বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান মাইক্রোসফটের আয় আবারও নতুন রেকর্ড গড়েছে। ২০২৬ সালের তৃতীয় প্রান্তিকে প্রতিষ্ঠানটির মোট আয় দাঁড়িয়েছে ৯২ দশমিক ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় এ আয় বেড়েছে ১৯ শতাংশ। এর মধ্য দিয়ে টানা ১০ প্রান্তিকে আয়ের নতুন রেকর্ড গড়েছে প্রযুক্তি জায়ান্টটি। ক্লাউড কম্পিউটিং ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) সেবার ক্রমবর্ধমান চাহিদা প্রতিষ্ঠানটির এই প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
প্রযুক্তিবিষয়ক সংবাদমাধ্যম টেকক্রাঞ্চের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বুধবার প্রকাশিত আর্থিক ফলাফলে মাইক্রোসফট জানিয়েছে, আলোচ্য প্রান্তিকে তাদের নিট মুনাফা হয়েছে ৩৬ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় নিট মুনাফা বেড়েছে ৩২ শতাংশ। আয় ও মুনাফা—উভয় ক্ষেত্রেই উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসায়িক অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করেছে।
মাইক্রোসফটের আয়ের প্রবৃদ্ধিতে সবচেয়ে বড় অবদান রেখেছে ক্লাউড ব্যবসা। এ খাত থেকে প্রতিষ্ঠানটির আয় হয়েছে ৬৩ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩০ শতাংশ বেশি। ক্লাউড সেবার প্রতি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নির্ভরতা বৃদ্ধি পাওয়ায় এ খাতে মাইক্রোসফটের ব্যবসা সম্প্রসারিত হচ্ছে।
ক্লাউড সেবার মধ্যে প্রতিষ্ঠানটির জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্ম অ্যাজুর থেকে আয় হয়েছে ৩৩ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার। অন্যদিকে মাইক্রোসফট ৩৬৫ থেকে আয় হয়েছে প্রায় ২৮ বিলিয়ন ডলার। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান নিজেদের তথ্য সংরক্ষণ, সফটওয়্যার পরিচালনা, অনলাইন সেবা এবং প্রযুক্তিগত অবকাঠামোর জন্য এসব সেবা ব্যবহার করছে।
বিশেষ করে এআই প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ার কারণে ক্লাউড অবকাঠামোর চাহিদা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে ক্লাউড খাত থেকে আসা সব আয় যে এআই-সংশ্লিষ্ট, তা নয়। অনেক প্রতিষ্ঠান প্রচলিত সফটওয়্যার, তথ্য সংরক্ষণ এবং অনলাইনভিত্তিক বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনার জন্যও অ্যাজুরের সেবা ব্যবহার করে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, আলোচ্য প্রান্তিকে ওপেনএআই থেকে ১০ বিলিয়ন ডলার আয় করেছে মাইক্রোসফট। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তি উন্নয়ন ও পরিচালনায় ওপেনএআইয়ের সঙ্গে মাইক্রোসফটের অংশীদারত্ব রয়েছে। ওপেনএআইয়ের অনেক প্রযুক্তি ও সেবা এখনো মাইক্রোসফটের ক্লাউড অবকাঠামোয় পরিচালিত হয়।
তবে ওপেনএআই শুধু মাইক্রোসফটের ক্লাউড সেবার ওপর নির্ভরশীল নয়। প্রতিষ্ঠানটি অ্যামাজন ওয়েব সার্ভিসেস (এডব্লিউএস) এবং ওরাকলের মতো অন্যান্য প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের ক্লাউড সেবাও ব্যবহার করছে। এ ছাড়া এআই প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রপিকও মাইক্রোসফটের অ্যাজুর প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করছে। ফলে এআই খাতে প্রতিযোগিতা বাড়লেও ক্লাউড সেবা সরবরাহকারী হিসেবে মাইক্রোসফটের অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
মাইক্রোসফট জানিয়েছে, বিদ্যমান চুক্তির আওতায় ভবিষ্যতে পাওয়ার অপেক্ষায় থাকা বাণিজ্যিক আয়ের পরিমাণ বেড়ে ৬৭৭ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। আগের বছরের তুলনায় এ পরিমাণ ৭৩ শতাংশ বেশি। ভবিষ্যতে ক্লাউড ও এআই সেবার চাহিদা আরও বাড়তে পারে—এমন প্রত্যাশা থেকেই প্রতিষ্ঠানটি অবকাঠামো সম্প্রসারণে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করছে।
আলোচ্য প্রান্তিকে মাইক্রোসফটের মূলধনী ব্যয় হয়েছে ৪৫ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার। এক প্রান্তিকে প্রতিষ্ঠানটির ইতিহাসে এটিই সর্বোচ্চ মূলধনী ব্যয়। ডেটা সেন্টার নির্মাণ, সার্ভার, নেটওয়ার্ক অবকাঠামো এবং এআই পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়াতে এ ধরনের বিনিয়োগ করা হচ্ছে।
তবে বিপুল বিনিয়োগের পাশাপাশি এসব অবকাঠামো থেকে পর্যাপ্ত আয় নিশ্চিত করাও প্রতিষ্ঠানটির জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। কারণ ক্লাউড ও এআই সেবার বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অবকাঠামো পরিচালনা ও সম্প্রসারণের ব্যয়ও বাড়ছে।
মাইক্রোসফটের সব ব্যবসায় অবশ্য একই ধরনের প্রবৃদ্ধি দেখা যায়নি। প্রতিষ্ঠানটির ডিভাইস ও ভোক্তাপণ্য বিভাগে আলোচ্য প্রান্তিকে আয় হয়েছে ১৫ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় এ আয় ৩ শতাংশ কমেছে।
এ বিভাগে উইন্ডোজের জন্য কম্পিউটার নির্মাতাদের কাছ থেকে পাওয়া আয় এবং ডিভাইস বিক্রির আয় কমেছে ২২ শতাংশ। ফলে ক্লাউড ও এআই খাতের শক্তিশালী প্রবৃদ্ধির বিপরীতে ডিভাইস ব্যবসায় কিছুটা দুর্বলতা দেখা গেছে।
সব মিলিয়ে মাইক্রোসফটের সর্বশেষ আর্থিক ফলাফল প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসায়িক কৌশলে ক্লাউড কম্পিউটিং ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্রমবর্ধমান গুরুত্ব তুলে ধরেছে। একদিকে এসব সেবার চাহিদা প্রতিষ্ঠানটির আয় ও মুনাফা বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে অবকাঠামো খাতে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করতে হচ্ছে। ফলে আগামী দিনগুলোতে মাইক্রোসফটের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে বিনিয়োগের বিপরীতে পর্যাপ্ত আয় নিশ্চিত করা এবং ক্লাউড ও এআই বাজারে নিজেদের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান ধরে রাখা।
পড়ুন:সৌদিতে ফের ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, ধ্বংসের দাবি সামরিক জোটের
ইমি/


