উত্তরবঙ্গের সাথে রাজধানীর সড়ক যোগাযোগের অন্যতম প্রধান করিডর এলেঙ্গা-হাটিকুমরুল-রংপুর মহাসড়ক। প্রতিদিন এই সড়ক দিয়ে চলাচল করে অসংখ্য যাত্রীবাহী বাস, পণ্যবাহী ট্রাক, ব্যক্তিগত গাড়ি ও অন্যান্য যানবাহন। কৃষিপণ্য ও শিল্পসামগ্রী পরিবহনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে এই মহাসড়কের।
যমুনা সেতু পার হওয়ার পর বিভিন্ন সংযোগস্থলে যানবাহনের চাপ এবং সড়কের ধারণক্ষমতার সীমাবদ্ধতায় দীর্ঘ হয় যাত্রা। সয়দাবাদ, কড্ডার মোড় ও হাটিকুমরুল এলাকায় যানজট তৈরি হলে তার প্রভাব পড়ে উত্তরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকায়। ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার আগে-পরে যানবাহনের সংখ্যা বেড়ে গেলে ভোগান্তি আরও বাড়ে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সাসেক সড়ক সংযোগ প্রকল্প-২-এর আওতায় হাটিকুমরুল মোড়ে নির্মাণ করা হচ্ছে ক্লোভারলিফ ইন্টারচেঞ্জ। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না রেলওয়ে ব্রিজ করপোরেশন।
দীর্ঘদিনের এই দুর্ভোগ কমানোর প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে সিরাজগঞ্জের হাটিকুমরুলে নির্মাণাধীন ক্লোভারলিফ ইন্টারচেঞ্জ ঘিরে। প্রায় ৭৪৩ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই অবকাঠামোর প্রধান কাঠামো আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে যান চলাচলের উপযোগী করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে প্রকল্প কর্তৃপক্ষ। লক্ষ্য পূরণে দিন-রাত দুই শিফটে চলছে নির্মাণকাজ।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের আশা, ইন্টারচেঞ্জটি চালু হলে হাটিকুমরুল মোড়ে যানবাহনের চলাচল আরও সুশৃঙ্খল হবে, কমবে যাত্রার সময় এবং রাজধানীর সঙ্গে উত্তরাঞ্চলের যোগাযোগব্যবস্থা পাবে নতুন গতি। তবে দীর্ঘদিনের যানজট পুরোপুরি নিরসনে শুধু ইন্টারচেঞ্জ চালু করাই যথেষ্ট নয়। যমুনা সেতুর উপরিভাগ সম্প্রসারণ, মহাসড়কের বাকি কাজ শেষ করা এবং কার্যকর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করাও জরুরি।
প্রকল্প সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বালু ভরাট, বাউন্ডারি ওয়াল, সেতু নির্মাণ ও সার্ভিস এরিয়াসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজের বড় অংশ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। মহাসড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক রাখতে ছয়টি সার্ভিস লেনও খুলে দেওয়া হয়েছে। এখন নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ইন্টারচেঞ্জের প্রধান কাঠামো নির্মাণ শেষ করাই অগ্রাধিকার।
সাসেক-২ প্রকল্পের ব্যবস্থাপক ও সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সরফরাজ হোসাইন বলেন, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে ইন্টারচেঞ্জ ফ্লাইওভারের মূল কাঠামোর নির্মাণকাজ শেষ করে যান চলাচলের উপযোগী করাই তাঁদের লক্ষ্য। এ জন্য প্রকৌশলী ও শ্রমিকেরা দুই শিফটে ২৪ ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করছেন।
তবে প্রকল্পের প্রধান কাঠামো যান চলাচলের উপযোগী হওয়া আর পুরো প্রকল্পের সব কাজ শেষ হওয়া এক বিষয় নয়। তাই ডিসেম্বরের লক্ষ্য পূরণের পাশাপাশি অবশিষ্ট কাজের অগ্রগতি এবং সংযোগ সড়কগুলোর কার্যকারিতাও গুরুত্বপূর্ণ।
এলেঙ্গা-হাটিকুমরুল-রংপুর মহাসড়ক চারলেনে উন্নীত করার কাজ শুরু হয় ২০১৬ সালে। পরবর্তী সময়ে ২০২২ সালে হাটিকুমরুল মোড়ে ক্লোভারলিফ ইন্টারচেঞ্জ নির্মাণের কাজ শুরু হয়। প্রকল্পটির প্রাথমিক মেয়াদ ছিল ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। তবে ভূমি অধিগ্রহণসহ বিভিন্ন জটিলতায় নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করা সম্ভব হয়নি। পরে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত করা হয়।
বর্ধিত মেয়াদের শেষ পর্যায়ে এসে ডিসেম্বরের মধ্যে প্রধান কাঠামো চালুর লক্ষ্য বাস্তবায়ন প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে নির্মাণের গুণগত মান, সড়কের নিরাপত্তা ও সংযোগব্যবস্থার কার্যকারিতা নিশ্চিত করার বিষয়টিও সমান গুরুত্ব পাচ্ছে। নির্মাণকাজের নির্ভুলতা ও তদারকি নিশ্চিত করতে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
সাসেক-২ প্রকল্পের পরিচালক ড. মো. ওয়ালিউর রহমান জানান, জরিপকাজের নির্ভুলতা নিশ্চিত করতে জিপিএস প্রযুক্তি এবং নির্মাণকাজের নিবিড় তদারকিতে বিল্ডিং ইনফরমেশন মডেলিং (বিআইএম) সফটওয়্যার ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে তাঁর মতে, হাটিকুমরুল ইন্টারচেঞ্জ চালুর পাশাপাশি যমুনা সেতুর উপরিভাগ সম্প্রসারণও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেতুর উপরিভাগের পুরোনো রেললাইন অপসারণের পর সেখানে দুই লেন সম্প্রসারণের কাজ শেষ করা না গেলে সাসেক প্রকল্পের সুফল পুরোপুরি পাওয়া কঠিন হবে। এতে যানজটের স্থায়ী সমাধানও বাধাগ্রস্ত হতে পারে। তিনি জানান, বিষয়টি ইতোমধ্যে যমুনা সেতু ও রেল কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। পাশাপাশি মহাসড়কের নিরাপত্তাব্যবস্থা আধুনিকায়নের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরা হয়েছে।
হাটিকুমরুল ইন্টারচেঞ্জ চালু হলে সংশ্লিষ্ট মোড়ে যানবাহনের চলাচল সহজ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে যমুনা সেতু পারাপারের সক্ষমতা বাড়ানো না গেলে উত্তরবঙ্গগামী যানবাহনের চাপ অন্য কোনো অংশে গিয়ে জমতে পারে। এ কারণে সেতুর উপরিভাগ সম্প্রসারণের কাজকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
যমুনা সেতু কর্তৃপক্ষের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রিয়াজ উদ্দিন বলেন, সেতুর উপরিভাগে রেলট্র্যাক অপসারণের পর আন্তর্জাতিকভাবে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। ২৭৮ কোটি টাকা ব্যয়ে সেতুর উপরিভাগ সম্প্রসারণের জন্য গত মে মাসে চীনের একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি হয়েছে। তিনি জানান, চুক্তির মেয়াদ ১৮ মাস। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মালামাল সংগ্রহ ও প্রয়োজনীয় প্রস্তুতির জন্য ইতোমধ্যে পাঁচ মাস পার হয়েছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে আগামী রোজার ঈদের আগে সম্প্রসারিত অংশ যান চলাচলের উপযোগী করে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। নির্ধারিত সময়ে সেতুর সম্প্রসারণকাজ শেষ না হলে যানবাহন চলাচলে নতুন করে বিড়ম্বনা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলেও জানান তিনি।
অর্থাৎ, হাটিকুমরুলে ইন্টারচেঞ্জ নির্মাণ এবং যমুনা সেতুর সক্ষমতা বৃদ্ধি—দুটি কাজের অগ্রগতিই উত্তরবঙ্গের যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ। একটি কাজ সম্পন্ন হলেও অন্যটির অগ্রগতি পিছিয়ে থাকলে প্রত্যাশিত সুফল পেতে সময় লাগতে পারে।
যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন হলে তার সুফল শুধু যাত্রী চলাচলে সীমাবদ্ধ থাকে না। পণ্য পরিবহনের সময় ও ব্যয় কমলে কৃষক, উৎপাদক, ব্যবসায়ী এবং সাধারণ ভোক্তারাও উপকৃত হন। বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলের কৃষিপণ্য ও শিল্প সামগ্রী দ্রুত রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন বাজারে পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
সিরাজগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি সাইদুর রহমান বাচ্চু বলেন, ইন্টারচেঞ্জ ফ্লাইওভারসহ পুরো চারলেনে সড়ক চালু হলে উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলের কৃষিপণ্য ও শিল্পসামগ্রী দ্রুত রাজধানীতে পৌঁছানো সম্ভব হবে। এতে পরিবহন সময় ও ব্যয় কমবে এবং ব্যবসায়ী ও সাধারণ ভোক্তা উভয়েই উপকৃত হবেন।
ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশা, মহাসড়ক ও ইন্টারচেঞ্জের কাজ সম্পন্ন হলে পণ্য পরিবহনে অনিশ্চয়তা কমবে। কৃষিপণ্য দ্রুত বাজারে পৌঁছাতে পারলে সময়ের অপচয় কমার পাশাপাশি সরবরাহব্যবস্থাও আরও কার্যকর হবে। শিল্পপণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রেও তৈরি হতে পারে নতুন সম্ভাবনা।
তবে এসব সুফল বাস্তবে পেতে অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি সড়কের নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, কার্যকর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং নিরাপদ যান চলাচল নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
হাটিকুমরুল ক্লোভারলিফ ইন্টারচেঞ্জ উত্তরাঞ্চলের যোগাযোগব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি করেছে। ডিসেম্বরের মধ্যে এর প্রধান কাঠামো যান চলাচলের উপযোগী করা গেলে তা হবে দীর্ঘদিনের একটি প্রত্যাশা পূরণের পথে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি।
তবে যানজটের স্থায়ী সমাধান নির্ভর করবে পুরো যোগাযোগ করিডরের সক্ষমতার ওপর। যমুনা সেতুর সম্প্রসারণ, মহাসড়কের বাকি কাজ, সংযোগ সড়কের কার্যকারিতা এবং ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় প্রয়োজনীয় উন্নয়ন না হলে যানজটের চাপ অন্য পয়েন্টে স্থানান্তরিত হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়।
তাই ডিসেম্বরের মধ্যে ইন্টারচেঞ্জের প্রধান কাঠামো চালুর লক্ষ্য পূরণের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সব অবকাঠামো প্রকল্পের মধ্যে সমন্বয় নিশ্চিত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। দীর্ঘদিনের যানজট ও ভোগান্তি থেকে মুক্তি পেতে উত্তরাঞ্চলের মানুষের প্রত্যাশা, নতুন ইন্টারচেঞ্জের সুফল যেন শুধু একটি মোড়ে সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং রাজধানী থেকে উত্তরবঙ্গ পর্যন্ত পুরো সড়কপথেই যাত্রা হোক দ্রুত, নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন।
পড়ুন : ইসরায়েলে ক্ষমতার পালাবদলের সম্ভাবনা, ফিলিস্তিনিদের জন্য কী বদলাবে?
সা/


