মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ কর্মকর্তার ব্যাংক হিসাবে সন্দেহজনক লেনদেন

বাংলাদেশ ব্যাংকের মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ বিভাগের এক যুগ্ম পরিচালকের ব্যাংক হিসাব, সম্পদ ও আয়কর নথি ঘিরে একাধিক অসংগতির অভিযোগ উঠেছে। সমকালের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কর্মকর্তা মো. মোশাররফ হোসেনের এমন কিছু ব্যাংক হিসাবে বড় অঙ্কের লেনদেন হয়েছে, যেগুলোর তথ্য তাঁর আয়কর নথিতে উল্লেখ নেই। বেতন-ভাতা থেকে ঋণের কিস্তি ও বাসাভাড়া কর্তনের পরও জমি কেনা, সঞ্চয়পত্র, স্থায়ী আমানত (এফডিআর) এবং শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের তথ্য পাওয়া গেছে। এ ছাড়া মুদি দোকানদার পরিচয়ে তাঁর নামে বিকাশ হিসাব খোলার বিষয়টিও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

বিজ্ঞাপন

তবে এসব লেনদেনের বিষয়ে মোশাররফ হোসেনের বক্তব্যও প্রকাশ করেছে সমকাল। তিনি দাবি করেছেন, তাঁর সব লেনদেনের পেছনে ব্যাংকিং রেকর্ড রয়েছে এবং কোনো অবৈধ বা অনুপার্জিত অর্থ তাঁর হিসাবে জমা হয়নি। তাঁর ভাষ্য, বিভিন্ন হিসাবের অর্থ এসেছে ঋণ, সঞ্চয়পত্র ভাঙানো এবং সহকর্মীদের কাছ থেকে নেওয়া ধার থেকে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, মোশাররফ হোসেন ২০১৩ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকে যোগ দেন। বর্তমানে তিনি পঞ্চম গ্রেডের কর্মকর্তা। তাঁর মূল বেতন ৫৬ হাজার ৩০ টাকা এবং অন্যান্য ভাতাসহ মাসিক আয় প্রায় ৯০ হাজার টাকা। গৃহনির্মাণ ও গাড়ির ঋণের কিস্তি এবং আবাসিক কোয়ার্টারের ভাড়া কর্তনের পর তাঁর বেতনের প্রায় পুরোটাই কেটে নেওয়া হয়।

সমকালের হাতে থাকা বাংলাদেশ ব্যাংক কর্মচারী সমবায় সমিতির হিসাবের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ২২ মাসে বেতন থেকে কর্তনের পর প্রতীকী পাঁচ পয়সা জমা হয়েছে। তবে উৎসব বোনাস, বৈশাখী ভাতা, উৎসাহ বোনাস এবং দুপুরের খাবার, ইন্টারনেট ও মোবাইল ভাতার অর্থ ওই হিসাবে জমা হয়েছে। এসব ভাতা থেকে মাসে গড়ে প্রায় ১০ হাজার টাকা পাওয়ার তথ্য রয়েছে।

প্রতিবেদন বলছে, ওই ২২ মাসে বেতন-ভাতা ছাড়াও তাঁর সমিতির হিসাবে জমা হয়েছে ৩৭ লাখ ৫ হাজার টাকা। এর মধ্যে নগদ ভাউচারের মাধ্যমে জমা হয়েছে ২৬ লাখ ৩০ হাজার টাকা। অন্য ব্যাংক থেকে ক্লিয়ারিংয়ের মাধ্যমে এসেছে আরও ১০ লাখ ৭৫ হাজার টাকা। হিসাব বিবরণীতে এসব অর্থের উৎস উল্লেখ নেই বলে জানিয়েছে সংবাদমাধ্যমটি।

সমকালের অনুসন্ধানে মোশাররফ হোসেনের নামে আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংকের একটি সঞ্চয়ী হিসাবের তথ্য পাওয়া গেছে। ২০১৯ সালের ২৪ মার্চ খোলা ওই হিসাবে গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মোট ২ কোটি ২১ লাখ ৭২ হাজার টাকা জমা হয়েছে। প্রায় সমপরিমাণ অর্থ উত্তোলন এবং বিভিন্ন চার্জ কর্তনের পর হিসাবটিতে অবশিষ্ট ছিল মাত্র ৩ হাজার ৪৫০ টাকা। প্রতিবেদন অনুযায়ী, হিসাবটির তথ্য তাঁর আয়কর বিবরণীতে উল্লেখ নেই।

ওই হিসাবে ৪০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র কেনার তথ্য রয়েছে, যা আয়কর নথিতে উল্লেখ করা হয়নি বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন সময়ে নগদ জমা হয়েছে ৪০ লাখ ৪০ হাজার ৭৩৭ টাকা। অন্য ব্যাংক থেকে স্থানান্তরের মাধ্যমে এসেছে ২৪ লাখ ৮০ হাজার ৫০ টাকা। শেয়ার কেনাবেচা ও লভ্যাংশ থেকে জমা হয়েছে ২৯ লাখ ৪০ হাজার ১৮৮ টাকা। বাকি অর্থ এসেছে মোবাইল ওয়ালেট, এটিএম রিভার্স এবং সঞ্চয়ী হিসাবের মুনাফাসহ বিভিন্ন উৎস থেকে।

মোশাররফ হোসেনের ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বর দিয়ে ২০২১ সালে বিকাশ হিসাব খোলা হয়। সেখানে পেশার ঘরে ‘মালিক, মুদি দোকান সবুজবাগ, ঢাকা’ উল্লেখ রয়েছে। সরকারি কর্মকর্তা হয়েও এ ধরনের পরিচয় ব্যবহারের বিষয়টি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

এ বিষয়ে মোশাররফের বক্তব্য, ২০১৯ সালে বিকাশ এজেন্টের মাধ্যমে হিসাব খোলার সময় এজেন্ট ভুল করে পেশা হিসেবে মুদি দোকানদার উল্লেখ করেছিলেন। ভুল তথ্য দেওয়া হয়েছে, বিষয়টি তিনি জানতেন না বলেও দাবি করেন। তবে হিসাব খোলার সাল নিয়ে প্রতিবেদনে ২০২১ সালের তথ্য থাকলেও তাঁর বক্তব্যে ২০১৯ সালের কথা এসেছে। এ বিষয়ে আরও স্পষ্টতা প্রয়োজন।

প্রতিবেদনে মোশাররফের স্ত্রী উম্মে হাসান ডলির ব্যাংক হিসাবেও উল্লেখযোগ্য অঙ্কের লেনদেনের তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। তিনি ২০২১ সালে জনতা ব্যাংকে চাকরি শুরু করেন। বর্তমানে বেতন-ভাতাসহ মাসে প্রায় ৩০ হাজার টাকা পান। চাকরির শুরু থেকে গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তাঁর মোট বেতন-ভাতা ছিল ১৮ লাখ ৪২ হাজার টাকা। অথচ জনতা ব্যাংকের হিসাবে জমা হয়েছে প্রায় ১ কোটি ৮৭ লাখ টাকা। এ ছাড়া শাহ্জালাল ইসলামী ব্যাংকের আরেকটি হিসাবে জমা হয়েছে ১ কোটি ১৫ লাখ টাকা। এসব অর্থের বড় অংশ মোশাররফের হিসাব থেকে এসেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

তাঁর স্ত্রীর নামে শাহ্জালাল ইসলামী ব্যাংকের হিসাবে ৪৩ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র থাকার তথ্যও পাওয়া গেছে। ওই হিসাবে নগদ জমা হয়েছে ২৯ লাখ ৬৫ হাজার টাকা এবং অন্য হিসাব থেকে ক্লিয়ারিংয়ের মাধ্যমে এসেছে ১৯ লাখ টাকা।

সমকালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মোশাররফ হোসেনের আয়কর নথিতে গাজীপুরের ভূরুলিয়া মৌজায় ৭৯ লাখ ৮ হাজার ৮০০ টাকা মূল্যের তিনটি জমির মালিকানা দেখানো হয়েছে। তবে একই এলাকায় তাঁর আয়কর নথিতে উল্লেখ নেই—এমন ৬২ দশমিক ৬৬ শতাংশ জমির সন্ধান পাওয়ার কথা জানিয়েছে সংবাদমাধ্যমটি।

এ ছাড়া ২০১৯ সালে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ৪ শতাংশ সুদে গৃহনির্মাণ ঋণ নেওয়ার তথ্য রয়েছে। ওই ঋণের বকেয়া স্থিতি ১ কোটি ২ লাখ ২৯ হাজার টাকা। গাড়ি কেনার জন্য নেওয়া ৩০ লাখ টাকার ঋণের বকেয়া ২৯ লাখ ৫৭ হাজার টাকা। তাঁর আয়কর নথিতে কৃষি সম্পত্তি কেনার ব্যয় দেখানো হলেও অকৃষি জমি বা ভবন নির্মাণের ব্যয় শূন্য দেখানো হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

আর্থিক লেনদেনের বাইরে বাংলাদেশ ব্যাংকের কয়েকটি ঘটনায় মোশাররফের বিরুদ্ধে অপেশাদার আচরণের অভিযোগও তুলেছে সমকাল। এর মধ্যে নতুন গভর্নর নিয়োগের দিন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের কিছু আদেশে সই করতে বাধ্য করার অভিযোগ এবং একটি ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যানের বিষয়ে বিএফআইইউ যেন ব্যবস্থা না নেয়, সে জন্য তদবির করার অভিযোগ রয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, এসব ঘটনায় তদন্ত ও লিখিত অভিযোগের বিষয়ও সামনে এসেছে।

অন্যদিকে, মোশাররফ দাবি করেছেন, নগদ জমা ও উত্তোলনের বড় অংশ সহকর্মীদের কাছ থেকে নেওয়া ধার। গত তিন-চার মাসে প্রায় ২০ লাখ টাকা ধার নিয়েছেন বলেও জানান তিনি। স্ত্রীর হিসাব থেকে জমি বিক্রেতাকে দেওয়া ৪৮ লাখ টাকা সম্পর্কে তাঁর বক্তব্য, অর্থটি গৃহনির্মাণ ঋণ ও মেয়াদি সঞ্চয়পত্র ভাঙিয়ে পাওয়া টাকা থেকে এসেছে। স্বল্পমেয়াদি এফডিআর আয়কর রিটার্নে না দেখানোর কারণ হিসেবেও তিনি এর স্বল্প মেয়াদের কথা উল্লেখ করেন।

সব মিলিয়ে, মোশাররফ হোসেনের ব্যাংক হিসাব, সম্পদ ও আয়কর নথি নিয়ে ওঠা প্রশ্নগুলোর চূড়ান্ত নিষ্পত্তির জন্য লেনদেনের উৎস যাচাই, নথিপত্রের তুলনামূলক পরীক্ষা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অভিযোগগুলো এখনো অভিযোগ হিসেবেই বিবেচ্য; স্বাধীন তদন্ত ও প্রমাণের ভিত্তিতেই এসব বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসা প্রয়োজন।

পড়ুন:মাথাপিছু জিডিপিতে ভারতের চেয়ে এগিয়ে থাকবে বাংলাদেশ

ইমি/

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন