রাজ্জাকদের সেই রূপালি রাজত্ব কোথায় হারাল?

একটা সময় ছিল, যখন বাংলা চলচ্চিত্র মানেই ছিল মানুষের আবেগ, ভালোবাসা, স্বপ্ন আর বেঁচে থাকার গল্প। সিনেমা হলের সামনে টিকিটের জন্য দীর্ঘ লাইন পড়ত। প্রিয় নায়ক-নায়িকার নতুন ছবি মুক্তি পেলে শহর থেকে গ্রাম—সবখানেই ছড়িয়ে পড়ত উৎসবের আমেজ। সিনেমার পোস্টার দেখেই মানুষের মনে জেগে উঠত কৌতূহল, আর প্রেক্ষাগৃহের অন্ধকারে বসে দর্শক কখনো হাসতেন, কখনো কাঁদতেন, কখনোবা প্রিয় চরিত্রটির সঙ্গে একাত্ম হয়ে হারিয়ে যেতেন অন্য এক জগতে।

সিনেমা তখন কেবল বিনোদনের মাধ্যম ছিল না; ছিল জীবনের অংশ, আবেগের আশ্রয়, স্মৃতির অ্যালবাম। প্রিয় নায়কের অভিনয় নিয়ে চায়ের দোকানে চলত আলোচনা, সিনেমার গান ভেসে বেড়াত মানুষের মুখে মুখে, আর কোনো দৃশ্য হৃদয় ছুঁয়ে গেলে তার রেশ থেকে যেত দিনের পর দিন।

সেই চলচ্চিত্রের সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমাদের শৈশব, কৈশোর, যৌবন আর অসংখ্য স্মৃতির রঙিন অধ্যায়। সেই পর্দায় আমরা দেখেছি প্রেম, বিরহ, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, মায়ের মমতা, পরিবারের টানাপোড়েন এবং মানুষের বেঁচে থাকার সংগ্রাম।

বাংলা সিনেমা আমাদের শুধু গল্প শোনায়নি; আমাদের অনুভব করতে শিখিয়েছে, কখনো চোখের জল আড়াল করতে শিখিয়েছে, আবার কখনো অন্যের দুঃখে নিজের হৃদয়কে ভারী করে তুলেছে।

আজ সেই চলচ্চিত্রজগতের দিকে তাকালে বুকের ভেতর একটা প্রশ্ন বারবার ফিরে আসে—কোথায় হারিয়ে গেল সেই দিনগুলো? কোথায় গেল মানুষের সেই উচ্ছ্বাস, প্রেক্ষাগৃহের সেই প্রাণচাঞ্চল্য, আর কোথায় হারাল রাজ্জাকদের সেই রুপালি রাজত্ব?

সম্প্রতি বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশন—এফডিসিতে গিয়েছিলাম। চলচ্চিত্র সাংবাদিকতার দীর্ঘ পথচলায় এই প্রাঙ্গণ আমার কাছে কেবল একটি প্রতিষ্ঠান নয়; এটি স্মৃতির এক বিশাল ভান্ডার, আবেগের এক পরিচিত ঠিকানা। এখানকার প্রতিটি ফ্লোর, প্রতিটি করিডর, প্রতিটি কোণ যেন একসময়কার ব্যস্ত দিনের গল্প বলতে পারে।

একসময় এফডিসিতে একসঙ্গে ১৫ থেকে ২০টি চলচ্চিত্রের শুটিং চলতে দেখেছি। শিল্পী, পরিচালক, প্রযোজক, ক্যামেরাম্যান, আলোকসজ্জাকর্মী, মেকআপশিল্পী ও অন্যান্য কলাকুশলীর ছোটাছুটিতে মুখর থাকত পুরো প্রাঙ্গণ। কোথাও সেট তৈরির কাজ চলছে, কোথাও ক্যামেরা প্রস্তুত, কোথাও শিল্পীরা সংলাপ ঝালিয়ে নিচ্ছেন। একটি শুটিং শেষ হলে আরেকটি শুটিংয়ের প্রস্তুতি শুরু হয়ে যেত। চারপাশে ছিল কাজের শব্দ, মানুষের কণ্ঠ, সৃজনশীলতার ব্যস্ততা আর নতুন কিছু নির্মাণের উত্তেজনা।

কিন্তু সেদিন এফডিসিতে গিয়ে সেই চেনা দৃশ্যের অনেকটাই অনুপস্থিত দেখলাম। একসময় যে প্রাঙ্গণ স্বপ্নের শব্দে মুখর থাকত, সেখানে এখন নীরবতা যেন অনেক বেশি স্পষ্ট। মনে হচ্ছিল, এফডিসি তার সোনালি দিনগুলোর স্মৃতি বুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, অথচ সেই স্মৃতির সঙ্গে বর্তমানের দূরত্ব ক্রমেই দীর্ঘ হচ্ছে।

চোখের সামনে যেন ভেসে উঠছিল পুরোনো দিনের দৃশ্যগুলো। ক্যামেরা চলছে, পরিচালক দৃশ্য বুঝিয়ে দিচ্ছেন, শিল্পীরা অভিনয়ে মগ্ন, আর ফ্লোরের বাইরে অপেক্ষায় আছেন আরও অনেকে। অথচ বাস্তবের নীরবতা সেই স্মৃতির ওপর এক অদৃশ্য পর্দা টেনে দিচ্ছিল।

সেদিন আমার মনে হয়েছে, এফডিসির নীরবতা কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের ব্যস্ততা কমে যাওয়ার চিত্র নয়; এটি বাংলাদেশের চলচ্চিত্রশিল্পের দীর্ঘ সংকটের এক বেদনাময় প্রতীক।

রাজ্জাকদের সময়—যখন সিনেমা ছিল মানুষের হৃদয়ের ঠিকানা

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে রাজ্জাক একটি নামের চেয়েও অনেক বড়। তিনি ছিলেন একটি সময়ের আবেগ, একটি প্রজন্মের ভালোবাসা, অসংখ্য দর্শকের স্বপ্নের নায়ক। তাঁর অভিনয়, ব্যক্তিত্ব ও পর্দার উপস্থিতি বাংলা চলচ্চিত্রকে দিয়েছিল স্বতন্ত্র মর্যাদা।

তাঁর সময়ের চলচ্চিত্রজগতে আলমগীর, সোহেল রানা, জসিম, ইলিয়াস কাঞ্চন, শাবানা, ববিতা, কবরীসহ অসংখ্য শিল্পী নিজেদের মেধা, শ্রম ও অভিনয় দিয়ে তৈরি করেছিলেন এক গৌরবময় অধ্যায়।

তাঁদের চলচ্চিত্রে হয়তো আজকের মতো অত্যাধুনিক প্রযুক্তির চাকচিক্য ছিল না, কিন্তু ছিল গল্পের শক্তি, অভিনয়ের গভীরতা এবং দর্শকের হৃদয়ে পৌঁছানোর অসাধারণ ক্ষমতা। পর্দায় একটি মায়ের কান্না দর্শকের চোখ ভিজিয়ে দিত, প্রেমিকের বিচ্ছেদ হৃদয়ে ব্যথা জাগাত, আর অন্যায়ের বিরুদ্ধে নায়কের প্রতিবাদ দর্শককে আনন্দ দিত।

সিনেমা শেষ হওয়ার পরও গল্প শেষ হয়ে যেত না। কোনো সংলাপ মানুষের মুখে মুখে ফিরত, কোনো গানের সুর ভেসে বেড়াত অলিগলিতে, কোনো চরিত্র দীর্ঘদিন জায়গা করে নিত দর্শকের হৃদয়ে।

এই সাফল্যের পেছনে ছিল শিল্পী ও নির্মাতাদের নিষ্ঠা, দর্শকের সঙ্গে চলচ্চিত্রের গভীর সম্পর্ক এবং সিনেমাকে ঘিরে গড়ে ওঠা একটি বিস্তৃত কর্মপরিবেশ। তবে অতীতের সব চলচ্চিত্রই যে সমান মানের ছিল, তা নয়। তখনও দুর্বল ছবি নির্মিত হয়েছে, ব্যবসায়িক ব্যর্থতা এসেছে, নানা সীমাবদ্ধতা ছিল। কিন্তু সেই সীমাবদ্ধতার মধ্যেও চলচ্চিত্রশিল্পের একটি শক্তিশালী উৎপাদনব্যবস্থা, নিয়মিত দর্শক এবং দেশজুড়ে প্রেক্ষাগৃহের বিস্তৃত নেটওয়ার্ক ছিল। এই ব্যবস্থাই শিল্পটিকে দীর্ঘদিন ধরে প্রাণবন্ত রেখেছিল।

সময়ের সঙ্গে চলচ্চিত্রের ভাষা বদলেছে, দর্শকের রুচি বদলেছে, প্রযুক্তি বদলেছে। কিন্তু পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিজেদের প্রস্তুত করার ক্ষেত্রে আমাদের চলচ্চিত্রশিল্প কতটা সফল হয়েছে—আজ সেই প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়া জরুরি।

রাজ্জাকদের সময়কে শুধু স্মৃতির পাতায় বন্দি রেখে লাভ নেই। তাঁদের সময়ের সাফল্য থেকে শিক্ষা নিয়ে বর্তমানের সংকটের কারণ খুঁজতে হবে।

এফডিসির নীরবতার পেছনে কী কী কারণ?

এফডিসির বর্তমান পরিস্থিতিকে বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রশিল্পের সংকট বহু বছরের। এর পেছনে রয়েছে প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলাতে না পারা, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা, বিনিয়োগের অনিশ্চয়তা, প্রেক্ষাগৃহের সংকোচন, দুর্বল চিত্রনাট্য, বিপণনব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা এবং দর্শকের সঙ্গে চলচ্চিত্রের সম্পর্কের অবনতি।

গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনেও এফডিসির পুরোনো প্রযুক্তি, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, আর্থিক সংকট এবং নির্মাতাদের আগ্রহ কমে যাওয়ার বিষয়গুলো উঠে এসেছে।

২০২৫ সালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে প্রতিষ্ঠানটির দীর্ঘদিনের আর্থিক চাপ ও আধুনিকায়নের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরা হয়। অন্যদিকে, চলচ্চিত্রশিল্প নিয়ে প্রকাশিত বিশ্লেষণগুলোতে প্রেক্ষাগৃহের সংখ্যা কমে যাওয়া, বিনিয়োগের সংকট এবং নিয়মিত চলচ্চিত্র নির্মাণের পরিবেশ দুর্বল হয়ে পড়ার বিষয়টিও আলোচিত হয়েছে।

এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা দরকার—এফডিসি ও বাংলাদেশের পুরো চলচ্চিত্রশিল্প এক বিষয় নয়। এফডিসি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হলেও দেশের সব চলচ্চিত্র এখন আর সেখানে নির্মিত হয় না। অনেক নির্মাতা বেসরকারি স্টুডিও, নিজস্ব ব্যবস্থাপনা কিংবা লোকেশনে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। ফলে এফডিসিতে শুটিং কমে যাওয়া পুরো শিল্পের সংকটের একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ হলেও সেটিই একমাত্র মাপকাঠি নয়।

তবু এফডিসির গুরুত্ব অস্বীকার করার উপায় নেই। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রশিল্পের বিকাশে প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিন কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করেছে। তাই এর অবকাঠামো, প্রযুক্তি ও সেবাব্যবস্থা সময়োপযোগী না হলে তার প্রভাব চলচ্চিত্র নির্মাণের সামগ্রিক পরিবেশেও পড়তে পারে। প্রশ্ন হলো, এফডিসি কি নতুন সময়ের চাহিদা বুঝে নিজেকে পরিবর্তন করতে পেরেছে?

যখন বিশ্বের চলচ্চিত্রশিল্প ডিজিটাল প্রযুক্তি, আধুনিক সম্পাদনা, উন্নত শব্দব্যবস্থা, ভার্চ্যুয়াল প্রোডাকশন ও নতুন বিপণন কৌশলের দিকে এগিয়ে গেছে, তখন আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলোর কতটা প্রস্তুতি ছিল? নির্মাতাদের জন্য সহজলভ্য, মানসম্মত ও প্রতিযোগিতামূলক সেবা নিশ্চিত করা গেছে কি? নতুন প্রজন্মের নির্মাতারা এফডিসিতে এসে কাজ করার মতো পরিবেশ পেয়েছেন কি?
এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে আবেগ দিয়ে নয়, তথ্য, অভিজ্ঞতা ও বাস্তবতার ভিত্তিতে।

চলচ্চিত্রের প্রাণ চিত্রনাট্যে, শুধু তারকায় নয়

চলচ্চিত্রের সংকট নিয়ে কথা উঠলেই আমরা অনেক সময় তারকা সংকটের প্রসঙ্গ টানি। আগের মতো জনপ্রিয় নায়ক-নায়িকা নেই, দর্শক টানার মতো মুখ কমে গেছে—এমন আলোচনা শোনা যায়।
কিন্তু চলচ্চিত্রের মূল শক্তি কি শুধু তারকা?

তারকা একটি ছবিকে দর্শকের কাছে পৌঁছে দিতে পারেন। তাঁর জনপ্রিয়তা প্রেক্ষাগৃহে দর্শক টানতে সাহায্য করতে পারে। কিন্তু একটি চলচ্চিত্রকে দীর্ঘদিন মানুষের মনে বাঁচিয়ে রাখে তার গল্প, চরিত্র, অভিনয়, নির্মাণশৈলী ও আবেগের সত্যতা।

দুর্বল চিত্রনাট্যকে বড় বাজেট দিয়ে শক্তিশালী করা যায় না। অগভীর গল্পকে পরিচিত মুখ দিয়ে গভীর করে তোলা যায় না। দর্শককে বারবার একই ধরনের গল্প দেখালে একসময় তাঁর আগ্রহ কমে যাওয়াই স্বাভাবিক।

আমাদের সমাজে গল্পের অভাব নেই। এই দেশের মানুষের জীবনে রয়েছে নদীভাঙনের বেদনা, কৃষকের সংগ্রাম, শ্রমজীবী মানুষের ঘাম, মধ্যবিত্তের স্বপ্ন, তরুণদের অনিশ্চয়তা, নারীর লড়াই, গ্রাম থেকে শহরে আসা মানুষের জীবনসংগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধের উত্তরাধিকার এবং প্রতিদিন বদলে যাওয়া বাংলাদেশের অসংখ্য বাস্তবতা।

এসব গল্প নিয়ে শক্তিশালী চলচ্চিত্র নির্মাণের সুযোগ কি শেষ হয়ে গেছে?
না, কখনোই নয়।

প্রয়োজন সেই গল্পগুলো খুঁজে বের করার সাহস, সেগুলোকে বিশ্বাসযোগ্যভাবে পর্দায় তুলে ধরার দক্ষতা এবং নির্মাণে সততা। প্রয়োজন এমন চিত্রনাট্য, যেখানে চরিত্রগুলো কৃত্রিম মনে হবে না, সংলাপ হবে জীবনের কাছাকাছি, আর গল্পের পরিণতি দর্শককে ভাবতে বাধ্য করবে।

দর্শককে ছোট করে দেখার কোনো সুযোগ নেই। তাঁরা ভালো চলচ্চিত্র চিনতে পারেন, আবেগের সত্যতা অনুভব করতে পারেন এবং নতুন নির্মাণকে গ্রহণ করার ক্ষমতা রাখেন। তবে তাঁদের সময়, অর্থ ও মনোযোগ পাওয়ার জন্য চলচ্চিত্রকে যোগ্য হয়ে উঠতে হবে।

আমাদের চলচ্চিত্রের পুনর্জাগরণ তাই কেবল নতুন নায়ক খোঁজার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। নতুন লেখক, চিত্রনাট্যকার, পরিচালক, সম্পাদক, চিত্রগ্রাহক ও সংগীত পরিচালকদের জন্যও দরজা খুলতে হবে। প্রতিষ্ঠিতদের অভিজ্ঞতা এবং নতুনদের সৃজনশীলতার মধ্যে তৈরি করতে হবে কার্যকর সেতুবন্ধ।

ভারতীয় ও পশ্চিমবঙ্গের চলচ্চিত্র থেকে আমাদের শিক্ষা কী?

ভারতের বিভিন্ন ভাষার চলচ্চিত্রের দিকে তাকালে দেখা যায়, তাদের সাফল্যের পথ এক নয়। তামিল, তেলুগু ও মালয়ালম চলচ্চিত্র নিজস্ব দর্শক, ভাষা, সংস্কৃতি ও গল্পের শক্তিকে কাজে লাগিয়ে ভিন্ন ভিন্নভাবে এগিয়েছে। অনেক নির্মাতা স্থানীয় জীবনের গল্পকে এমন দক্ষতায় উপস্থাপন করেছেন, যা ভাষার সীমা অতিক্রম করে বৃহত্তর দর্শকের কাছে পৌঁছেছে।
পশ্চিমবঙ্গের বাংলা চলচ্চিত্রেও সময়ে সময়ে নতুন গল্প, ভিন্নধর্মী নির্মাণ ও সমকালীন জীবনের প্রতিফলন দর্শকের আগ্রহ তৈরি করেছে। ‘বহুরূপী’, ‘টেক্কা’ কিংবা ‘অযোগ্য’-এর মতো চলচ্চিত্র নিয়ে আলোচনা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, বাংলা ভাষার দর্শকও বৈচিত্র্যময় গল্প ও ভিন্নধর্মী নির্মাণের প্রতি আগ্রহী হতে পারেন।
তবে এসব উদাহরণকে সরলভাবে তুলনা করলে চলবে না। ভারতের চলচ্চিত্রশিল্পের বাজার, বিনিয়োগ, ভাষাভিত্তিক দর্শকসংখ্যা, পরিবেশনা নেটওয়ার্ক এবং প্রযোজনাব্যবস্থা বাংলাদেশের তুলনায় অনেক বড় ও বৈচিত্র্যময়। তাদের সবকিছু অনুকরণ করাও সম্ভব নয়, প্রয়োজনও নেই। আমাদের প্রয়োজন নিজেদের বাস্তবতার সঙ্গে মানানসই পথ খুঁজে বের করা।
মালয়ালম চলচ্চিত্র থেকে চিত্রনাট্যের গভীরতা, তামিল চলচ্চিত্র থেকে নিজস্ব সংস্কৃতি ও বাণিজ্যিক নির্মাণের সমন্বয়, তেলুগু চলচ্চিত্র থেকে বৃহৎ পরিসরে নির্মাণ ও বিপণনের পরিকল্পনা কিংবা পশ্চিমবঙ্গের বাংলা চলচ্চিত্র থেকে সমকালীন গল্পের বৈচিত্র্য—এসব ক্ষেত্র থেকে শিক্ষা নেওয়া যেতে পারে। তবে সেই শিক্ষা হতে হবে বাছাই করা, বাস্তবসম্মত এবং আমাদের নিজস্ব সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

আমাদের চলচ্চিত্রে বাংলাদেশের মাটি, মানুষের ভাষা, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও জীবনযাত্রার স্বতন্ত্র সৌন্দর্য থাকতে হবে। অন্যের সাফল্যের অনুকরণ নয়; বরং নিজেদের গল্পকে এমনভাবে উপস্থাপন করতে হবে, যাতে দেশীয় দর্শক নিজের জীবনকে খুঁজে পান, আর বিদেশি দর্শক আবিষ্কার করেন একটি ভিন্ন সমাজের অভিজ্ঞতা।

চলচ্চিত্রের আন্তর্জাতিকতা নিজের পরিচয় হারিয়ে আসে না; বরং নিজের পরিচয়কে সৃজনশীলভাবে তুলে ধরার মধ্য দিয়েই তা অর্জিত হয়।

সিনেমা হলের আলো নিভলে অন্ধকার নামে পুরো শিল্পে

চলচ্চিত্রের সংকটের আরেকটি বড় কারণ প্রেক্ষাগৃহের সংকোচন। একসময় দেশের শহর, বন্দর, উপজেলা এমনকি অনেক ছোট জনপদেও সিনেমা হল ছিল মানুষের বিনোদনের পরিচিত ঠিকানা। সন্ধ্যা নামলে হলের সামনে জমত ভিড়, নতুন ছবি মুক্তি পেলে দেখা যেত উৎসবের আবহ। আজ সেই চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে।
বিভিন্ন প্রতিবেদনে ১৯৯০-এর দশকে দেশের সিনেমা হলের সংখ্যা প্রায় দেড় হাজারের কাছাকাছি ছিল বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বর্তমান সংখ্যা নিয়ে প্রতিবেদনে ভিন্নতা রয়েছে, কারণ কোথাও সারা বছর চালু থাকা হল, কোথাও মৌসুমি হল, আবার কোথাও মাল্টিপ্লেক্সসহ সব ধরনের প্রেক্ষাগৃহ গণনা করা হয়েছে। তবে একটি বিষয় নিয়ে সংশয়ের অবকাশ নেই—দেশজুড়ে একসময় যে বিস্তৃত প্রেক্ষাগৃহ নেটওয়ার্ক ছিল, তা উল্লেখযোগ্যভাবে সংকুচিত হয়েছে।
একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করলেই তার কাজ শেষ হয় না। দর্শকের কাছে পৌঁছানোর জন্য দরকার উপযুক্ত প্রদর্শনব্যবস্থা, মানসম্মত প্রেক্ষাগৃহ, কার্যকর প্রচার এবং বিনিয়োগ ফেরত পাওয়ার বাস্তবসম্মত সুযোগ।
প্রেক্ষাগৃহ কমে গেলে চলচ্চিত্রের বাজার সংকুচিত হয়। বাজার সংকুচিত হলে বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকি নিতে চান না। বিনিয়োগ কমে গেলে নির্মাণের মান ও বৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এভাবেই সংকট একসময় নিজের ভেতরেই আরও গভীর হয়ে ওঠে।
এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য শুধু নতুন সিনেমা বানানোর আহ্বান যথেষ্ট নয়। বন্ধ হয়ে যাওয়া প্রেক্ষাগৃহগুলোর বাস্তব অবস্থা যাচাই করতে হবে। কোথায় আধুনিক প্রেক্ষাগৃহ নির্মাণ সম্ভব, কোথায় পুরোনো হল সংস্কার করে চালু করা যায়, কীভাবে নিরাপদ পরিবেশে সাশ্রয়ী মূল্যে দর্শককে সিনেমা দেখার সুযোগ দেওয়া যায়—এসব প্রশ্নের বাস্তব উত্তর খুঁজতে হবে।
একই সঙ্গে টিকিট বিক্রির স্বচ্ছ হিসাব, ন্যায্য আয় বণ্টন, কার্যকর পরিবেশনা নেটওয়ার্ক এবং চলচ্চিত্রের প্রচারে পেশাদারত্ব নিশ্চিত করতে হবে।
দর্শক কেন হলে যাবেন, কী ধরনের ছবি দেখতে চান, টিকিটের মূল্য তাঁদের সামর্থ্যের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ—এসব বিষয় নিয়েও নিয়মিত গবেষণা প্রয়োজন।
কারণ, দর্শককে ফিরিয়ে আনার অর্থ শুধু একটি সিনেমা হলের দরজা খুলে দেওয়া নয়; তাঁদের আস্থা ফিরিয়ে আনা।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ওটিটি—শত্রু নয়, নতুন সম্ভাবনা

বর্তমান সময়ে ইউটিউব, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ওটিটি প্ল্যাটফর্ম মানুষের বিনোদনের অভ্যাসে বড় পরিবর্তন এনেছে। দর্শক এখন ঘরে বসেই দেশি-বিদেশি চলচ্চিত্র ও সিরিজ দেখতে পারেন। মোবাইল ফোনেই পৌঁছে যায় অসংখ্য ভিডিও, নাটক ও বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান।
এই পরিবর্তনকে অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু প্রযুক্তিকে চলচ্চিত্রের পতনের একমাত্র কারণ হিসেবে দেখাও ভুল হবে।
প্রযুক্তি মানুষের হাতে নতুন বিকল্প তুলে দিয়েছে, কিন্তু ভালো গল্পের চাহিদা শেষ করে দেয়নি। বরং ডিজিটাল মাধ্যমের কারণে নতুন নির্মাতাদের জন্য স্বল্প বাজেটে কাজ করার, নতুন দর্শকের কাছে পৌঁছানোর এবং বিকল্প গল্প বলার সুযোগও তৈরি হয়েছে।
সমস্যা হলো, আমরা এই পরিবর্তনকে কতটা পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগাতে পেরেছি।
বড় পর্দার জন্য নির্মিত চলচ্চিত্রের নিজস্ব আবেদন আছে। প্রেক্ষাগৃহে একসঙ্গে বহু মানুষের সঙ্গে একটি গল্প উপভোগ করার অভিজ্ঞতা আলাদা। অন্যদিকে, ওটিটি ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম নতুন ধরনের গল্প, দীর্ঘ আখ্যান এবং ভিন্নধর্মী নির্মাণের সুযোগ তৈরি করে।
তাই এ দুই মাধ্যমকে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখার পরিবর্তে পরিপূরক হিসেবে ভাবতে হবে। কোন গল্প বড় পর্দার জন্য উপযুক্ত, কোন গল্প ডিজিটাল মাধ্যমে ভালোভাবে পৌঁছাতে পারে, কীভাবে একই চলচ্চিত্রের জন্য একাধিক বাজার তৈরি করা যায়—এসব নিয়ে প্রযোজক ও পরিবেশকদের পরিকল্পনা করা দরকার।
বাংলাদেশের চলচ্চিত্রশিল্প যদি ডিজিটাল যুগের সঙ্গে তাল মেলাতে পারে, তবে প্রযুক্তি তার জন্য কেবল চ্যালেঞ্জ নয়, নতুন সম্ভাবনার দরজাও খুলে দিতে পারে।

এফডিসি কি আবার স্বপ্নের কারখানা হবে?

এফডিসির পুনর্জাগরণ মানে শুধু পুরোনো ভবন সংস্কার কিংবা নতুন যন্ত্রপাতি কেনা নয়। একটি প্রতিষ্ঠানকে আধুনিক করতে হলে তার সেবা, ব্যবস্থাপনা, কর্মপরিবেশ ও কাজের সংস্কৃতিকেও সময়োপযোগী করতে হয়।
প্রয়োজন আধুনিক শুটিং ফ্লোর, উন্নত শব্দ ধারণ ও সম্পাদনার সুবিধা, প্রশিক্ষণের সুযোগ, তরুণ নির্মাতাদের জন্য সহায়ক পরিবেশ এবং চলচ্চিত্র নির্মাণে স্বচ্ছতা ও পেশাদারত্ব নিশ্চিত করা। প্রযোজকেরা যাতে যুক্তিসংগত ব্যয়ে মানসম্মত সেবা পান, সেই ব্যবস্থাও গড়ে তুলতে হবে।
এফডিসিকে এমন একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে হবে, যেখানে শুধু অতীতের স্মৃতি সংরক্ষিত থাকবে না; ভবিষ্যতের চলচ্চিত্রও নির্মিত হবে।
এর জন্য সরকারের নীতিগত সহায়তা জরুরি। একই সঙ্গে বেসরকারি বিনিয়োগ, চলচ্চিত্রসংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর কার্যকর অংশগ্রহণ এবং দক্ষ ব্যবস্থাপনারও প্রয়োজন রয়েছে। তবে অর্থ বরাদ্দই যেন একমাত্র সমাধান বলে বিবেচিত না হয়। বিনিয়োগের পাশাপাশি জবাবদিহি, পরিকল্পনা, স্বচ্ছতা ও ফলাফল মূল্যায়নের ব্যবস্থা থাকতে হবে।
এফডিসির আয়-ব্যয়ের হিসাব, সেবার মান, যন্ত্রপাতির ব্যবহার এবং চলচ্চিত্র নির্মাতাদের চাহিদা নিয়মিত মূল্যায়ন করা দরকার। কোন সেবা ব্যবহার হচ্ছে না, কেন নির্মাতারা বিকল্প প্রতিষ্ঠানের দিকে যাচ্ছেন, কীভাবে প্রতিযোগিতামূলক সেবা দেওয়া সম্ভব—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে।
একই সঙ্গে চলচ্চিত্রের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে হবে। নতুন প্রজন্মের চিত্রনাট্যকার, পরিচালক, চিত্রগ্রাহক, সম্পাদক, শব্দ প্রকৌশলী ও প্রযোজকদের জন্য বাস্তবভিত্তিক প্রশিক্ষণ এবং অভিজ্ঞ পেশাজীবীদের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ তৈরি করা জরুরি।
চলচ্চিত্রের ভবিষ্যৎ শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করে না। কিন্তু সেই প্রতিষ্ঠান যদি আবার কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে, তবে তা পুরো শিল্পের জন্য সহায়ক হতে পারে।

বিজ্ঞাপন

এই সংকট শুধু শিল্পের নয়, মানুষের জীবনেরও

একটি চলচ্চিত্রের পর্দায় আমরা সাধারণত নায়ক-নায়িকাকে দেখি। তাঁদের অভিনয়, সংলাপ ও জনপ্রিয়তা নিয়ে আলোচনা করি। কিন্তু ক্যামেরার পেছনে থাকা মানুষগুলোর কথা কতবার ভাবি?
একটি দৃশ্যের জন্য আলো সাজানো কর্মী, সেট নির্মাণে ব্যস্ত কারিগর, পোশাক প্রস্তুতকারী, মেকআপশিল্পী, ক্যামেরা সহকারী, শব্দগ্রাহক, সম্পাদনাকর্মী—তাঁদের প্রত্যেকের শ্রমে একটি চলচ্চিত্র পূর্ণতা পায়।
চলচ্চিত্রের সংকট তাঁদের কাছে কেবল একটি শিল্পের দুরবস্থা নয়; এটি জীবিকার সংকট, পরিবারের মুখে খাবার তুলে দেওয়ার অনিশ্চয়তা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উদ্বেগ।
যখন শুটিং কমে যায়, তখন শুধু একটি ফ্লোর ফাঁকা থাকে না; বহু মানুষের কর্মদিবস হারিয়ে যায়। যখন প্রযোজনা বন্ধ থাকে, তখন শুধু নতুন গল্পের জন্ম থেমে যায় না; অনেক পরিবারের আয়ের পথও সংকুচিত হয়।
চলচ্চিত্রের সঙ্গে যুক্ত বহু মানুষ বছরের পর বছর নিজেদের দক্ষতা, শ্রম ও সময় দিয়ে এই শিল্পকে এগিয়ে নিয়েছেন। তাঁদের অনেকেই অন্য কোনো পেশায় সহজে চলে যেতে পারেন না। কারণ, তাঁদের অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা এই বিশেষ শিল্পের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।
তাই চলচ্চিত্রের পুনর্জাগরণের আলোচনা করতে গেলে তাঁদের কথাও সামনে আনতে হবে। প্রশিক্ষণ, কর্মসংস্থান, দক্ষতা উন্নয়ন এবং কাজের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করার পরিকল্পনা থাকতে হবে।
এফডিসির নীরব ফ্লোরে দাঁড়িয়ে তাঁদের কথা মনে পড়ে। মনে হয়, এই প্রাঙ্গণের প্রতিটি আলো আবার জ্বলে উঠুক শুধু চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য নয়, মানুষের জীবনে কাজের নিশ্চয়তা ও মর্যাদা ফিরিয়ে দেওয়ার জন্যও।
একটি শিল্পের সাফল্য কেবল তার আয় দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। সেই শিল্প কত মানুষের জীবনে সম্ভাবনা তৈরি করে, কত নতুন প্রতিভাকে সামনে নিয়ে আসে, কত মানুষের শ্রমকে মর্যাদা দেয়—সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

দর্শককে দোষ দিয়ে চলচ্চিত্র বাঁচানো যাবে না

চলচ্চিত্রের সংকটের কথা উঠলে কখনো কখনো দর্শকের রুচিকে দায়ী করা হয়। বলা হয়, মানুষ এখন সিনেমা দেখে না, ভালো চলচ্চিত্রকে মূল্য দেয় না, কিংবা বিদেশি বিনোদনের দিকে ঝুঁকে পড়েছে।
কিন্তু দর্শক কেন প্রেক্ষাগৃহে যাবেন, তার উত্তরও চলচ্চিত্রশিল্পকেই দিতে হবে।

দর্শক সময় ও অর্থ ব্যয় করে এমন একটি অভিজ্ঞতা চান, যা তাঁদের আনন্দ দেবে, ভাবাবে কিংবা আবেগে স্পর্শ করবে। তাঁরা যদি মনে করেন, কোনো চলচ্চিত্র তাঁদের প্রত্যাশা পূরণ করবে না, তবে তাঁরা বিকল্প খুঁজবেন—এটাই স্বাভাবিক।

দর্শকের রুচি স্থির নয়। সময়ের সঙ্গে তা পরিবর্তিত হয়। নতুন প্রজন্ম নতুন বিষয়, নতুন উপস্থাপনা ও নতুন ধরনের চরিত্র দেখতে চায়। একই সঙ্গে পরিবার নিয়ে উপভোগ করা যায়, এমন চলচ্চিত্রেরও চাহিদা রয়েছে। সব দর্শকের পছন্দ এক নয়; তাই চলচ্চিত্রের বিষয়বস্তুতেও বৈচিত্র্য থাকা দরকার।

এখানে প্রয়োজন দর্শকের সঙ্গে নতুন করে সম্পর্ক গড়ে তোলা। চলচ্চিত্র মুক্তির আগে পরিকল্পিত প্রচার, নির্মাণের পেছনের গল্প তুলে ধরা, শিল্পীদের সঙ্গে দর্শকের যোগাযোগ বাড়ানো এবং চলচ্চিত্র নিয়ে সুস্থ আলোচনা তৈরি করা যেতে পারে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, দর্শককে সম্মান করা। তাঁদের পছন্দ-অপছন্দকে গুরুত্ব দেওয়া। চলচ্চিত্র নির্মাণের সময় কেবল নির্মাতার নিজের ইচ্ছাকে নয়, দর্শকের অনুভূতি ও বাস্তবতাকেও বিবেচনায় নেওয়া।
দর্শককে ফিরিয়ে আনার জন্য তাঁদের দোষারোপ নয়, তাঁদের আস্থা অর্জন করতে হবে।

পুরোনো দিনের গৌরব ফিরবে কীভাবে?

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রশিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করতে হলে আবেগের পাশাপাশি বাস্তবভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা জরুরি। এ ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় বিশেষ গুরুত্ব পাওয়া উচিত।
প্রথমত, চলচ্চিত্র নির্মাণে শক্তিশালী চিত্রনাট্য ও গল্পের বিকাশকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। নতুন লেখক ও নির্মাতাদের জন্য কর্মশালা, প্রশিক্ষণ, চিত্রনাট্য উন্নয়ন তহবিল এবং প্রতিযোগিতামূলক অনুদানের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
দ্বিতীয়ত, এফডিসিসহ চলচ্চিত্র নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রযুক্তি ও সেবাব্যবস্থা আধুনিক করতে হবে। শুধু নতুন ভবন বা যন্ত্রপাতি নয়, সেগুলোর কার্যকর ব্যবহার এবং নির্মাতাদের জন্য সহজলভ্য সেবা নিশ্চিত করতে হবে।
তৃতীয়ত, প্রেক্ষাগৃহ পুনরুজ্জীবনের জন্য বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা প্রয়োজন। বন্ধ হলগুলোর অবস্থা যাচাই, আধুনিকায়নের সুযোগ নির্ধারণ, নতুন প্রেক্ষাগৃহ স্থাপনে বিনিয়োগ উৎসাহিত করা এবং দর্শকবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা জরুরি।
চতুর্থত, চলচ্চিত্রের অর্থায়ন ও আয় বণ্টনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। বিনিয়োগকারীরা যাতে চলচ্চিত্রের বাজার, সম্ভাব্য দর্শক ও আয়ের হিসাব সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য ধারণা পান, সে জন্য তথ্যভিত্তিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা দরকার।
পঞ্চমত, দেশীয় চলচ্চিত্রের বিপণন ও আন্তর্জাতিক পরিবেশনা বাড়াতে হবে। বাংলা ভাষার চলচ্চিত্রকে বিদেশে বসবাসরত বাংলাদেশি দর্শকদের কাছে পৌঁছানো এবং আন্তর্জাতিক উৎসব ও বাজারে উপযুক্ত চলচ্চিত্রের অংশগ্রহণ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।
ষষ্ঠত, চলচ্চিত্রের ইতিহাস, পুরোনো ছবি, পোস্টার, গান, চিত্রনাট্য ও সংশ্লিষ্ট দলিল সংরক্ষণ করতে হবে। একটি জাতি তার চলচ্চিত্রের ইতিহাস হারিয়ে ফেললে শুধু কিছু ছবি হারায় না; হারায় তার সাংস্কৃতিক স্মৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

আর সবশেষে, চলচ্চিত্রশিল্পের সঙ্গে যুক্ত সবাইকে পারস্পরিক দোষারোপের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। সরকার, প্রযোজক, পরিচালক, শিল্পী, পরিবেশক, প্রদর্শক ও সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোকে একটি অভিন্ন লক্ষ্য নিয়ে কাজ করতে হবে।

সেই লক্ষ্য হবে—বাংলাদেশের চলচ্চিত্রকে এমন অবস্থানে ফিরিয়ে আনা, যেখানে ভালো গল্প নির্মিত হবে, দর্শক প্রেক্ষাগৃহে ফিরবেন, বিনিয়োগকারীরা আস্থা পাবেন এবং চলচ্চিত্রের সঙ্গে যুক্ত মানুষেরা মর্যাদার সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পাবেন।

রাজ্জাকরা ফিরবেন না, কিন্তু তাঁদের উত্তরাধিকার ফিরতে পারে

রাজ্জাক আর ফিরবেন না। শাবানা-ববিতাদের সেই সময়ও আর ফিরে আসবে না। কবরীর হাসি, জসিমের অ্যাকশন, আলমগীরের অভিনয় কিংবা সোহেল রানার ব্যক্তিত্ব—সবকিছু নিয়ে যে সময়টি আমাদের স্মৃতিতে অমলিন হয়ে আছে, তাকে হুবহু ফিরিয়ে আনার কোনো উপায় নেই।

কিন্তু তাঁদের রেখে যাওয়া পথ, কাজের প্রতি নিষ্ঠা, অভিনয়ের গভীরতা এবং দর্শকের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে নতুন প্রজন্ম শিক্ষা নিতে পারে।

অতীতের প্রতি ভালোবাসা মানে অতীতে আটকে থাকা নয়। বরং অতীতের সাফল্য ও ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতের জন্য নতুন পথ তৈরি করা।

যে শিল্প একসময় মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছিল, সেই শিল্পের নতুন করে দর্শকের হৃদয়ে পৌঁছানোর সম্ভাবনা আজও আছে। প্রয়োজন সময়কে বুঝতে পারা, নিজের দুর্বলতা স্বীকার করা এবং পরিবর্তনের জন্য সাহসী পদক্ষেপ নেওয়া।

আমি চলচ্চিত্র সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। দীর্ঘ পথচলায় এই শিল্পের অনেক উত্থান-পতন দেখার সুযোগ হয়েছে। তাই এফডিসির বর্তমান নীরবতা আমার কাছে নিছক একটি প্রতিষ্ঠানের ব্যস্ততা কমে যাওয়ার দৃশ্য নয়। এটি আমার নিজের দেখা একটি সময়ের সঙ্গে বর্তমানের দূরত্বের বেদনাও।

মনে পড়ে, একসময় শুটিংয়ের খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে কত মানুষের সঙ্গে দেখা হতো, কত নতুন গল্পের কথা জানা যেত, কত স্বপ্নের জন্ম হতে দেখতাম। সেই স্মৃতিগুলো আজও মনের ভেতর উজ্জ্বল। আর সেই স্মৃতির পাশে যখন বর্তমানের নীরবতা এসে দাঁড়ায়, তখন প্রশ্ন জাগে—আমরা কি সত্যিই আমাদের চলচ্চিত্রের সম্ভাবনাকে যথাযথভাবে কাজে লাগাতে পেরেছি?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে সবাইকে—সরকারকে, চলচ্চিত্রসংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোকে, প্রযোজকদের, নির্মাতাদের, শিল্পীদের, গণমাধ্যমকে এবং দর্শকদেরও।
কারণ, চলচ্চিত্রের সংকট কোনো একজনের সংকট নয়। এটি আমাদের সাংস্কৃতিক জীবনের সংকট, সৃজনশীলতার সংকট এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য

একটি সমৃদ্ধ চলচ্চিত্র-ঐতিহ্য রেখে যাওয়ার চ্যালেঞ্জ

আমি এখনো বিশ্বাস করি, বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের গল্প শেষ হয়ে যায়নি। হয়তো পর্দা নেমেছে একটি অধ্যায়ের, হয়তো আলো নিভে এসেছে পুরোনো মঞ্চে; কিন্তু নতুন গল্পের জন্য মঞ্চ তৈরি করা অসম্ভব নয়।

কোনো একদিন আবার এফডিসির ফ্লোরে আলো জ্বলবে। ক্যামেরার সামনে দাঁড়াবে নতুন মুখ, পরিচালকের কণ্ঠে শোনা যাবে ‘অ্যাকশন’, আর ক্যামেরার পেছনে ব্যস্ত হয়ে উঠবেন অসংখ্য মানুষ। কোনো একদিন আবার দর্শক প্রেক্ষাগৃহে বসে গল্পের সঙ্গে হাসবেন, কাঁদবেন, ভালোবাসবেন। কোনো একদিন নতুন কোনো চলচ্চিত্রের সংলাপ মানুষের মুখে মুখে ফিরবে।

সেই দিনটি কবে আসবে, তা আমরা জানি না। কিন্তু সেই দিনের জন্য প্রস্তুতি নেওয়ার কাজ আজ থেকেই শুরু করা যায়।

রাজ্জাকদের সেই রুপালি রাজত্ব হয়তো আর হুবহু ফিরে আসবে না। কিন্তু তাঁদের রেখে যাওয়া গৌরব, মেধা ও সৃজনশীলতার উত্তরাধিকার নিয়ে নতুন এক চলচ্চিত্রযুগ গড়ে তোলা অবশ্যই সম্ভব।

এফডিসির নীরবতা তাই আমার কাছে শেষের সংকেত নয়; বরং নতুন করে জেগে ওঠার আহ্বান।

বাংলাদেশের চলচ্চিত্র, তুমি আবার জেগে ওঠো। তোমার পর্দায় ফিরে আসুক মানুষের গল্প, তোমার ফ্লোরে ফিরুক প্রাণচাঞ্চল্য, তোমার আলোয় আলোকিত হোক নতুন প্রজন্মের স্বপ্ন।

আমরা তোমার বিদায় চাই না। আমরা চাই তোমার পুনর্জন্ম—আরও সুন্দর, আরও শক্তিশালী, আরও মানবিক এক চলচ্চিত্রজগতের পুনর্জন্ম।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও সভাপতি বাংলাদেশ অনলাইন জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন।

পড়ুন : দীর্ঘ হলো তিশার অভিষেকের অপেক্ষা

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন