পাওনা টাকা ফেরত চাওয়ায় মিথ্যা মামলায় হয়রানির শিকার পল্লী চিকিৎসক

ঢাকার ধামরাই উপজেলার দ্বীমুখা এলাকায় পাওনা টাকা ফেরত চাওয়াতে মিথ্যা মামলায় হয়রানির শিকার হয়েছেন এক পল্লী চিকিৎসক সামছুল হক।
মামলার তদন্তে ভুল ও মিথ্যা প্রতিবেদন দাখিল করারও অভিযোগ উঠেছে এক পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। মামলার বাদী মোঃ শফিকুল ইসলাম রাজু (২৬) প্রভাব খাটিয়ে ও মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তাকে মোটা অংকের টাকা ঘুষ দিয়ে মামলার তদন্তকে ভিন্ন খাতে নেয়ার অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী ওই পল্লী চিকিৎসক।

বিজ্ঞাপন

স্থানীয় সূত্র ও অভিযোগে জানা যায়, প্রায় দুই বছর পূর্বে ২০২৪ সালে পল্লী চিকিৎসক সামছুল হক স্থানীয় রাজু নামের এক যুবকের কাছে পাওনা টাকা চাইতে গেলে তাদের মধ্যে বিরোধের সৃষ্টি হয়। দীর্ঘদিন ধরে এই বিরোধ চলে আসলেও টাকা না পাওয়াতে এক পর্যায়ে ক্ষুব্ধ হয়ে ওই পল্লী চিকিৎসক সামছুল হক রাজুর ডেকোরেটরের দোকানের তালা ভেঙে কিছু মালামাল জোরপূর্বক বের করে নিয়ে যায়। তবে আশপাশের দোকানদার ও বাজারের লোকজনের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি শান্ত হলে সামছুল হক রাজুর ভাইয়ের উপস্তিতিতে সব মালামাল আবার দোকানে ফিরিয়ে দেন। তবে রাজুর দাবি, দোকানের সব মালামাল ফেরত দেয়া হয়নি। এ ঘটনায় তিনি পল্লী চিকিৎসক শামছুল হক ও তার দুই ছেলেসহ মোট ৫ জনের বিরুদ্ধে দোকানে ডাকাতির অভিযোগ এনে বিজ্ঞ সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আমলী আদালত ধামরাই এ একটি মামলা দায়ের করেন। সি. আর. মামলা নং- ৪৯৭/২০২৪।

সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, মামলাটির তদন্তভার পান তৎকালীন ধামরাইয়ের কাওয়ালীপাড়া পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ ইন্দ্রজিৎ। পরবর্তীতে তিনি বদলী হওয়াতে মামলাটির তদন্তের দ্বায়িত্ব পান পুলিশ পরিদর্শক মো: নূরে আলম সিদ্দিকী। নূরে আলম সিদ্দিকী বর্তমানে কেরানিগঞ্জ মডেল থানায় তদন্ত ওসি হিসেবে কর্মরত আছেন। এ মামলায় বাদীর মনোনীত মোট ৯জন স্বাক্ষীর সাথে কথা বলে জানা যায় তাদের বেশিরভাগই জানেন না যে তাদের এই মামলায় স্বাক্ষী করা হয়েছে।

পুলিশ পরিদর্শক মো: নূরে আলম সিদ্দিকী তার তদন্ত প্রতিবেদনে মামলার ৮ নাম্বার স্বাক্ষী সুজন (২৫) মিয়ার জবানবন্দি হিসেবে লিখেছেন, সুজন মিয়ার দোকান বাদী রাজুর দোকানের সাথেই। ঘটনার দিন ১১টার দিকে সুজন মিয়া তার দোকানে থাকা অবস্থায় সামছুল হক ও তার দুই ছেলে রাজুর ডেকোরেটরের দোকানের তালা ভেঙে দোকান থেকে মালামাল ভ্যানে করে নিয়ে যায়। এসময় সুজন, বিপুল ও জুলহাস নামে দুজনকে নিয়ে সামছুল কে নিষেধ করলে তারা মালামাল নেয়া বাদ দেয়। এর পরে সুজন মিয়া রাজুকে তার মোবাইলে ফোন করে বিষয়টি জানায়।

তবে এই ঘটনায় সুজন মিয়া আইনজীবীর মাধ্যমে একটি হলফনামা করেন। তার স্বাক্ষরিত হলফনামায় দেখা যায়, সুজন মিয়া এই বিষয় কিছুই অবগত না। এবং ঘটনার দিন সুজন তার দোকানে উপস্থিত ছিলেন না। এছাড়াও তাকে স্বাক্ষী করে যে জবানবন্দি দেখানো হয়েছে তা সম্পূর্ণ মিথ্যা বানোয়াট বলে দাবি করেছেন সুজন।

স্থানীয় মামুন মেম্বার নামের একজন কে ৭ নাম্বার স্বাক্ষী হিসেবে পুলিশের তদন্ত প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে। এবিষয়ে ৭ নাম্বার স্বাক্ষী মামুন মেম্বারের সাথে কথা বলললে তিনি জানান, এই মামলায় যে আমাকে স্বাক্ষী মানা হয়েছে আমি জানিই না। আপনাদের কাছ থেকে এই মাত্র জানলাম যে আমি এই মামলার স্বাক্ষী। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, একজন পুলিশ কর্মকর্তার এমন করাটা মোটেও ঠিক হয়নি। আমি জনপ্রতিনিধি ছিলাম। আমাকে না জানিয়েই তিনি স্বাক্ষী বানালেন এটা মোটেও ঠিক করেননি।

মামলার ২ নাম্বার স্বাক্ষী জানান, আমি ঘটনা স্থলে ছিলাম না। আমি বিস্তারিত কিছু জানতামও না তখন। ওই পুলিশ আমাকে ধরে নিয়ে গেছে পরে বলে যে আপনাকে স্বাক্ষী মানলাম। এছাড়াও প্রায় স্বাক্ষীই একইরকম বক্তব্য জানিয়েছেন।

মামলায় নিরপেক্ষ স্বাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেখিয়েছেন বাদীর দোকানের পাশের দোকানের মালিক মো আশিকুর রহমান ওরফে বিপুল। তিনি বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের দুইদিন পরেই হবে আমি দোকানে বসে আছি। তখন সামছুল কাকা আইসা দেখি রাজুর দোকানের তালা ভাঙার চেষ্টা করতেছে। প্রথমে আমি কিছু না বললেও পরে কাছে গিয়ে তাকে বুঝিয়ে বলি যে, কাকা আমরা শুনছি আপনি রাজুর কাছে টাকা পাবেন ৩৬ লাখ। আর এই দোকানে মাল আছে মাত্র ২ লাখ টাকার। আপনার সব টাকা তো উঠবেই না উল্টো আপনি আরো ১ কোটি টাকার মামলা খাবেন। আমার কথা না শুনেই এক ভ্যান মাল সে নিয়ে যায়। পরে রাজুর এক ভাই আসে সে আমি বোঝানোর পর সামছুল কাকা মালামাল সব ফেরত দিয়ে রাজুর ভাই কে বুঝিয়ে দিয়ে যায় সব। পরে একাধিক তালা মারা হয় দোকানে। চাবি আমাদের কাছেই দিয়ে যায়। পরে রাজু চাবি নিয়ে তার মালামাল এখান থেকে সরিয়ে নিয়ে যায়।

তিনি আরো বলেন, মালামাল নিয়ে গেছিলো এটা ঠিক কিন্তু আবার সব মালামাল রাজুর ভাইয়ের কাছে বুঝিয়ে দিয়ে গেছে এটা পুলিশের তদন্তে লিখে নাই। পুলিশ কে আমি বারবার বলেছি এই কথা। তার পর সে যা লিখেছিলো সেটা সঠিক না থাকায় আমি কয়েকবার লেখা পরিবর্তন করিয়েছি। এবং যেটা বললাম সেটা লেখার পর আমি স্বাক্ষর করেছিলাম। কিন্তু এখন তো দেখি অন্যরকম প্রতিবেদন দেয়া হয়েছে যা সঠিক না।

ভুক্তভোগী পল্লী চিকিৎস মো. শামসুল হক অভিযোগ করে বলেন, তদন্ত কর্মকর্তা এসআই নূরে আলম প্রকৃত ঘটনা আড়াল করে ভুল ও মিথ্যা প্রতিবেদন আদালতে জমা দিয়েছেন। যে কারণে আমি ও আমার দুই ছেলের নামে ওয়ারেন্ট হয়। তার দাবি, প্রতিবেদনে কোথাও উল্লেখ করা হয়নি যে স্থানীয়দের মধ্যস্থতায় দোকানের মালামাল ফেরত দেয়া হয়েছিল। এছাড়া মামলার তদন্তে যাদের সাক্ষী হিসেবে দেখানো হয়েছে, তাদের কয়েকজন অভিযোগ করেছেন যে, তারা জানেনই না যে এ মামলায় তাদের সাক্ষী করা হয়েছে। আবার এক সাক্ষী অভিযোগ করে তিনি যে বক্তব্য দিয়ে কাগজে স্বাক্ষর করেছিলেন, তদন্ত প্রতিবেদনে তা সম্পূর্ণ উপস্থাপন করা হয় নাই।

পল্লী চিকিৎসক শামছুল হক আরও বলেন, রাজু অর্থের বিনিময়ে পুলিশকে প্রভাবিত করে নিজের পক্ষে তদন্ত প্রতিবেদন করিয়েছেন। আমি ওই পুলিশের বিরুদ্ধে ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তার কাছে অভিযোগ করলেও তার কোন প্রতিকার পাইনি। আমি কোর্ট থেকে এই মামলায় জামিন হয়ে ‘রিকল’ এর কাগজ থানায় জমা দিয়ে আসার পরও পুলিশ সিভিলে রাত বারোটায় আমার বাসায় গিয়ে তল্লাশি ও আমাকে খোঁজা খুঁজি করে। আমি চিকিৎসার কাজে বাইরে থাকায় আমার স্ত্রীর কাছ থেকে ৫০০০ টাকা নেয় এবং আমাকে থানায় দেখা করতে বলে যায়। পরদিন আমি থানায় গিয়ে পূনরায় জামিনের কাগজ দেখিয়ে আসি। কিন্তু এর আট মাস পরে আবার তিনজন পুলিশ সদস্য সিভিলে আমার বাসায় আসে। আবারো পুনরায় সেই ওয়ারেন্টের রিকলের কাগজ দেখতে চান। এ বিষয়ে আমার সাথে পুলিশ সদস্যদের বাকবিতন্ডা হয়। কিন্তু পুলিশ কোন কথা না শুনে, আমাকে কোন সুযোগ না দিয়ে থানায় ধরে নিয়ে যায় এবং টাকা দাবি করে। টাকা না দিতে পারায় পুলিশের কাজে বাধা দেওয়ার আরেকটি নতুন মামলায় আমাকে ও আমার ছেলে আমিনুলকে চালান করে দেয়। আমি দশ দিন ও আমার ছেলে একমাস বিশ দিন জেল খেটে জামিনে আসি। পরবর্তীতে সেই পুলিশদের বিরুদ্ধে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে অভিযোগ করলেও এখন পর্যন্ত আমি কোন বিচার পাইনি। পরবর্তীতে মামলাটি আদালত পর্যন্ত গড়ালে আদালত থেকে মিথ্যা প্রমাণিত হওয়ার পরে খারিজ হয়ে যায়।

এঘটনায় মামলার বাদী মোঃ শফিকুল ইসলাম রাজু বলেন, এমন অভিযোগ সবই মিথ্যা। আমার দোকান থেকে যে মালামাল নিয়ে গেছিলো তার অর্ধেক মালও ফেরত দেয় নাই। আর পুলিশ এসে সরজমিনে যা পেয়েছে, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য অনুযায়ী মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দিয়েছ।

এব্যাপারে অভিযুক্ত সাব-ইন্সপেক্টর মো: নূরে আলম সিদ্দিকী বলেন, এর আগে এ মামলার আয়ু ছিলেন ফাঁরির ইনচার্জ ইন্দ্রজিৎ স্যার, সে বদলি হয়ে যাওয়ার সময় আমাকে দায়ীত্ব
দিয়ে যায়। ঘুষ নিয়ে মিথ্যা কোন সাক্ষী দেয়া হয়নি। আপনারা (বাদী) রাজু’র সাথে দেখা করিয়েন আমি বলে দিচ্ছি।

এবিষয়ে ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার শামীমা পারভিন বলেন, আমি নতুন এসেছি, ধামরাই থানার ওছিকে বলে দিচ্ছি এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে। অভিযোগের বিষয়টা তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

স্থানীয়দের দাবি, ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত হলে প্রকৃত তথ্য বেরিয়ে আসবে। এ ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় সচেতন মহল অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।

পড়ুন : ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধ, ১০ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন

সা/

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন