সৌখিনতায় বাড়ির ছাঁদ বাগান থেকেই শুরু হয় ড্রাগন ফলের চাষ। ২০০০ সালে ক্যাকটাস জাতের এই ফলটি শহরের বিভিন্ন বাড়ির ছাঁদে দেখা যেতো। তবে গত ২০১০ সালের পর পরিচিতি পায় এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পরে। সম্প্রতি সার এবং নানা উপকরণ সংকটের কারণে লোকসানের আতঙ্কে চাষি ও উদ্যোক্তারা।
এই ফলের আদি উৎপত্তি স্থান হলো আমেরিকা এবং মেক্সিকো অঞ্চলে। বর্তমান দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশ, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম এবং মালয়েশিয়া। বিশ্বেরর উষ্ণমন্ডলীয় বিভিন্ন দেশে বাণিজ্যিকভাবে ব্যাপকভাবে চাষ করা হচ্ছে। ড্রাগন ফল মূলত ক্যাকটাস পরিবারের হিলোসেরিয়াস এভং সেলেনেসিয়াস গোত্রের এক ধরনের লতানো ক্যাকটাস জাতীয় উদ্ভিদ ফল। এই গাছ দেখতে অনেকটা ক্যাকটাসের মতো হলেও এর ফলটি অত্যন্ত রসালো এবং পুষ্টিকর।
বর্তমান ড্রাগন ফলটি দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে। রাজশাহী বিভাগের নাটোর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ ও রাজশাহী জেলায় এই ফলের চাষ ব্যাপক বিস্তার হয়েছে। রাজশাহী কৃষি দপ্তরের তথ্য মতে এবার রাজশাহী জেলায় ২৫৮ হেক্টর জমিতে ৫০১৭ মে.টন উৎপাদন হয়েছে। নওগাঁ জেলায় ৭৬ হেক্টরে ১১৩৮ মে.টন, নাটোরে ১৬৯ হেক্টরে ১৭২২ মে.টন এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় ১২ হেক্টর জমিতে ১৯২ মে.টন ড্রাগন ফল উৎপাদন হয়েছে।
ড্রাগন ফল চাষের জন্য উর্বর ও নিস্কশন ব্যবস্থা ভালো এমন দোআঁশ বা বেলে- দোআঁশ মাটি সবচেয়ে উপযোগী। মাটিতে অতিরিক্ত পানি জমে থাকেল গাছের শিকড় পচে যাওয়ার সম্ভবনা থাকে। যার কারনে পানি নিস্কাশনের সুব্যবস্থা থাকা জরুরি। মাটির পিএইচ মান ৬ থেকে ৭ এর মধ্যে থাকলে ভালো ফলন পওয়া যায়। পর্যাপ্ত রোদ পাওয়া যায় এমন উচুঁ বা মাঝারি জমিতে এই ফলের চাষ ভালো হয়।
বিশে^ তিন প্রজাতির ড্রাগন ফল রয়েছে। যার বৈজ্ঞানিক নাম হিলোসেরিয়াস আন্ডাটাস, এর খোসা লাল রঙের এবং ভেতরে সাদা রঙের হয় কালো ছোট ছোট বীজ থাকে। হিলোসেরিয়াস কোস্টারিচেনসিস, এর খোসা ও ভেতরে শাঁস লাল রঙের হয় এবং হিলোসেরিয়াস মেগালোন্যান্থাস, এই জাতের ফলের খোসা হলুদ এবং ভেতরের অংশ সাদা রঙের হয়। অপরদিকে বিশে^র বিভিন্ন দেশে সংকরায়ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আরো অরো অনেক উন্নত জাত ও সংকর প্রজাতির উদ্ভাবন করা হয়েছে।
ড্রাগন ফলের চাষপদ্ধতি বংশবিস্তার ও চারা রোপণ সাধারণত ডাল বা কাটিং এর মাধ্যমে বংশবিস্তার করা হয়। এছাড়া টিস্যু কালচার বা বীজের মাধ্যমেও চারা তৈরি করা যায়, তবে ডাল থেকে চারা করলে দ্রুত ফলন পাওয়া যায়। সাধারণত বর্ষা বা বসন্তকাল চারা রোপণের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত সময়। মাচা বা পিলারের ব্যবহার করে ড্রাগন গাছ লতানো ক্যাকটাস জাতীয় চাষা করা হয়। এই গাছ উপরে তোলার জন্য পাকা পিলার, বাঁশ বা কাঠের খুঁটি এবং তার দিয়ে তৈরি মাচার প্রয়োজন হয়। খুঁটির চারপাশে ৩-৪টি চারা রোপণ করতে হয় যাতে গাছগুলো খুঁটি বেয়ে ওপরে উঠতে পারে। এই গাছে অতিরিক্ত পানির প্রয়োজন হয় না। মাটিতে রস না থাকলে পরিমাণমতো সেচ দিতে হবে, তবে জলাবদ্ধতা একেবারেই সহ্য করতে পারে না। জৈব সার (যেমন— পচা গোবর, কেঁচো সার বা কম্পোস্ট) এবং পরিমিত মাত্রায় ইউরিয়া, টিএসপি ও পটাশ সার ব্যবহার করলে গাছের বৃদ্ধি ও ফলন ভালো হয়।
ড্রাগন গাছে সাধারণত পোকামাকড়ের আক্রমণ কম হয়। তবে অতিরিক্ত আর্দ্রতার কারণে গোড়া পচা রোগ দেখা দিতে পারে। এজন্য ছত্রাকনাশক ব্যবহার করা এবং পরিচ্ছন্ন রাখা জরুরি। গাছ বেশি ঝোপালো হলে অপ্রয়োজনীয় ডাল ছাঁটাই করে দিতে হয়।
চারা রোপণের সাধারণত ১২ থেকে ১৮ মাসের মধ্যেই ফুল আসতে শুরু করে। ফুল ফোটার ৩০ থেকে ৪০ দিনের মধ্যে ফল পাক ধরতে শুরু করে এবং লাল বা হলুদ বর্ণ ধারণ করলে তা সংগ্রহের উপযোগী হয়।
এই ফলে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রয়েছে, যা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় এবং কোষের ক্ষয় রোধ করে। ড্রাগন ফলে প্রচুর ডায়েটারি ফাইবার বা আঁশ থাকে, যা কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে এবং হজমশক্তি উন্নত করতে সাহায্য করে। এটি রক্তে শর্করা মাত্রা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে, যা ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য উপকারী। এর ভেতরের কালো বীজগুলোতে ওমেগা-৩ ও ওমেগা-৬ ফ্যাটি অ্যাসিড থাকে, যা হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করে।
ড্রাগন গাছে সাধারণত পোকামাকড়ের আক্রমণ কম হলেও স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়া বা অতিবৃষ্টির কারণে কিছু রোগ দেখা দিতে পারে। মাটিতে অতিরিক্ত পানি জমে থাকা বা জলমগ্নতার কারণে ফাইটোপথোথরা বা ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণে এ রোগ হয়। গাছের কান্ড হলুদ হয়ে পচে যায়।
জমি থেকে পানি নিষ্কাশনের ভালো ব্যবস্থা করতে হবে এবং আক্রান্ত ডাল কেটে পুড়িয়ে বা মাটিতে পুঁতে ফেলতে হবে। প্রয়োজনে ছত্রাকনাশক (—ম্যাঙ্কোজেব বা কার্বেন্ডাজিম) স্প্রে করতে হবে। ছত্রাকের আক্রমণে কান্ডে ছোট ছোট বাদামী বা সাদা দাগ দেখা দেয়। কপার অক্সিক্লোরাইড জাতীয় ছত্রাকনাশক নিয়মমাফিক স্প্রে করা। অনেক সময় পাকা মিষ্টি ফলে পাখি বা বাদুরের উপদ্রব বাড়ে। ফল রক্ষার জন্য জালি বা নেট ব্যবহার করা যেতে পারে।
ড্রাগন গাছ দীর্ঘ সময় ফল দেয়, তাই নিয়মিত সুষম সার প্রয়োগ করা জরুরি। সাধারণ নিয়মে একটি পূর্ণবয়স্ক গাছে (বা প্রতি খুঁটির চারপাশের গাছের জন্য বছরে) নিচের পরিমাণে সার দেওয়া যেতে পারে। ১৫ থেকে ২০ কেজি পচা গোবর বা কম্পোস্ট সার (বছরে দুই কিস্তিতে বর্ষার আগে ও পরে)। ইউরিয়া সার ২৫০ থেকে ৩০০ গ্রাম (বছরজুড়ে কয়েকটি কিস্তিতে ভাগ করে দিলে ভালো)। টিএসপি সার ২০০ থেকে ২৫০ গ্রাম। এমওপি সার ২৫০ থেকে ৩০০ গ্রাম। জিংক ও বোরন সার পরিমিত পরিমাণে প্রয়োগ করলে ফুলের পরাগায়ন ভালো হয় এবং ফল ঝরে পড়া রোধ হয়।
বাংলাদেশে বর্তমান সময়ে ড্রাগন ফল অত্যন্ত লাভজনক একটি উদ্যান ফসল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। চারা লাগানোর ১ থেকে ১.৫ বছরের মধ্যেই ফলন শুরু হয় এবং একবার গাছ লাগালে টানা ১৫ থেকে ২০ বছর বা তারও বেশি সময় ধরে ফল পাওয়া যায়।
একটি পূর্ণবয়স্ক গাছ থেকে প্রতি মৌসুমে ২০ থেকে ৩০ কেজি বা তার বেশি ফল পাওয়া যায়। বাজারে ভালো জাতের ড্রাগন ফলের চাহিদা ও দাম বেশ ভালো থাকায় (সাধারণত পাইকারি ও খুচরা বাজারে মানভেদে প্রতি কেজি ৩০০ থেকে ৬০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়) বিঘাপ্রতি বা একরপ্রতি চাষে বেশ ভালো মুনাফা অর্জন করা সম্ভব। অন্যান্য অনেক ফসলের তুলনায় এর পরিচর্যা খরচ কম এবং এটি প্রতিকূল আবহাওয়া ও কিছুটা খরা সহ্য করতে পারে।
পাইকার বিক্রেতারা জানায়, দেশি ফলের পাশাপাশি বিদেশি ফলের চাহিাদা প্রতিনিয়িত বাড়ছে। দেশি ফলের সাথে ড্রাগন ফল রাখতে হচ্ছে। বিশেষ করে অসুস্থ রোগীদের জন্য এই ফল বেশ উপকার হওয়ার কারনে অনেকে ক্রয় করে। এই বিক্রয় করে ব্যবসায়ীরা ভালো লাভ পাচ্ছে।
উদ্যোক্তা ওসমান ফারুক জনি বলেন, তিনি রাজশাহী বিশ^ব্যিালয় থেকে পড়ালেখা শেষ করে শিক্ষকতা করতেন। কিছু সময় পরে তিনি চাকুরী ছেড়ে দিয়ে বাড়ির ছাঁদে ড্রাগন ফল চাষ শুরু করেন। ভালো কিছু করার আশায় তার এক বন্ধু সঙ্গে ২০২০ সালে যৌথভাবে ১৩ বিঘায় ড্রাগনের চাষ শুরু করেন। এর পর থেকে তাকে পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। বর্তমান তার নিজের ৩০ বিঘা ড্রাগন ফলের বাগান। এই বাগানে ২০জনের কর্মসংস্থান হয়েছে।
সরকারী প্রণোদনা এবং কৃষি দপ্তরের বিষয়ে তিনি বলেন, নিজের অর্থ আর পরিশ্রম দিয়ে তার এই সাফল্য। সরকারী প্রণোদনা এবং কৃষি দপ্তর থেকে তেমন কোন সহযোগিতা পাওয়া যায়না। সার সংকটে তাদের চাষাবাদ ব্যহত হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট দপ্তর বলছে, দুই বস্তা সার নিয়ে যান, কিন্ত তার এই বড় বাগানে ওই সার দিয়ে তার কিছুই হবে না। সর্বপরি উদ্যোক্তাদের জন্য বিদ্যুৎ বিল সাবসিডারি সিস্টেম করে দিতে হবে। অন্যথায় সার্বিক খরচ সিংগ ভাগ অর্থ চলে যাচ্ছে। এইভাবে চলতে থাকলে কৃষি থেকে সবাই দূরে সরে যাবে বলে তিনি মন্তব্য করেছেন।
অতিরিক্ত উপপরিচালক মিতা সরকার এবং কৃষি সম্প্রসারন অফিসার আব্দুর রাজ্জাক জানান, ড্রাগন ফল চাষি এবং উদ্যোক্তাদের প্রয়োজনিয় সহযোগিতা করা হচ্ছে। এই ফলটি রোগ প্রতিরোধ করতে সক্ষম। বর্তমান সময়ে বিবিধ অনুষ্ঠানে দেশি ফলের পাশাপাশি বিদেশি ফলের মধ্যে ড্রাগনের বেশ চাহিদা রয়েছে। এই ফল চাষাবাদে কম খরচ হওয়ার কারনে প্রতিনিয়িত চাহিদা বৃদ্ধি পাচ্ছে। অনেকে এই ফল চাষে ঝুকছে। কৃষি দপ্তর থেকে সম্ভাব্য সহযোগিতা করা হবে বলে জানান, অতিরিক্ত উপপরিচালক মিতা সরকার।
পড়ুন : সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জে মৎস্য প্রকল্পের খুঁটি-তার সরানোর অভিযোগ


