জমি আছে, বাড়ি আছে—নেই শুধু বের হওয়ার পথ! দুই সন্তান নিয়ে পথের জন্য অসহায় মায়ের আকুতি

একজন মায়ের কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সম্পদ তাঁর সন্তান। সন্তানদের নিয়ে নিরাপদে বেঁচে থাকা, নিজের ঘরে নিশ্চিন্তে রাত কাটানো আর প্রতিদিনের জীবনটা একটু স্বাভাবিকভাবে চালিয়ে নেওয়া এ তো খুব সাধারণ একটি স্বপ্ন। কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণ করতে গিয়েই যদি প্রতিদিন বাধার মুখে পড়তে হয়, নিজের বাড়িতে যাতায়াতের পথটুকুও যদি অনিশ্চিত হয়ে ওঠে, তাহলে সেই কষ্টের ভার বইবেন কীভাবে একজন মা?

বিজ্ঞাপন

মাদারীপুর সদর উপজেলার পেয়ারপুর ইউনিয়নের নাজমা আক্তারের জীবনে আজ যেন সেই নির্মম বাস্তবতাই নেমে এসেছে। জমি আছে, মাথা গোঁজার মতো বাড়ি আছে, পাশে আছে দুই সন্তান কিন্তু নেই নিজের বাড়ি থেকে নির্বিঘ্নে বের হওয়ার নিশ্চয়তা। পরিবারের দাবি, বাড়ি থেকে প্রধান সড়কে যাতায়াতের জন্য জমি কেনা হলেও বিরোধের কারণে সেখানে চলাচলের পথ তৈরি করতে পারছেন না তাঁরা। ফলে সন্তানদের নিয়ে জলাবদ্ধ ক্ষেত পেরিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন নাজমা আক্তার।

একটি পথের অভাব যেন আটকে দিয়েছে একটি পরিবারের স্বাভাবিক জীবন। যে পথে সন্তানদের স্কুলে যাওয়ার কথা, যে পথে একজন মা নিশ্চিন্তে বাজারে যাবেন, প্রয়োজনীয় কাজ সারবেন, সেই পথ নিয়েই বছরের পর বছর অনিশ্চয়তা।

নাজমার স্বামী নুরুল হক মাতুব্বর জীবিকার তাগিদে প্রবাসে থাকেন। স্বামীর অনুপস্থিতিতে দুই সন্তানকে নিয়ে সংসার সামলানোর পাশাপাশি চলাচলের পথ নিয়ে এমন ভোগান্তি তাঁর কষ্টকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

নাজমা আক্তার বলেন, “বাড়ি থেকে বের হওয়ার জন্য আমার স্বামী জমি কিনেছেন। কিন্তু সেই জমি দিয়ে চলাচল করতে পারছি না। বাধ্য হয়ে জলাবদ্ধ ক্ষেতের মধ্য দিয়ে যাতায়াত করতে হচ্ছে। দুই সন্তানকে নিয়ে প্রতিদিন অনেক কষ্ট করতে হয়। তাদের স্কুলে যাওয়া-আসা থেকে শুরু করে সংসারের প্রয়োজনীয় কাজ—সবকিছুতেই সমস্যা হচ্ছে। আমি চাই, প্রশাসন বিষয়টি তদন্ত করে আমাদের বাড়ি থেকে বের হওয়ার পথের ব্যবস্থা করে দিক।”

ভুক্তভোগী পরিবার সূত্রে জানা যায়, মাদারীপুর সদর উপজেলার ৭৬ নম্বর পেয়ারপুর মৌজার বিআরএস ৭৫৮ নম্বর খতিয়ানের ৪৯৫ নম্বর দাগে থাকা ৪১ শতাংশ জমির মধ্য থেকে ৩৫ শতাংশের অংশ হতে দুই শতাংশ জমি ২০২১ সালে রাস্তার জন্য ছিদ্দিক মাতুব্বরের কাছ থেকে কেনেন নুরুল হক মাতুব্বর।

স্থানীয়রা জানান, নুরুল হকের উদ্দেশ্য ছিল, বাড়ি থেকে বের হওয়ার জন্য একটি স্বাভাবিক পথ তৈরি করা, যাতে পরিবারের সদস্যরা প্রতিদিন নির্বিঘ্নে চলাচল করতে পারেন।জমি কেনার পরও সেই জমি দিয়ে পথ তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে না। ছিদ্দিক মাতুব্বরের ভাতিজা, সাবেক ইউপি সদস্য ও আওয়ামী লীগ নেতা আশরাফ মাতুব্বর জমিটি নিজের দখলে রেখে চলাচলে বাধা দিচ্ছেন। এমনকি পথ বন্ধ করে বেড়া দেওয়ার অভিযোগও তুলেছেন স্থানীয় ভুক্তভোগী পরিবাররা।

স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, “আমরা চাই, নুরুল হকের পরিবার তাদের কেনা জমি দিয়ে রাস্তা তৈরি করে নির্বিঘ্নে চলাচল করতে পারুক। একটি পরিবারের নারী ও শিশুদের এভাবে দুর্ভোগ পোহাতে হবে এটা আমরা চাই না। সরকার ও প্রশাসনের কাছে আমাদের দাবি, বিষয়টি তদন্ত করে ন্যায়সংগত সমাধান করা হোক।”

পরিবারটির দাবি, এ পরিস্থিতিতে শিশুদের স্কুলে যাতায়াতসহ দৈনন্দিন নানা কাজে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। তবে জমির মালিকানা ও চলাচলের অধিকার নিয়ে বিরোধের বিষয়টি তদন্ত এবং সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র যাচাই করে দেখা প্রয়োজন।

স্থানীয়দেরও একই অভিযোগ, চান ন্যায্য সমাধান

এলাকার বাসিন্দা শাহানুর মাতুব্বর, বৈশাখী বাড়ৈ, সেলিম হোসেন, শিউলি আক্তার, রেশমা বেগম ও রুবায়েত হোসেনসহ কয়েকজনের অভিযোগ, নুরুল হক মাতুব্বরের কেনা জমি দিয়ে চলাচল ও রাস্তা নির্মাণের ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করা হচ্ছে।

তাঁদের দাবি, বিষয়টি নিয়ে এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে অসন্তোষ রয়েছে। স্থানীয়দের কেউ কেউ আশরাফ মাতুব্বরের বিরুদ্ধে ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে খারাপ আচরণের অভিযোগও করেছেন।

জমির দাতা ছিদ্দিক মাতুব্বর বলেন, মানবিক দিক বিবেচনা করে বাড়িতে যাতায়াতের সুবিধার জন্য তিনি দুই শতাংশ জমি বিক্রি করেছিলেন। কিন্তু তাঁর ভাইয়েরা সেখানে রাস্তা নির্মাণে বাধা দিচ্ছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি। এ নিয়ে তাঁকেও বাধার মুখে পড়তে হচ্ছে বলে জানান।

অভিযোগের বিষয়ে যা বলছেন আশরাফ মাতুব্বর

চলাচলে বাধা দেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে সাবেক ইউপি সদস্য ও আওয়ামী লীগ নেতা আশরাফ মাতুব্বর বলেন, তিনি জমিটি পুনরায় কিনেছেন এবং এ বিষয়ে আদালতে সমাধান করবেন।

তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস পুলিশের

মাদারীপুর সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আবুল কালাম আজাদ বলেন, জমির মালিকানা ও চলাচলের অধিকারসংক্রান্ত বিরোধের সুষ্ঠু তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ‘কেউ কারও চলাচলের পথ আটকে রাখতে পারেন না’

মাদারীপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জাকিয়া সুলতানা বলেন, “কেউ কারও চলাচলের পথ আটকে রাখতে পারেন না, এটা বেআইনি। আমরা সরেজমিনে গিয়ে বিষয়টি তদন্ত করে দেখে একটা সমাধান করব। এ বিষয়ে ভুক্তভোগী পরিবার আমাদের কাছে অভিযোগ দিয়ে গেছে।”

নাজমা আক্তারের চাওয়া খুব বেশি কিছু নয়—নিজের বাড়ি থেকে বের হওয়ার একটি নিরাপদ পথ, সন্তানদের নিয়ে স্বাভাবিক জীবন এবং দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ থেকে মুক্তি।এখন দেখার বিষয়, সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের উদ্যোগে এই পরিবারের দীর্ঘদিনের সমস্যার কত দ্রুত ও ন্যায্য সমাধান হয়।

পড়ুন : জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী

সা/

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন