হকার অপবাদ ঘুচিয়ে সফল উদ্যোক্তা: লিপির ‘নারীনেত্র কারুপণ্য’ পরিদর্শনে ডিসি

প্রবল ইচ্ছাশক্তি আর অদম্য সাহসের ওপর ভর করে একজন নারী কতটা দুর্গম পথ পাড়ি দিতে পারেন, তার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত নেত্রকোনার নারী উদ্যোক্তা কামরুন নাহার লিপি। একসময় যে সমাজ তাকে ‘হকার’ বলে উপহাস করত, আজ সেই সমাজই তার দিকে তাকিয়ে আছে বিস্ময়ভরা চোখে। শুধু স্থানীয় পর্যায়ে নয়, তার অসামান্য সাফল্যের গল্প সম্প্রতি স্থান পেয়েছে খোদ বিশ্বব্যাংকের (World Bank) পেজে। আর বিশ্বব্যাংকের সেই অনুপ্রেরণাদায়ী ভিডিও ফিচারটি দেখেই মুগ্ধ হয়েছেন নেত্রকোনার জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমান।

এরই ফলশ্রুতিতে শনিবার (২৪ অক্টোবর) রাতে সদর উপজেলার অনন্তপুর গ্রামে লিপির এম্ব্রয়ডারি ও তৈরি পোশাক কারখানা ‘নারীনেত্র কারুপণ্য’ পরিদর্শনে ছুটে যান জেলা প্রশাসক ও প্রশাসনের অন্যান্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ।

কারখানা পরিদর্শন শেষে গণমাধ্যমের সামনে জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমান তার মুগ্ধতার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “নারী উদ্যোক্তা কামরুন নাহার লিপির সাফল্যের গল্প খুবই অনুপ্রেরণাদায়ক”। বিশ্বব্যাংকের পেজে প্রকাশিত ভিডিওটি দেখে তার অত্যন্ত ইমপ্রেসিভ মনে হয়েছে এবং সেই গল্পটি তিনি নেত্রকোনা জেলা প্রশাসনের অফিশিয়াল পেজেও শেয়ার করেছেন বলে জানান। মূলত স্থানীয় পর্যায়ে যারা এমন ব্যতিক্রমী ও কর্মসংস্থানমূলক কাজ করছেন, তাদের সাফল্যকে সামনে তুলে আনা এবং তাদের পাশে দাঁড়ানোর উদ্দেশ্যেই জেলা প্রশাসনের আকস্মিক পরিদর্শন।

পরিদর্শনকালে জেলা প্রশাসকের সঙ্গে আরও উপস্থিত ছিলেন- অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি এবং রাজস্ব) মুন মুন জাহান লিজা, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) ওয়াহিদুজ্জামান, সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মনিজা খাতুনসহ প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীবৃন্দ। তারা কারখানার অটোমেটিক এমব্রয়ডারি মেশিন, কাজের চমৎকার পরিবেশ এবং মানসম্মত পণ্য উৎপাদন প্রক্রিয়া অত্যন্ত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেন। জেলা প্রশাসক এসময় স্বয়ংক্রিয় মেশিনে কাপড়ে নকশা তোলার কাজ এবং তৈরি হওয়া প্যান্ট ও মেয়েদের থ্রি-পিসের মান নেড়েচেড়ে দেখেন এবং কারখানার সামগ্রিক কর্মযজ্ঞ নিয়ে ভূয়সী প্রশংসা করেন।

লিপির আজকের ‘নারীনেত্র কারুপণ্য’ একদিনে গড়ে ওঠেনি। বিশ্বব্যাংকের ভিডিও ফিচারে লিপি তার সেই কণ্টকাকীর্ণ পথের কথা বর্ণনা করেছেন। মাত্র একটি সেলাই মেশিন দিয়ে তার স্বপ্নের যাত্রা শুরু হয়েছিল। শুরুর দিকে তিনি ঢাকা বা অন্য জায়গা থেকে কাটিং কাপড় বা টুকরো কাপড় নিয়ে আসতেন এবং সেগুলো দিয়ে প্যান্ট, নিমার ফতুয়া ইত্যাদি তৈরি করতেন। সেই সময় সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল যাতায়াত ও কাঁচামাল পরিবহন। ট্রেনের বগিতে করে যখন তিনি দুইশো পিস প্যান্ট বা তৈরি মাল নিয়ে যেতেন, তখন রাস্তার লোকজন ও দোকানদাররা তাকে ‘হকার’ বলে উপহাস করত, যা তার মনে গভীর দাগ কাটত।

লিপির এমন উদ্যোগে প্রথম দিকে পরিবারের সমর্থনও ছিল না। বাবা একবার একটি সাদা কাগজ ধরিয়ে দিয়ে বলেছিলেন, “লিখে দে আমি আর তোর বাপ না”। চরম বেদনাহত সেই মুহূর্তেও লিপি হার মানেননি। তিনি তার বাবাকে দৃঢ়কণ্ঠে বলেছিলেন, “আমি একদিন বড় গার্মেন্টসের মালিক হবো, তখন আপনি আমাকে নিয়ে গর্ব করবেন”।

সেই দিনের সেই জেদ আজ লিপিকে সাফল্যের এমন এক চূড়ায় নিয়ে এসেছে, যেখানে তিনি হাজারো নারীর অনুপ্রেরণা। নেত্রকোনায় তিনিই প্রথম পাওয়ার মেশিন ও অত্যাধুনিক ব্যাগ তৈরির কারখানা স্থাপন করেন। বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলে সেসময় এ ধরনের কোনো ব্যাগের ফ্যাক্টরি ছিল না।

বর্তমানে ‘নারীনেত্র কারুপণ্য’-এ ১৫৮ জন কর্মী প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে নিয়মিত কাজ করছেন। কর্মীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও ফায়ার সেফটিসহ বিভিন্ন বিষয়ে নিয়মিত প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। কারখানার আধুনিকায়নে এক্সপোর্ট রেডিনেস ফান্ড (ERF/ইআরএফ) বড় ভূমিকা রেখেছে। লিপির যখন দুটি অত্যাধুনিক এমব্রয়ডারি মেশিনের খুব প্রয়োজন ছিল, তখন ‘ইআরএফ’ তার আবেদন গ্রহণ করে। নিয়ম অনুযায়ী, ‘নারীনেত্র কারুপণ্য’ মেশিনের দামের ৪০ শতাংশ এবং ‘ইআরএফ’ বাকি ৬০ শতাংশ অর্থায়ন করে। শুধু তাই নয়, ‘ইআরএফ’-এর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি বিশ্বমানের ‘আইএসও ৯০০১’ সনদও অর্জন করেছে, যা তাদের শতভাগ গুণগত মান নিশ্চিত করতে এবং ভবিষ্যতে রপ্তানিমুখী কাজে সর্বোচ্চ সহায়তা করছে। কারখানায় এখন ছোট-বড় সবার জন্য প্যান্ট, টিস্যু ব্যাগ, পাটের ব্যাগ এবং মেয়েদের বিভিন্ন আধুনিক পোশাক তৈরি হচ্ছে।

লিপি মনে করেন, অধিকার রক্ষা করতে হলে নারীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার কোনো বিকল্প নেই। এই বিশ্বাস থেকেই তিনি ‘নারীনেত্র’-এর মাধ্যমে নারীদের অর্থনৈতিকভাবে সাবলম্বী করার কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। ইতিমধ্যে তার হাত ধরে প্রায় পাঁচ হাজার মানুষ সরাসরি কাজ শিখেছেন এবং দেশের বিভিন্ন স্থানে নিজেদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পেরেছেন। নারীদের ভাগ্য পরিবর্তনের দৃশ্যই লিপির জীবনের সবচেয়ে বড় পাওয়া।

লিপির স্বপ্ন এখন নেত্রকোনার গণ্ডি ছাড়িয়ে পুরো দেশে ছড়িয়ে পড়া। তিনি চান নেত্রকোনায় এমন একটি মডেল কমপ্লায়েন্ট ফ্যাক্টরি গড়ে তুলতে, যেখানে হাজারো মানুষের কর্মসংস্থান হবে। ঢাকার বড় বড় বায়ারদের যদি তিনি অনন্তপুরের তার কারখানায় আকৃষ্ট করতে পারেন, তবে এই কর্মযজ্ঞের মাধ্যমে কাইলাটি ইউনিয়ন একদিন দেশের বুকে একটি মডেল ইউনিয়ন হিসেবে স্বীকৃতি পাবে- এটাই তার জীবনের চূড়ান্ত স্বপ্ন।

জেলা প্রশাসনের আকস্মিক পরিদর্শন প্রমাণ করে, লিপি এখন আর একা নন। রাষ্ট্রের বিভিন্ন সংস্থা ও প্রশাসন আজ তার মতো উদ্যোক্তাদের পাশে দাঁড়াচ্ছে। কামরুন নাহার লিপি আজ কেবল একজন সফল নারী উদ্যোক্তা নন, তিনি হাজারো নারীর অন্ধকার ঘুচিয়ে আলোয় ফেরার এক ‘জীবন্ত বাতিঘর’।

বিজ্ঞাপন

পড়ুন : ফতুল্লায় চুরির অভিযোগে মারধর, পরে যুবকের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন