সৌদি আরবে দুই প্রবাসী বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ডাদেশ ও তা কার্যকরের বিষয়ে নিশ্চিত ও বিস্তারিত তথ্য জানতে দেশটির কর্তৃপক্ষের কাছে রায়ের কপি চেয়েছে বাংলাদেশ সরকার। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ জানিয়েছেন, সৌদি সরকারের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় নথিপত্র ও রায়ের অনুলিপি পাওয়ার পর সার্বিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে ঢাকা পরবর্তী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে।
সোমবার (১৯ অক্টোবর) পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে শামা ওবায়েদ বলেন, “রায়ের কপি হাতে পেলে বিষয়টি আরও স্পষ্টভাবে জানা এবং সার্বিক পরিস্থিতি মূল্যায়ন করা সম্ভব হবে।” এ সময় বিভ্রান্তিকর তথ্য এড়াতে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সুনির্দিষ্ট আপডেট না পাওয়া পর্যন্ত সবাইকে ধৈর্য ধরার অনুরোধ জানান তিনি।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ওই দুই প্রবাসীর মধ্যে একজন পুরুষ ও একজন নারী রয়েছেন। এ বিষয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো গুজবের ব্যাপারে সবাইকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, “ফেসবুকের পোস্ট দেখে যেন কেউ কোনো সিদ্ধান্তে না পৌঁছান।” যেকোনো ধরনের ভুল ও অপতথ্য থেকে সতর্ক থেকে সরকারের নির্ভরযোগ্য তথ্যের জন্য অপেক্ষা করার তাগিদ দেন তিনি।
প্রতিমন্ত্রী জানান, বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে সৌদি আরবের কাছে প্রয়োজনীয় তথ্য ইতোমধ্যে চাওয়া হয়েছে এবং বর্তমানে ঢাকা তাদের উত্তরের অপেক্ষায় রয়েছে। নথিপত্র হাতে পেলে তা পর্যালোচনা করে দুই দেশের পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে পরবর্তী পদক্ষেপ ঠিক করা হবে।
সৌদি আরবে বন্দি থাকা বাংলাদেশিদের সার্বিক তথ্য পাওয়ার প্রক্রিয়া তুলে ধরে শামা ওবায়েদ জানান, কারাবন্দি বাংলাদেশিদের নাম-পরিচয়সহ তালিকা নিয়মিত বিরতিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ মিশনগুলোতে পাঠায় সৌদি কর্তৃপক্ষ। আলোচিত দুই প্রবাসীর নাম সেই তালিকায় রয়েছে কি না, তা সরকারের পক্ষ থেকে বর্তমানে মিলিয়ে দেখা হচ্ছে।
বাংলাদেশি প্রবাসীদের সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, “বাংলাদেশি কর্মীরা যেন দেশটিতে নিরাপদে কাজ করতে পারেন, সে বিষয়টি সরকার সব সময় গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে।”
সংশ্লিষ্ট পরিবারগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে কি না—এমন প্রশ্নে তিনি জানান, এ বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে এখনও পূর্ণাঙ্গ কোনো তথ্য নেই এবং ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর পক্ষ থেকেও এখন পর্যন্ত কোনো যোগাযোগ করা হয়নি।
সৌদি সরকারের ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে শামা ওবায়েদ আরও বলেন, “বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য সৌদি আরব একটি গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য। দেশটির রেমিট্যান্সের অন্যতম বড় উৎস হওয়ায় সৌদি আরবের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক এবং সেখানে কর্মরত বাংলাদেশিদের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।”
কূটনৈতিক তৎপরতা ও ব্যাখ্যা দাবি:
দুই প্রবাসীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়ের আগে কেন বাংলাদেশকে অবহিত করা হয়নি, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে ঢাকা। সৌদি আরব থেকে পাঠানো বন্দিদের তালিকায় নজরুল ইসলাম ও সুইটি আক্তারের নাম উল্লেখ থাকলেও সেখানে তাদের সাজার ধরণ বা মৃত্যুদণ্ডের কথা লেখা ছিল না। এর পরিপ্রেক্ষিতে সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে ঘটনার সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা চাওয়ার পাশাপাশি এই দুই প্রবাসীর বিচারিক প্রক্রিয়া ও বিস্তারিত মামলার তথ্য চেয়ে পুনরায় একটি কূটনৈতিক পত্র পাঠানো হয়েছে।
এরই অংশ হিসেবে সোমবার (১৯ অক্টোবর) জেদ্দায় দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক ফরিদ বিন সাদ আল সেহেরির সঙ্গে এক বৈঠকে বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে তুলে ধরেন বাংলাদেশের কনসাল জেনারেল মো. সাখাওয়াত হোসেন। নিয়মিত বন্দিতালিকায় অপরাধের তথ্য থাকলেও মৃত্যুদণ্ডের বিষয়টি কেন গোপন ছিল—সে বিষয়েও তিনি প্রশ্ন উত্থাপন করেন।
কনসাল জেনারেল মন্তব্য করেন, তালিকায় মৃত্যুদণ্ডের তথ্য শুরুতেই দেওয়া থাকলে তাদের আইনি সুরক্ষা ও প্রয়োজনীয় সহায়তার সুযোগ পেত জেদ্দা মিশন। তবে একাধিক সূত্রের বরাতে জানা গেছে, বৈঠকে উপস্থিত সৌদি কূটনৈতিক কর্মকর্তা এ প্রশ্নের কোনো উপযুক্ত সদুত্তর দিতে পারেননি।
এই প্রেক্ষিতে, তারা আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ পেয়েছিলেন কি না এবং বিচারের বিভিন্ন ধাপে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল—তা জানতে চেয়ে দ্বিতীয়বারের মতো সৌদি সরকারকে এই চিঠি পাঠানো হলো।
সৌদি কারাগারে বাংলাদেশিদের চিত্র:
গত ১৮ অক্টোবর জেদ্দায় অবস্থিত বাংলাদেশি মিশন থেকে ঢাকায় পাঠানো এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, এর আগে সাইবার অপরাধ কিংবা ব্যভিচারের অভিযোগে সৌদি আরবে কোনো বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার নজির নেই।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে সৌদি আরবের পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন কারাগারে চারিত্রিক স্খলনজনিত অভিযোগে ৩০৬ জন বাংলাদেশি বন্দি আছেন। এদের মধ্যে ১৪৭ জনকে সর্বনিম্ন এক মাস থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ১৫ বছরের বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এছাড়া, মক্কায় সাইবার অপরাধের আলাদা তিনটি মামলায় আরও তিন প্রবাসীকে সর্বনিম্ন ছয় মাস থেকে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর মেয়াদী কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
পড়ুন : নাটোরে ওভারটেকিং করতে গিয়ে যাত্রীবাহী বাসের সঙ্গে ট্রাকের সংঘর্ঘে নিহত ১৪
সা/


