রাশিয়ার পারমাণবিক হামলার ‘ভুয়া বার্তায়’ আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে ইউক্রেনজুড়ে। দেশটির বহুল ব্যবহৃত ‘এয়ার অ্যালার্ট’ অ্যাপে পরপর কয়েকটি সতর্কবার্তা পাঠানো হয়। এতে রাশিয়ার ওরেশনিক ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে পারমাণবিক হামলার আশঙ্কার কথা জানানো হয়। শুধু ইউক্রেন নয়, একই সময়ে রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ মোবাইল অ্যাপেও পারমাণবিক হামলার ভুয়া সতর্কবার্তা পাঠানোর ঘটনা ঘটেছে। দুই দেশই এ ঘটনাকে সাইবার হামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে জানিয়েছে। খবর দ্য টেলিগ্রাফের।
ঘটনাটি ঘটে রোববার (১ নভেম্বর) রাতে। স্থানীয় সময় রাত ১০টা ৪৮ মিনিটে ইউক্রেনের ‘এয়ার অ্যালার্ট’ অ্যাপে পরপর চারটি বার্তা প্রকাশ করা হয়। এসব বার্তায় দেশজুড়ে পারমাণবিক হামলার ঝুঁকি রয়েছে বলে সতর্ক করা হয়। একই সঙ্গে তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কার কথাও জানানো হয়। ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়।
অ্যাপটিতে রুশ ভাষায় প্রকাশিত একটি বার্তায় বলা হয়, ‘চিন্তার কিছু নেই, মাথার ওপর একটি ওরেশনিক উড়ছে। সমগ্র ইউক্রেনজুড়ে পারমাণবিক সতর্কবার্তা চালু করা হয়েছে।’ বার্তাটির ভাষা ও বিষয়বস্তু নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়। কারণ, ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রাশিয়ার ওরেশনিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের বিষয়টি আগে থেকেই নিরাপত্তা আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এর আগে অ্যাপটিতে তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা জানিয়ে আরেকটি সতর্কবার্তা দেওয়া হয়। এতে ইউক্রেনের বাসিন্দাদের ঘরের ভেতরে অবস্থান করতে বলা হয়। পাশাপাশি গ্যাস মাস্ক ব্যবহার এবং আয়োডিন গ্রহণের পরামর্শও দেওয়া হয়। এ ছাড়া রাসায়নিক হামলা ও সরাসরি যুদ্ধের সতর্কবার্তাও প্রচার করা হয়। এসব বার্তায় বাসিন্দাদের দ্রুত নিকটস্থ আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার এবং কাপড় দিয়ে মুখ ঢেকে রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়।
তবে সতর্কবার্তাগুলো প্রচারের প্রায় ১০ মিনিটের মধ্যেই ইউক্রেনের বিমানবাহিনী জানায়, অ্যাপটি সম্ভবত শত্রুপক্ষের সাইবার হামলার শিকার হয়েছে। এ বিষয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম টেলিগ্রামে দেওয়া এক পোস্টে নাগরিকদের আতঙ্কিত না হওয়ার আহ্বান জানায় সংস্থাটি।
বিমানবাহিনীর বার্তায় বলা হয়, তাদের ‘এয়ার অ্যালার্ট’ অ্যাপে শত্রুপক্ষের অনুপ্রবেশ ঘটেছে বলে মনে হচ্ছে। তবে কোনো তেজস্ক্রিয়তার হুমকি নেই। সবাইকে শান্ত থাকার পাশাপাশি সরকারি ও নির্ভরযোগ্য যোগাযোগমাধ্যমের তথ্য অনুসরণ করার পরামর্শ দেওয়া হয়।
এদিকে ইউক্রেনের এই ঘটনার কয়েক ঘণ্টা পর রাশিয়ার জরুরি পরিস্থিতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় জানায়, তাদের অভ্যন্তরীণ মোবাইল অ্যাপেও ভয়াবহ সাইবার হামলা হয়েছে। এর ফলে রুশ নাগরিকদের কাছেও ভুল করে পারমাণবিক হামলার সতর্কবার্তা পাঠানো হয়েছে।
রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা তাসের প্রতিবেদনে বলা হয়, ক্ষতিগ্রস্ত অ্যাপটি পুনরায় সচল করতে কাজ করছে দেশটির জরুরি পরিস্থিতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়। তবে সাইবার হামলার পেছনে কারা জড়িত, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
বিশেষজ্ঞদের কাছে এ ধরনের ঘটনা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। কারণ, ইউক্রেনে বিমান হামলার তাৎক্ষণিক সতর্কতা জানানোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হচ্ছে ‘এয়ার অ্যালার্ট’ অ্যাপ। রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র বা ব্যালিস্টিক হামলার ক্ষেত্রে নাগরিকদের নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার জন্য অনেক সময় মাত্র কয়েক মিনিট সময় থাকে। ফলে অ্যাপের মাধ্যমে ভুল সতর্কবার্তা প্রচার হলে সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক বিভ্রান্তি ও আতঙ্ক তৈরি হতে পারে।
এ ঘটনায় বার্তার ভাষাও বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে। ইউক্রেনের আইন অনুযায়ী, সরকারি যোগাযোগের ক্ষেত্রে ইউক্রেনীয় ভাষা ব্যবহার বাধ্যতামূলক। কিন্তু হামলার সতর্কবার্তাগুলো রুশ ভাষায় প্রচারিত হওয়ায় এর পেছনে রাশিয়ার সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো পক্ষের জড়িত থাকার বিষয়টি নিশ্চিত হয়নি।
অ্যাপ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান অ্যাজাক্স সিস্টেমসের তথ্যমতে, ‘এয়ার অ্যালার্ট’ অ্যাপটির দৈনিক ব্যবহারকারী প্রায় ৭০ লাখ। এ ছাড়া এটি এখন পর্যন্ত ৪ কোটি ৬০ লাখের বেশি বার ডাউনলোড করা হয়েছে।
সব মিলিয়ে দুই দেশের গুরুত্বপূর্ণ সরকারি অ্যাপে একই ধরনের পারমাণবিক হামলার ভুয়া সতর্কবার্তা প্রচারের ঘটনা নতুন করে সাইবার নিরাপত্তার ঝুঁকি সামনে এনেছে। বিশেষ করে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের মতো উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতিতে এ ধরনের ঘটনা সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়ানোর পাশাপাশি জরুরি সতর্কবার্তার ওপর আস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
পড়ুন:শক্তি বাড়িয়ে প্রবল ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হয়েছে ‘মুরাসু’, সর্বশেষ যা জানা গেল
ইমি/


