস্যবৃন্দ, প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা, সেনাবাহিনী ও নৌবাহিনীর প্রধান, সংসদ সদস্যসহ সামরিক ও বেসামরিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
পড়ুন : তিবন্ধীদের দাবি বাস্তবায়নে নেয়া হচ্ছে কার্যকর উদ্যোগ…
সা/


