বিশ্ববাজারে পণ্যের দাম ২৩ শতাংশ বাড়ার পূর্বাভাস বিশ্বব্যাংকের

বিশ্ববাজারে ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ পণ্যের দাম ২৩ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। ইরানকে কেন্দ্র করে যুদ্ধ, জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন, খাদ্যশস্য পরিবহনে বাধা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে পণ্যের বাজারে অস্থিরতা বাড়তে পারে। এর ফলে বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতি তীব্র হওয়ার পাশাপাশি খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

বুধবার (২৮ অক্টোবর) প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের ‘কমোডিটি মার্কেটস আউটলুক’ প্রতিবেদনের বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস)। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি বিশ্ব অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে। এতে বিশেষ করে নিম্ন আয়ের দেশগুলোর মানুষ বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন।

বিশ্বব্যাংকের উপপ্রধান অর্থনীতিবিদ আয়হান কোসে বলেন, পণ্যের বাজার একই সময়ে কয়েকটি বড় ধাক্কার মুখে পড়েছে। জ্বালানির বাড়তি দাম এবং বাণিজ্য বিঘ্নিত হওয়ার কারণে বিভিন্ন ধরনের পণ্যের মূল্য বাড়ছে। এর প্রভাবে মূল্যস্ফীতি, খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বিশ্ববাজারে খাদ্যপণ্যের দাম ১০ শতাংশ বাড়তে পারে। আগামী বছর অর্থাৎ ২০২৭ সালে আরও ৭ শতাংশ বৃদ্ধির আশঙ্কা রয়েছে। সংঘাতের কারণে খাদ্যশস্য পরিবহনে বিঘ্ন, এল নিনোর প্রভাব এবং জ্বালানি ও সারের উচ্চমূল্য এ পরিস্থিতির পেছনে ভূমিকা রাখবে।

এল নিনোর কারণে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে তাপমাত্রা বাড়তে পারে। এতে কোথাও খরা, কোথাও বন্যা এবং কোথাও তীব্র তাপপ্রবাহ দেখা দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এসব প্রাকৃতিক পরিস্থিতি কৃষি উৎপাদন ব্যাহত করতে পারে। একই সঙ্গে সার ও জ্বালানির ব্যয় বাড়লে কৃষিপণ্যের উৎপাদন খরচও বেড়ে যাবে। ফলে খাদ্য সরবরাহে চাপ তৈরি হওয়ার পাশাপাশি ভোক্তাপর্যায়ে দাম বাড়তে পারে।

প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে, জলবায়ুর প্রতিকূল প্রভাব, যুদ্ধজনিত পরিবহন সংকট এবং উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি একসঙ্গে দেখা দিলে বিশ্ববাজারে খাদ্যসংকটের ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।

বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে জ্বালানির দাম ৩২ শতাংশ বাড়তে পারে। তবে ২০২৭ সালে জ্বালানির দাম কিছুটা কমে আসার সম্ভাবনা রয়েছে। এ পূর্বাভাসের ক্ষেত্রে ইরান ও ইউক্রেনের সংঘাত আরও তীব্র না হওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধের কারণে জ্বালানি ও সার সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হওয়ায় তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস ও সার পরিবহনে চাপ তৈরি হয়েছে। এ পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম আরও বেড়ে যেতে পারে।

বিশ্বব্যাংক সতর্ক করেছে, এল নিনোর প্রভাব তীব্র হওয়া, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে কৃষিপণ্য পরিবহনে নতুন বাধা সৃষ্টি এবং জ্বালানির দাম আরও বেড়ে যাওয়ার মতো ঘটনা একসঙ্গে ঘটলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতিকূল পরিস্থিতি তৈরি হলে ২০২৭ সালে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রতি ব্যারেল গড়ে ১০৫ ডলারে পৌঁছাতে পারে। একই পরিস্থিতিতে খাদ্যপণ্যের দাম পূর্বাভাসের চেয়ে ১২ শতাংশ বেশি হতে পারে। এতে খাদ্যপণ্যের দাম ২০২২ সালের মূল্যস্তরকেও ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, মধ্যপ্রাচ্য ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে ২০২৬ সালে বিশ্বে তেলের সরবরাহ ৫ দশমিক ২ শতাংশ কমতে পারে। কোভিড-১৯ মহামারির সময় বাদ দিলে চার দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে এটি হবে তেলের সরবরাহে সবচেয়ে বড় পতন।

অন্যদিকে, উচ্চমূল্যের কারণে চলতি বছর বিশ্বে তেলের ব্যবহার ২ দশমিক ৫ শতাংশ কমতে পারে। কোভিড-১৯ মহামারি ও ১৯৮০ সালের তেলসংকটের পর এটি হবে বার্ষিক তেল ব্যবহারে তৃতীয় বৃহত্তম পতন।

বিশ্বব্যাংক জানিয়েছে, ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোকে চলতি বছর ৮৭০ কোটি ডলারের জরুরি সহায়তা দিয়েছে সংস্থাটি।

আয়হান কোসে বলেন, উচ্চমূল্যের প্রভাব মোকাবিলায় সবচেয়ে দরিদ্র মানুষকে সুরক্ষা দেওয়া এবং ঋণের চাপে থাকা নিম্ন আয়ের দেশগুলোকে সহায়তা করা এখন অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।

বিশ্ববাজারে জ্বালানি, খাদ্য ও অন্যান্য পণ্যের দাম বাড়লে আমদানিনির্ভর দেশগুলোকে বেশি অর্থ ব্যয় করতে হয়। এতে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়ার পাশাপাশি পরিবহন, বিদ্যুৎ উৎপাদন, কৃষি ও শিল্প খাতের ব্যয়ও বৃদ্ধি পেতে পারে। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বিশ্বব্যাংক জানিয়েছে, গত এপ্রিলে প্রকাশিত পূর্বাভাসের তুলনায় খাদ্য, জ্বালানি ও সামগ্রিক পণ্যের দাম নিয়ে তাদের বর্তমান পূর্বাভাস উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ফলে যুদ্ধ, সরবরাহব্যবস্থার বিঘ্ন ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ন্ত্রণে রাখা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে।

পড়ুন:দেশের বাজারে সোনার দাম ঊর্ধ্বমুখী, ভরিতে বাড়ল ২,২১৬ টাকা

ইমি/

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন