গণমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়া সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড হওয়া সুইটির ঠিকানা নিয়ে ধোঁয়াশার তৈরি হয়েছে। কেউ বলছে সুইটির বাড়ি টাঙ্গাইলে আবার কেউ বলছে বগুড়ায়। টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে সুইটির পরিবারের দাবি গণমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়া তাদের মেয়ের সাথে ছবির মিল নেই। তবে সুইটি সৌদি আরবের কারাগারে রয়েছেন, গত মঙ্গলবারও পরিবারের সাথে তাদের কথা হয়েছে। এদিকে টাঙ্গাইলের সংশ্লিষ্ট প্রশানের কাছেও সুনিদিষ্ট কোন তথ্য নেই।
সুইটির বাড়ি টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলার মহেরা ইউনিয়নের নগর ছাওয়ালী গ্রামে। তিনি বাসিন্দা ফজল মিয়ার মেয়ে। সংসারের হাল করতে সৌদি আরবে পারি জমান সুইটি আক্তার। তবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া বাংলাদেশি নারী ‘সিতি আখতার’ই কি টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলার মহেড়া গ্রামের সুইটি আক্তার এ নিয়ে তৈরি হয়েছে সংশয়। জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) বহির্গমন ছাড়পত্র ও জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্যের ভিত্তিতে বিভিন্ন গণমাধ্যমে ওই নারীকে সুইটি আক্তার হিসেবে শনাক্ত করা হলেও সরেজমিনে তার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে পাওয়া গেছে ভিন্ন বক্তব্য। পরিবারের দাবি, প্রকাশিত ছবির সঙ্গে তাদের মেয়ে সুইটির ছবির মিল নেই। তবে সুইটির মা জানিয়েছেন, সৌদি আরবে তার মেয়েকে অনেকে ‘সিতি’ নামে চিনতেন।
পরিবারের সদস্যরা জানান, সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়ে এখন পর্যন্ত তারা সরকারিভাবে কোনো চিঠি বা আনুষ্ঠানিক তথ্য পাননি। ফলে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া নারী তাদের সুইটি কি না, তা নিয়ে পরিবারের মধ্যে সংশয় রয়েছে।
সরকারি নথির তথ্য অনুযায়ী, সুইটি আক্তারের জন্ম ২০০১ সালের ১১ আগস্ট। ২০২৩ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি ‘এস রানা ট্রেডিং ইন্টারন্যাশনাল’-এর মাধ্যমে সৌদি আরবে যাওয়ার বহির্গমন ছাড়পত্র পান তিনি। সেখানে তার নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান ছিল ‘আল মাজাল আল আরাবি গ্রুপ কোম্পানি’।
সম্প্রতি সৌদি আরবের মক্কায় একটি মসজিদে ‘অনৈতিক কাজ’ করার দায়ে দুই বাংলাদেশিকে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছে দেশটির কর্তৃপক্ষ। এর থেকে আলোচনা এবং সমালোচনার ঝড় উঠে।
সুইটির বাবা ফজল মিয়া বলেন, গত মঙ্গলবারও আমার মেয়ের সাথে কথা হয়েছে। এর পর থেকে আর কোন যোগাযোগ নেই। তখন আমাকে বলোছিলো দুই মাস পড়ে বাড়িতে আসবে। দুই বছর আগে সেখানে কর্মরত অন্য নারী কর্মীদের সঙ্গে ঝগড়ার পর তাকে ফাঁসিয়ে জেলে দেওয়া হয়েছে। এরপর এক বছর সুইটির খোঁজ পাইনি,’ বলেন তিনি।
তিনি বলেন, আমার মেয়ের কারও সাথে সর্ম্পক নেই। তবে প্রকাশিত ছবির সাথে আমার মেয়ের কোন মিল নেই। যার কারণে আমরা কোন কিছু করতে পারছি না। আমি সরকারের কাছে দাবি করছি আমার মেয়েকে ফেরত চাই।
তিনি বলেন, আমার আমার মেয়ে বলেছিলো ‘একজন আইনজীবী রয়েছে। তিনিই সব গাইড করবেন।’ আমার মেয়েই আইনজীবীর সাথে যোগাযোগ করবে। এখন পর্যন্ত এ ব্যাপারে বাংলাদেশের কেউ যোগাযোগ করেনি।
তিনি আরো বলেন, সাড়ে ৩ বছর আগে আমার মেয়ের কাজের জন্য সৌদি আরবে যায়। হজ্জে যারা যেতো আমার মেয়ে তাদের দেখাশুনা করতো। আমার মেয়ে বিবাহিত।
সুইটির মা জহুরা বেগম বলেন, প্রকাশিত ছবির সাথে আমার মেয়ের মিল নেই। ‘নামের মিল রয়েছে সুইটি। তাই আমরা কান্নাকাটি করি। আমার সুইটিরে মেরে ফেলাইছে। আমার মেয়ে কোন অপরাধ করেছে যে তাকে মারবো। আমার মেয়ে কোন অপরাধ করেনি।
তিনি বলেন, মেয়েকে বিয়ে দিয়েছিলাম। সংসার না টিকায় দ্বিতীয় বার বিয়েতে বসেনি। তাই তো আমাদের জন্য মেয়ে বিদেশ গেছে। আমার স্বামী এখনো মাটি কাটার কাজ করে। বিদেশ গিয়ে ৬ মাস কাজ করেছে। তার পরে মেয়েরা মেয়েরা মারামারি করাতে আমার মেয়েকে পুলিশ ধরে নেয়। এর পর থেকে সুইটি জেলখানায় রয়েছে। মাঝ-খানে এক বছর ফোনে কথা হয়নি। হঠাৎ করেই একদিন সুইটির সাথে কথা হয়েছে। আমার আমাদের মেয়েকে চাই।
মহেড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বিভাস সরকার নুপুর বলেন, বিষয়টি গণমাধ্যমে জানতে পারি। ঘটনাটি তিনিও শুনেছেন, তবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া নারীই মহেড়া গ্রামের সুইটি আক্তার কি না, সে বিষয়ে তিনি নিশ্চিত নন। তবে সুইটির ভগ্নিপতি আব্দুল মালেক তাকে জানিয়েছেন, সৌদিতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া ‘সিতি আক্তার’ই তাদের পরিবারের সুইটি।
এ ব্যাপারে মির্জাপুরের উপজেলা নির্বাহী অফিসার জহিরুল আলম বলেন, বিষয়টি আমরা খোঁজ খবর নিচ্ছি। যদি সুইটির বাড়ি মির্জাপুরে হয়ে থাকে তাহলে লাশ নেয়ার ব্যাপারে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আমাদের চিঠি দিবে। এটি নিয়ে আমরাও নিশ্চিত নই।
টাঙ্গাইলের পুলিশ সুপার মুহাম্মদ শামছুল আলম সরকার বলেন, মন্ত্রণালয়ে খবর নিয়ে আপনাদের জানাতে হবে।
তবে সব মিলিয়ে সরকারি নথি ও বিভিন্ন গণমাধ্যমের তথ্যে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া নারীকে মির্জাপুরের সুইটি আক্তার হিসেবে উল্লেখ করা হলেও পরিবারের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো তথ্য না পৌঁছানো এবং প্রকাশিত ছবি নিয়ে পরিবারের সংশয়ের কারণে তার পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক নিশ্চিতকরণ পাওয়া গেলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে।
পড়ুন : সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ডের রায়ের কপি চাইল ঢাকা
সা/


