২০০৭ সালের ঘূর্ণিঝড় সিডর। তখন তাঁর বয়স খুব বেশি নয়। ভয়াবহ সেই দুর্যোগে লণ্ডভণ্ড হয়ে যায় উপকূলের জনপদ। ক্ষতিগ্রস্ত হয় তাঁর পরিবারও। শৈশবের চোখে দেখা সেই ধ্বংসযজ্ঞ, মানুষের অসহায়ত্ব আর ঘুরে দাঁড়ানোর সংগ্রাম গভীরভাবে দাগ কাটে তাঁর মনে। সময়ের সঙ্গে সেই স্মৃতিই হয়ে ওঠে পরিবেশ ও জলবায়ু নিয়ে কাজ করার প্রেরণা। উপকূলের মানুষের দুর্ভোগকে শুধু নিজের এলাকার সমস্যা হিসেবে নয়, বরং বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন তিনি।
বলছি বরগুনার বেতাগী উপজেলার হোসনাবাদ ইউনিয়নের তরুণ মো. খায়রুল ইসলাম মুন্নার কথা। তৃণমূল পর্যায়ে স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজ দিয়ে শুরু হয়েছিল তাঁর পথচলা। প্রায় সাত বছরের প্রচেষ্টায় তরুণদের সংগঠিত করা, নিজস্ব সংগঠন প্রতিষ্ঠা এবং জাতীয় পর্যায়ে জলবায়ু নেতৃত্বে যুক্ত হওয়ার অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন তিনি। এবার সেই অভিজ্ঞতা নিয়ে বাংলাদেশের উপকূলীয় মানুষের সংকট, সম্ভাবনা ও অধিকার আন্তর্জাতিক পরিসরে তুলে ধরার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
আগামী নভেম্বরে তুরস্কে অনুষ্ঠেয় জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলন COP31-এ অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে তাঁর। ইতিমধ্যে সম্মেলনের অফিসিয়াল ব্যাজ ও তুরস্কের ভিসা পেয়েছেন। তাঁর ফ্লাইট নির্ধারিত রয়েছে ২ নভেম্বর। ৮ নভেম্বর থেকে সম্মেলনকেন্দ্রিক কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর।
শৈশবের অভিজ্ঞতা থেকে জলবায়ু আন্দোলন
মুন্নার বাবা মো. সিদ্দিকুর রহমান একজন ব্যবসায়ী এবং মা খাদিজা আক্তার বেবী গৃহিণী। ছোট ভাই আরিফুল ইসলাম মান্নাও শিক্ষার্থী হওয়ার পাশাপাশি স্বেচ্ছাসেবামূলক ও জলবায়ুবিষয়ক কাজের সঙ্গে যুক্ত।
সিডরের অভিজ্ঞতা মুন্নাকে বুঝিয়েছে, উপকূলের মানুষের সংকট শুধু ঘূর্ণিঝড় কিংবা জলোচ্ছ্বাসে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে জীবিকা, নিরাপদ পানি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পরিবেশ ও ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার প্রশ্ন। কেন বারবার দুর্যোগের ক্ষতি বহন করতে হয় উপকূলের মানুষকে, কেন তাঁদের জীবন-জীবিকা রক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ প্রয়োজন এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়েই সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজে যুক্ত হন তিনি।
তবে একটি উপকূলীয় উপজেলা থেকে কাজ শুরু করে জাতীয় পর্যায়ে নিজের অবস্থান তৈরি করা সহজ ছিল না। তরুণদের সংগঠিত করা, মানুষের আস্থা অর্জন এবং সীমিত সুযোগের মধ্যেও ধারাবাহিকভাবে কাজ চালিয়ে যাওয়াই ছিল তাঁর বড় চ্যালেঞ্জ।
এক হাজারের বেশি তরুণকে নিয়ে সংগঠন
দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক পরিবর্তনে সংগঠিত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে মুন্না প্রতিষ্ঠা করেন গ্রিন পিস ইয়ুথ ডেভেলপমেন্ট সোসাইটি (GPYDS)। বর্তমানে তিনি সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক।
জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, পরিবেশ সুরক্ষা, যুব নেতৃত্বের বিকাশ এবং শিশু, কিশোরী ও নারীদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় কাজ করছে সংগঠনটি। বরগুনাকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া এ উদ্যোগ এখন বরিশাল বিভাগের বিভিন্ন জেলা ও ঢাকায় কার্যক্রম পরিচালনা করছে। সংগঠনটির সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন এক হাজারের বেশি তরুণ স্বেচ্ছাসেবক।
জলবায়ু ও পরিবেশের পাশাপাশি নিরাপদ পানি, কিশোরী ও নারীদের স্বাস্থ্য, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ এবং সামাজিক উন্নয়নেও কাজ করছে GPYDS। মুন্নার কাছে সংগঠনটি কেবল একটি প্রতিষ্ঠান নয়; বরং উপকূলের তরুণদের নিজেদের এলাকার সমস্যা চিহ্নিত করা এবং সমাধানে নেতৃত্ব দেওয়ার একটি প্ল্যাটফর্ম।
জাতীয় পর্যায়ে জলবায়ু নেতৃত্ব
তৃণমূলের অভিজ্ঞতাকে জাতীয় পর্যায়ের আলোচনার সঙ্গে যুক্ত করতে বিভিন্ন যুব ও জলবায়ুবিষয়ক উদ্যোগে যুক্ত হয়েছেন মুন্না। ২০২৬ সালে তিনি LCOY Bangladesh-এর যোগাযোগ ও গণমাধ্যমবিষয়ক নেতৃত্বের দায়িত্ব পালন করছেন। পাশাপাশি ভলান্টিয়ার ফর বাংলাদেশ বরিশাল বিভাগের সভাপতি এবং প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের ইয়ুথ অ্যাডভাইজরি প্যানেলের সদস্য ও কান্ট্রি ম্যানেজমেন্ট টিমে যুব প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
এসব দায়িত্বের মধ্য দিয়ে তরুণদের মতামত, যোগাযোগ ও জলবায়ুবিষয়ক নীতিনির্ধারণী আলোচনায় যুক্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে তাঁর। সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়নের শিক্ষার্থী হিসেবেও জলবায়ু সংকটের তথ্য ও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা মানুষের কাছে তুলে ধরতে আগ্রহী তিনি।
COP31-এ উপকূলের দাবি তুলে ধরার প্রত্যাশা
তুরস্কে অনুষ্ঠেয় COP31 সম্মেলনে জলবায়ু অভিযোজন (Adaptation) এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলা (Loss and Damage) বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দিতে চান মুন্না। উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর ঝুঁকি, স্থানীয় পর্যায়ে অভিযোজনের বাস্তবতা এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য কার্যকর সহায়তার প্রয়োজনীয়তা আন্তর্জাতিক আলোচনায় তুলে ধরতে চান তিনি।
একই সঙ্গে বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময়, বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকার অভিজ্ঞতা তুলে ধরা এবং গণমাধ্যমের মাধ্যমে উপকূলের মানুষের জীবনসংগ্রাম বিশ্বপরিসরে পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর।
মুন্নার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কেন্দ্রেও রয়েছে উপকূলের মানুষ। GPYDS-এর কার্যক্রম বিস্তৃত করা, তরুণদের জলবায়ুবিষয়ক দক্ষতা বৃদ্ধি এবং স্থানীয় মানুষের দাবি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের নীতিনির্ধারণী আলোচনায় যুক্ত করতে চান তিনি।
সিডরের ক্ষত আর শৈশবের স্মৃতি থেকে যে পথচলার শুরু, তা এখন পৌঁছেছে আন্তর্জাতিক জলবায়ু সম্মেলনের দুয়ারে। মুন্নার কাছে COP31 কেবল একটি সম্মেলনে অংশগ্রহণ নয়; বরং যে উপকূল তাঁকে জলবায়ু সংকটের বাস্তবতা চিনিয়েছে, সেই উপকূলের মানুষের কথা বিশ্বমঞ্চে পৌঁছে দেওয়ার নতুন সুযোগ।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন), বেতাগী উপজেলা সভাপতি, সাইদুল ইসলাম মন্টু বলেন, উপকূলীয় এলাকার একজন তরুণ হিসেবে জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে তাঁর কাজ এবং আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি এলাকার জন্য একটি সৌভাগ্যের ব্যাপার “মুন্না আমাদের এলাকার ছেলে। ছোটবেলা থেকেই উপকূলের নানা সমস্যা সে দেখেছে। এখন সেই এলাকার মানুষের কথা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলে ধরার সুযোগ পাচ্ছে। আমরা চাই, সে যেন বিশ্বমঞ্চে বরগুনাসহ পুরো উপকূলের মানুষের দুর্ভোগ ও প্রত্যাশার কথা তুলে ধরতে পারে।
পড়ুন : নোয়াখালীতে বর্ণাঢ্য আয়োজনে জাতীয় যুব দিবস উদযাপন


