পাবনার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে পরীক্ষামূলক বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হয়েছে। শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) বিকেলে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম চ্যানেল টোয়েন্টিফোরকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
তিনি জানান, আল্লাহর রহমতে দুপুর ১২টায় দ্বিতীয় দফা পারমাণবিক বিক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। এরপর ধীরে ধীরে পরীক্ষামূলকভাবে নিয়ন্ত্রিত শক্তি উৎপাদন প্রক্রিয়া বা বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হবে।
এর আগে বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) পাওয়ার স্টার্টআপ বা বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রক্রিয়া শুরুর অনুমোদন পায় রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিট। এদিন বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ- বায়েরা এর অনুমোদন দেয়।
এই ধাপে প্রথমবারের মতো স্বয়ংসম্পূর্ণ চেইন রিঅ্যাকশন বা পরমাণুর বিভাজন তৈরি করা হবে। অর্থাৎ, চুল্লিতে ধীরে ধীরে স্থায়ী ও নিরাপদভাবে শক্তি বা বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হবে। আগের সব পরীক্ষা-নিরীক্ষা সফলভাবে শেষ হয়েছে।
আন্তর্জাতিক পারমাণবিক সংস্থা আইএইএ’র গাইডলাইন অনুযায়ী, রাশিয়ার সহযোগিতায় নির্মিত এই প্রকল্পের প্রথম ইউনিটের স্টেজ ‘বি ওয়ান’ মোটামুটি সফলভাবে শেষ হয়েছে। সবশেষ স্বয়ংক্রিয় চাপ প্রশমন ভালভ পরীক্ষার জটিলতাও কেটে গেছে। এর পরের ধাপ ‘বি টু’। এই ধাপে প্রাথমিক অপারেশনের জন্য পারমাণবিক চুল্লিকে প্রস্তুত করা হয়। এরপরই শুরু হয় ক্রিটিক্যালিটি।
এটি এমন একটি পর্যায়, যেখানে স্বয়ংসম্পূর্ণ চেইন রিঅ্যাকশন বা পরমাণুর বিভাজন তৈরি করা হয়। এর মাধ্যমে চুল্লিতে ধীরে ধীরে স্থায়ী ও নিরাপদভাবে শক্তি বা বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হয়। এখানে ধাপে ধাপে সফলভাবে এগিয়ে ৩০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত এলে বাণিজ্যিকভাবে জাতীয় সঞ্চালন লাইনে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হবে।
এদিকে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের দ্বিতীয় ইউনিটের ভিভিইআর-১২০০ রিঅ্যাক্টরের প্রারম্ভিক লোডিংয়ের জন্য পারমাণবিক জ্বালানি সরবরাহ শুরু করেছে রাশিয়া। বৃহস্পতিবার সকালে এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানিয়েছে দেশটির পরমাণু শক্তি সংস্থা-রোসাটম।
নভেম্বরেই জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহে প্রস্তুত হচ্ছে রূপপুর
আগামী নভেম্বর মাসের মধ্যেই পাবনার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু করা সম্ভব হবে বলে আশা করছে সরকার। একই সাথে প্রকল্পটির দ্বিতীয় ইউনিটের রিঅ্যাক্টর চালু বা ফুয়েল লোডিংয়ের কাজ আগামী বছরের জুন মাসের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে কাজ।
বুধবার (১৪ অক্টোবর) জাতীয় সংসদ ভবনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়। কমিটির সভাপতি ও জাতীয় সংসদের হুইপ রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলুর সভাপতিত্বে আয়োজিত এই বৈঠকে দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটির সার্বিক অগ্রগতি ও ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনা করা হয়।
বৈঠকে প্রকল্পের অগ্রগতি তুলে ধরে জানানো হয় যে, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রাথমিক ক্রিটিক্যালিটি ও ফিজিক্যাল টেস্ট সফলতার সাথে শুরু করা হয়েছে। রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক শক্তি করপোরেশন ‘রোসাটম’-এর সাথে সুফলদায়ক আলোচনার পর আগামী নভেম্বরে বিদ্যুৎ সরবরাহ চালুর এই প্রত্যাশা ব্যক্ত করা হয়।
প্রকল্পটির প্রযুক্তিগত ও নিরাপত্তার বিষয়গুলো স্পষ্ট করে সভায় বলা হয়, থার্ড জেনারেশনের এই প্ল্যান্টটি অত্যন্ত আধুনিক ও সুরক্ষিত। বিশেষজ্ঞদের নিবিড় তত্ত্বাবধানে আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে এটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে, তাই নিরাপত্তা নিয়ে কোনো প্রকার বিভ্রান্তির অবকাশ নেই। আন্তর্জাতিক এনার্জি বিশেষজ্ঞরাও প্রকল্পটিকে সঠিক পথের স্বীকৃতি দিয়েছেন।
বিদ্যুৎ প্রকল্পের বাইরেও বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন অন্যান্য উন্নয়নমূলক কাজের চিত্র সভায় উঠে আসে। এতে জানানো হয়, সারা দেশে নিউক্লিয়ার মেডিসিনের সুফল জেলা পর্যায় পর্যন্ত পৌঁছানোর কাজ চলমান রয়েছে। এর পাশাপাশি দেশের প্রথম রিসার্চ ভেসেল (গবেষণা জাহাজ) নির্মাণের কার্যক্রমও অব্যাহত আছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ এসব প্রকল্পের কাজ শেষ হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়।
এ ছাড়া শিক্ষার্থীদের উদ্ভাবনী চিন্তা ও বৈজ্ঞানিক মেধা বিকাশে স্কুল ও কলেজ পর্যায়ে জাঁকজমকপূর্ণ বিজ্ঞান মেলা আয়োজনের জন্য সুপারিশ করেছে সংসদীয় কমিটি। একই সাথে নতুন নতুন উদ্ভাবনের মাধ্যমে তা বিদেশে রফতানি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের কার্যকরী উদ্যোগ গ্রহণের জোর তাগিদ দেওয়া হয়।
সভার শুরুতে পবিত্র কুরআন তেলাওয়াতের পর কমিটির সভাপতি স্বাধীনতার ঘোষক শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া, মহান মুক্তিযুদ্ধের বীর শহিদগণ এবং ২০২৪ সালের ঐতিহাসিক জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে নিহত শহিদদের গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করেন। পরবর্তীতে পরিচিতি পর্ব এবং পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশনের মাধ্যমে দাপ্তরিক কাজের বিবরণ উপস্থাপন করা হয়।
উক্ত বৈঠকে কমিটির সদস্য ও বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম এবং সংসদ সদস্য (এমপি) এ জেড এম রেজওয়ানুল হক, মো. আনোয়ারুল ইসলাম, মোহাম্মদ ফাহিম চৌধুরী, কে এম বাবর, সানসিলা জেবরিন, সালাহ উদ্দিন, মারদিয়া মমতাজ ও মো. আব্দুল গফুর অংশ নেন। এছাড়াও বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আনোয়ার হোসেনসহ মন্ত্রণালয় ও জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
পড়ুন : চার দিনের জাপান সফর শেষে ঢাকায় পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী


