‘এক্স-মেন’ ও ‘স্টার ট্রেক’ খ্যাত ব্রিটিশ অভিনেতা প্যাট্রিক স্টুয়ার্ট আর নেই

দীর্ঘ ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে মঞ্চ, সিনেমা ও টেলিভিশন ইন্ডাস্ট্রিতে নিজের প্রতিভার ছাপ রাখা প্রখ্যাত ব্রিটিশ অভিনেতা প্যাট্রিক স্টুয়ার্ট মারা গেছেন। হলিউডের জনপ্রিয় সিনেমা সিরিজ ‘এক্স-মেন’-এর প্রফেসর চার্লস জেভিয়ার এবং বিজ্ঞানভিত্তিক কল্পনানির্ভর ‘স্টার ট্রেক’-এর ক্যাপ্টেন জ্যাঁ-লুক পিকার্ড চরিত্রে অভিনয় করে তিনি বিশ্বজুড়ে অসামান্য খ্যাতি অর্জন করেছিলেন।

বিজ্ঞাপন

গত ২৮ অক্টোবর লস অ্যাঞ্জেলেসের নিজ বাড়িতে ৮৬ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এই হলিউড তারকা। অভিনেতার মুখপাত্র কেলি বুশ নোভাক সংবাদমাধ্যমকে এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, অ্যালঝেইমার রোগ ও লিউই বডি ডিমেনশিয়ার সঙ্গে জীবনের কিছু সময় বেদনাদায়ক সংগ্রামের পর বুধবার (২৮ অক্টোবর) তিনি মারা যান।

দ্য হলিউড রিপোর্টারের প্রতিবেদন অনুযায়ী, অভিনেতার মুখপাত্র আরও জানান, পরিবার ও বন্ধুদের উষ্ণ ভালোবাসায় ঘেরা অবস্থায় সরাসরি গান, প্রার্থনা, অশ্রু-হাসি এবং গভীর আবেগের মধ্য দিয়ে বিদায় নিয়েছেন প্যাট্রিক স্টুয়ার্ট। আর এমন আবেগ, আমাদের প্রতি সারাজীবনের ভালোবাসার বিনিময়ে শুধু তিনিই সঞ্চার করতে পারেন। তার মুখের সেই শান্তভাব ও আত্মপ্রকৃতি আমরা চিরকাল মনে রাখব। যা তার অক্ষয় মার্জিত রূপের এক চিরন্তন স্মারক।

১৯৪০ সালের ১৩ জুলাই ইংল্যান্ডের ইয়র্কশায়ারের মিরফিল্ডে আলফ্রেড ও গ্ল্যাডিস স্টুয়ার্টের ঘরে জন্ম নেওয়া প্যাট্রিক স্টুয়ার্ট ছিলেন পরিবারের সবার ছোট সন্তান। তার বাবা একজন অর্ধ-দক্ষ শ্রমিক ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সৈনিক ছিলেন, যিনি ডানকার্ক থেকে মুক্ত হওয়া শেষ ব্যক্তিদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন। অতিরিক্ত মদ্যপায়ী এই মানুষটি স্ত্রীর ওপর শারীরিক অত্যাচার চালালেও কখনো তিন ছেলের গায়ে হাত তুলতেন না। অনেক বছর পর প্যাট্রিক স্টুয়ার্ট জানতে পারেন, তার বাবার এমন হিংসাত্মক আচরণের মূল কারণ ছিল অনিরূপিত ‘পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার।’

পরিবারে ছোট হলেও ভীতিগ্রস্ত পরিবেশে বড় হওয়া প্যাট্রিক বাবার অত্যাচার থেকে মাকে রক্ষা করার জন্য প্রায়ই সামনে গিয়ে দাঁড়াতেন। পরবর্তী জীবনে সাবেক সৈনিক এবং পারিবারিক সহিংসতার শিকার হওয়া মানুষের পাশে দাঁড়াতে তার এই অতীত অভিজ্ঞতা থেকেই সোচ্চার ভূমিকা পালন করেছিলেন তিনি।

১৯৮০-এর দশকের শেষ দিকে ইংল্যান্ডে ধ্রুপদী থিয়েটারে দীর্ঘ কাজের অভিজ্ঞতা থাকলেও, যখন তার হাতে ইউএসএস এন্টারপ্রাইজের দায়িত্ব তুলে দেয়া হয়—তখন মার্কিন মুল্লুকে সম্পূর্ণ অপরিচিত এক মুখ ছিলেন প্যাট্রিক স্টুয়ার্ট।

‘স্টার ট্রেক: দ্য নেক্সট জেনারেশন’-এর প্রযোজক রবার্ট জাস্টম্যান ইউসিএলএ’র একটি বক্তৃতায় প্যাট্রিক স্টুয়ার্টকে আবিষ্কার করেন। সেখানে তাকে নিজস্ব মার্জিত ও আভিজাত্যপূর্ণ ভঙ্গিতে উইলিয়াম শেক্সপিয়রের কবিতা আবৃত্তি করতে শোনেন জাস্টম্যান। ‘স্টার ট্রেক’-এর নির্মাতা জিন রোডেনবেরির আপত্তি ও একজন চুলহীন ব্রিটিশ ব্যক্তি নতুন সিরিজের প্রধান মুখ হতে পারবেন না—এমন সংশয় থাকা সত্ত্বেও, রবার্ট জাস্টম্যান তাকে অডিশনের জন্য ডাকেন। পরবর্তীতে কঠোর কাস্টিং প্রক্রিয়ার বাধা পেরিয়ে তিনি খুঁতখুঁতে স্বভাবের নির্মাতার মন জয় করেন এবং ক্যাপ্টেন জিন-লুক পিকার্ড চরিত্রে দীর্ঘমেয়াদী চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন।

কল্পবিজ্ঞানভিত্তিক টেলিভিশন ইন্ডাস্ট্রির ইতিহাসেও কিছু স্মরণীয় পর্বে অভিনয় করেছেন প্যাট্রিক স্টুয়ার্ট। যার মধ্যে ১৯৯০ সালের ভিন্ন সময়ের প্রেক্ষাপটে তৈরি ‘ইয়েস্টারডেজ এন্টারপ্রাইজ’ এবং ১৯৯২ সালের ‘দ্য ইনার লাইট’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য; যেখানে অল্প সময়ের মধ্যেই পিকার্ডের গোটা জীবনযাপনের গল্প তুলে ধরা হয়েছিল।

প্যাট্রিক স্টুয়ার্ট ও তার আমেরিকান সহশিল্পীরা টেলিভিশনের ইতিহাসে অন্যতম সুসংগঠিত ও ঘনিষ্ঠ দল হিসেবে পরিচিত ছিলেন। অবশ্য শুরুর দিকে ১৪ ঘণ্টার দীর্ঘ শুটিং শিডিউলের ফাঁকে সহকর্মীদের হালকা রসিকতা মেনে নিতে বেশ বেগ পেতে হতো তার। এ বিষয়ে ২০১৩ সালে তিনি বলেছিলেন, “তারাই আমাকে শিখিয়েছে, ভালো কাজের পাশাপাশি আনন্দও করা যায়। এর আগ পর্যন্ত আমি মনে করতাম, দুটো বিষয় একদমই আলাদা।”

১৯৯৪ সালে সাতটি সিজন শেষ হওয়ার মধ্য দিয়ে ইতি টানে ‘নেক্সট জেনারেশন’। ড্রামা সিরিজ বিভাগে একটি এমি মনোনয়ন পাওয়ার পাশাপাশি সিরিজটি চারটি চলচ্চিত্রের জন্ম দেয়। এগুলো হলো— উইলিয়াম শ্যাটনারের সঙ্গে যৌথ অভিনীত ‘স্টার ট্রেক: জেনারেশনস’ (১৯৯৪), ‘স্টার ট্রেক: ফার্স্ট কন্টাক্ট’ (১৯৯৬), ‘স্টার ট্রেক: ইনসারেকশন’ (১৯৯৮) এবং ‘স্টার ট্রেক: নেমেসিস’ (২০০২)। এর মধ্যে শেষ সিনেমাটিতে প্যাট্রিক স্টুয়ার্টকে পিকার্ডের এক কম বয়সী ক্লোন চরিত্রের মুখোমুখি হতে দেখা যায়, যেখানে অভিনয় করেছিলেন সেসময়ের অখ্যাত টম হার্ডি।

এরও আগে, ব্রিটিশ সিনেমা ও টেলিভিশনে নানা কাজের অভিজ্ঞতা অর্জনের পর জন বোরম্যানের কিং আর্থার সংক্রান্ত চলচ্চিত্র ‘এক্সক্যালিবার’ (১৯৮১)-এর মাধ্যমে হলিউডে ডেবিউ করেছিলেন প্যাট্রিক স্টুয়ার্ট। পরবর্তীতে ডেভিড লিঞ্চের ক্লাসিক কল্পবিজ্ঞান সিনেমা ‘ডিউন’ (১৯৮৪)-এ গুরনি হ্যালেক চরিত্রে অভিনয় করে দর্শকের নজর কাড়েন এই তারকা।

পড়ুন : শনিবার প্রকাশিত হচ্ছে এইচএসসির ফলাফল, জানবেন যেভাবে

সা/

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন