রাজধানীর ঐতিহাসিক ওসমানী উদ্যানে নবনির্মিত ‘জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ’ ও আধুনিকায়ন করা পুরো উদ্যানের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সোমবার (১৯ অক্টোবর) সকাল ১০টায় প্রধানমন্ত্রী উদ্বোধনীস্থলে উপস্থিত হয়ে ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে স্মৃতিস্তম্ভটি উন্মোচন করেন।
উদ্বোধনের সময় শহীদ আবু সাঈদের বাবা মো. মকবুল হোসেন, মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধের বাবা মোস্তাফিজুর রহমান, শাহারিয়ার খাঁন আনাসের মা সানজিদা খান দীপ্তি এবং ওয়াসিম আকরামের বাবা মোহাম্মদ শফিউল আলম প্রধানমন্ত্রীর পাশে উপস্থিত ছিলেন। পরে স্মৃতিস্তম্ভ প্রাঙ্গণে একটি গাছের চারা রোপণ করেন তিনি। উদ্বোধনী আনুষ্ঠানিকতা শেষে প্রধানমন্ত্রী সংস্কার ও আধুনিকায়ন করা ওসমানী উদ্যান প্রাঙ্গণ ঘুরে দেখেন এবং উদ্যানের পাশে নির্মিত আধুনিক গ্রন্থাগারও পরিদর্শনে যান।
এসময় প্রধানমন্ত্রী বলেন, রাজনৈতিক বিরোধিতা করতে গিয়ে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগকে ফিরিয়ে আনার অপচেষ্টা চালানো হলে তা জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শহীদদের রক্তের সঙ্গে প্রতারণা করা হবে। একই সঙ্গে তিনি বিরোধীদলকে গঠনমূলক সমালোচনার রাজনীতি করার আহ্বান জানান।
প্রধানমন্ত্রী স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন, সব বিষয়ে সবার একমত হওয়ার প্রয়োজন না থাকলেও দেশের মানুষের স্বার্থ ও কল্যাণের ক্ষেত্রে দ্বিমত পোষণ করার কোনো সুযোগ নেই। বিরোধীদলের বর্তমান ভূমিকার সমালোচনা করে তিনি বলেন, বিরোধীদল কেবল বিরোধিতা করার খাতিরেই বিরোধিতা করে যাচ্ছে। তারা জুলাইয়ের চেতনাকে ধারণ করে না বলেই ‘জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ’ উদ্বোধনের মতো অনুষ্ঠানে আনুষ্ঠানিকভাবে আমন্ত্রণ জানানো সত্ত্বেও অংশ নেয়নি। এর মাধ্যমে বিরোধীদল তাদের পুরোনো রূপে ফিরে এসেছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সংগ্রাম ও আন্দোলনের ইতিহাস তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মূল লক্ষ্যই ছিল এক ও অভিন্ন—জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করা। জুলাই আন্দোলনের মধ্য দিয়েই এ দেশের মানুষ তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে। নবনির্মিত জুলাই স্মৃতিস্তম্ভে ৮১৩ জন শহীদের নাম খোদাই করা রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, “এসব শহীদের রক্তের বিনিময়ে বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক অধিকার ফিরে পেয়েছে। গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠা হয়েছে। জনগণ তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে জাতীয়তাবাদী দলকে বেছে নিয়েছে দেশ পরিচালনার জন্য। যারা আগামী পাঁচ বছর দেশ পরিচালনা করবে।”
জনস্বার্থমূলক বিষয়ে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার পরামর্শ দিয়ে ডেঙ্গু প্রতিরোধ কার্যক্রমে বিরোধীদলকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি মনে করিয়ে দেন, “এডিস মশা সরকারি কিংবা বিরোধীদল চেনে না।”
অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী আবদুল মঈন খান, প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আবদুস সালাম এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন উপস্থিত ছিলেন।
জুলাই স্মৃতিস্তম্ভের বিশেষ বৈশিষ্ট্য
২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে প্রাণ হারানো শহীদদের স্মৃতি সংরক্ষণ এবং রাজধানীর নাগরিক পরিবেশ উন্নত করার লক্ষ্যে এ সমন্বিত প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হয়। প্রায় এক একর জমির ওপর নির্মিত হয়েছে ৯০ ফুট উঁচু ‘জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ’। স্টিলের ওপর লেজার কাটিং প্রযুক্তির মাধ্যমে এতে খোদাই করা হয়েছে ৮৩৪ জন শহীদের নাম এবং সামনে স্থাপন করা হয়েছে ২০টি প্রতীকী সমাধিফলক। স্মৃতিস্তম্ভ প্রাঙ্গণে ১৬৩ ফুট দীর্ঘ ও সাড়ে ৪ ফুট উঁচু বাইরের রিলিফ ভাস্কর্য এবং ১৭১ ফুট দীর্ঘ ও সাড়ে ৭ ফুট উঁচু ভেতরের রিলিফ ভাস্কর্য সংযুক্ত করা হয়েছে। এসব ভাস্কর্যের মধ্য দিয়ে ১৯৫২-র ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৯০-এর গণআন্দোলন থেকে শুরু করে ২০২৪-এর জুলাই গণঅভ্যুত্থান পর্যন্ত বাংলাদেশের ধারাবাহিক সংগ্রাম ও ইতিহাস ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
আধুনিক রূপে ওসমানী উদ্যান
পুরান ও নতুন ঢাকার মিলনস্থলে অবস্থিত ২৩ একরের ঐতিহ্যবাহী ওসমানী উদ্যানকে একটি সবুজ, নিরাপদ ও সর্বাধুনিক নাগরিক বিনোদনকেন্দ্র হিসেবে রূপান্তর করা হয়েছে। সংস্কারকৃত পুরোনো জলাশয়ের পাশাপাশি এখানে নির্মিত হয়েছে নতুন পাঁচটি জলাশয়। উদ্যানের মূল গাছপালা অক্ষুণ্ণ রেখে নতুন বৃক্ষরোপণ ও সবুজ দ্বীপ তৈরি করা হয়েছে।
দর্শনার্থীদের শরীরচর্চা ও অবসরের জন্য এতে রয়েছে প্রায় ৩.১ কিলোমিটার দীর্ঘ হাঁটার পথ, জিমনেশিয়াম/ব্যায়ামাগার, প্যাগোডা, জলাশয়ের ঘাট, পার্কিং ও আধুনিক গণশৌচাগার। এছাড়া উদ্যানে ৫০ হাজার লিটার ধারণক্ষমতাসম্পন্ন বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। উদ্যানটির যোগাযোগ ও চলাচলের সুবিধার্থে মূল সড়ক থেকে দুই মিটার উঁচুতে দুই স্তরের বিশেষ পথও তৈরি করা হয়েছে।
পড়ুন : বাংলাদেশ-জাপান ঐতিহাসিক ইএসডিপি-এমওসি চুক্তি সই: ২০২৭ সাল থেকে শুরু হচ্ছে কর্মী নিয়োগ
সা/


