কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির দ্রুত প্রসারের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ডেটা সেন্টারের বিদ্যুৎ চাহিদা। এতে বিশ্বজুড়ে বিদ্যুৎ সরবরাহব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে ইউরোপে ২০৩০ সালের মধ্যে ডেটা সেন্টারের বিদ্যুৎ চাহিদা ১৬০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। ফলে এআই প্রযুক্তির সম্ভাব্য সুফলের পাশাপাশি এর পরিবেশগত প্রভাব নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে।
জার্মানিভিত্তিক পরিবেশবাদী সংগঠন বিয়ন্ড ফসিল ফুয়েলস (বিএফএফ) বলছে, এআইকে জলবায়ু সংকট মোকাবিলার কার্যকর সমাধান হিসেবে তুলে ধরার আগে প্রযুক্তিটির বিদ্যুৎ ব্যবহার, কার্বন নিঃসরণ এবং পরিবেশগত ক্ষতির বিষয়গুলো বিবেচনায় নিতে হবে। তাদের মতে, ডেটা সেন্টারের অনিয়ন্ত্রিত সম্প্রসারণ জলবায়ু কার্যক্রম ও বিভিন্ন খাতের বিদ্যুতায়নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
বিএফএফের তথ্য অনুযায়ী, এআইয়ের জলবায়ু উপকারিতা নিয়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ৭৩ শতাংশ দাবির পক্ষে পর্যাপ্ত প্রমাণ নেই। চলতি বছরের শুরুর দিকে কয়েকটি পরিবেশবাদী সংগঠনের উদ্যোগে প্রকাশিত এক গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে। গবেষণায় গুগল, মাইক্রোসফট ও আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থাসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার ১৭২টি বক্তব্য বিশ্লেষণ করা হয়।
এসব বক্তব্যে দাবি করা হয়েছিল, জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় এআই সামগ্রিকভাবে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। তবে গবেষণায় দেখা গেছে, মাত্র ২৭ শতাংশ দাবির সঙ্গে প্রকাশিত একাডেমিক গবেষণার সূত্র দেওয়া হয়েছিল। অন্যদিকে ৩৭ শতাংশ দাবির পক্ষে কোনো প্রমাণই উল্লেখ করা হয়নি।
গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, চ্যাটজিপিটি, জেমিনি ও কোপাইলটের মতো ভোক্তাপর্যায়ের জেনারেটিভ এআই ব্যবহারের মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য ও যাচাইযোগ্য মাত্রায় কার্বন নিঃসরণ কমানোর কোনো উদাহরণ পাওয়া যায়নি। বিএফএফের মতে, এআইয়ের সম্ভাব্য সুবিধার কথা প্রচার করা হলেও এর জন্য প্রয়োজনীয় বিপুল বিদ্যুৎ ও অন্যান্য পরিবেশগত ব্যয়ের বিষয়টি যথেষ্ট গুরুত্ব পাচ্ছে না।
বিএফএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ইউরোপে ২০৩০ সালের মধ্যে ডেটা সেন্টারের বিদ্যুৎ চাহিদা সর্বোচ্চ ১৬০ শতাংশ বাড়তে পারে। তখন এ খাতে বিদ্যুৎ ব্যবহারের পরিমাণ দাঁড়াতে পারে বছরে ২৮৭ টেরাওয়াট-ঘণ্টা। বিদ্যুতের এ পরিমাণ ২০২২ সালে স্পেনের মোট বিদ্যুৎ ব্যবহারের চেয়েও বেশি।
সংগঠনটির আশঙ্কা, ডেটা সেন্টারের বাড়তি বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণে জীবাশ্ম গ্যাসের ওপর নির্ভরতা বাড়লে জলবায়ুর ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। তাদের হিসাব অনুযায়ী, ইউরোপীয় ইউনিয়নে নতুন যুক্ত হওয়া ডেটা সেন্টারগুলোর বার্ষিক কার্বন নিঃসরণ ২০৩০ সালে ৩ কোটি ৯০ লাখ টনে পৌঁছাতে পারে। এই পরিমাণ লিথুয়ানিয়া ও এস্তোনিয়ার ২০২২ সালের সম্মিলিত বার্ষিক কার্বন নিঃসরণের চেয়েও বেশি।
বিএফএফ মনে করে, ডেটা সেন্টারের বিদ্যুৎ চাহিদা নবায়নযোগ্য জ্বালানির মাধ্যমে পূরণ করা জরুরি। তবে নতুন ডেটা সেন্টারগুলো যদি অন্য খাতের জন্য নির্ধারিত নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ ব্যবহার করে, তাহলে পরিবহন, শিল্প ও ভবন খাতের বিদ্যুতায়ন বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
ডেটা সেন্টারের সম্প্রসারণ শুধু পরিবেশের ওপর নয়, সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ের ওপরও প্রভাব ফেলছে। এ ক্ষেত্রে আয়ারল্যান্ডের উদাহরণ দিয়েছে বিএফএফ। সংগঠনটির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৫ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ডেটা সেন্টারের দ্রুত সম্প্রসারণের কারণে দেশটির অর্থনীতি থেকে ৭১৫ মিলিয়ন ইউরো ব্যয় হয়েছে।
বর্তমানে আয়ারল্যান্ডের মোট বিদ্যুতের ২২ শতাংশের বেশি ব্যবহার করে ডেটা সেন্টারগুলো। বিএফএফের দাবি, ২০২১ থেকে ২০২৩ সালের জ্বালানি সংকটের সময় দেশটির দরিদ্র পরিবারগুলো অতিরিক্ত ২০৯ ইউরো বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করেছে।
সংগঠনটির বিশ্লেষণ বলছে, ডেটা সেন্টারের বিদ্যুৎ চাহিদা সীমিত রাখা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো গেলে ২০২৫ থেকে ২০৩৪ সালের মধ্যে আয়ারল্যান্ডের পরিবারগুলো আনুমানিক ৪৩৫ ইউরো সাশ্রয় করতে পারে। ভবিষ্যতে আরেকটি বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট দেখা দিলেও এ সাশ্রয় সম্ভব বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিএফএফ পরিবহন, ভবন ও শিল্প খাতের বিদ্যুতায়নকে ডেটা সেন্টারের তুলনায় বেশি অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। সংগঠনটির মতে, ডেটা সেন্টারের ক্রমবর্ধমান চাহিদা বিদ্যুৎ গ্রিডের ওপর চাপ তৈরি করছে। এতে গুরুত্বপূর্ণ শিল্প ও পরিবহন খাতের বিদ্যুতায়ন বিলম্বিত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
ইউরোপের পাঁচটি দেশে পরিচালিত এক জনমত জরিপের তথ্য অনুযায়ী, অংশগ্রহণকারীদের ৭৬ শতাংশ মনে করেন, নতুন ডেটা সেন্টার শুধু নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে পরিচালিত হলেই নির্মাণের অনুমতি দেওয়া উচিত। আর ৭৩ শতাংশ মনে করেন, বিভিন্ন খাতে বিদ্যুৎ বণ্টনের বিষয়ে সরকারের সুস্পষ্ট নীতিমালা থাকা প্রয়োজন।
এ পরিস্থিতিতে নতুন এআই অবকাঠামোর জন্য জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার বন্ধ, অতিরিক্ত নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং প্রতিটি ডেটা সেন্টারের বিদ্যুৎ ও পানির ব্যবহার প্রকাশের দাবি জানিয়েছে বিএফএফ। পাশাপাশি বিদ্যুৎ সংকটের সময় সাধারণ মানুষ ও গুরুত্বপূর্ণ সেবামূলক খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।
বিএফএফের মতে, এআইকে জলবায়ু সংকট মোকাবিলার কার্যকর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে হলে শুধু ইতিবাচক প্রতিশ্রুতি যথেষ্ট নয়। এ জন্য ডেটা সেন্টারের সম্প্রসারণ, বিদ্যুৎ ব্যবহার ও পরিবেশগত প্রভাব নিয়ন্ত্রণে বাধ্যতামূলক নীতিমালা প্রয়োজন। অন্যথায় জলবায়ু সুরক্ষায় এআইয়ের সম্ভাব্য অবদানের চেয়ে এর জ্বালানি ব্যবহার ও কার্বন নিঃসরণের নেতিবাচক প্রভাব বড় হয়ে উঠতে পারে।
পড়ুন:শক্তি বাড়িয়ে প্রবল ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হয়েছে ‘মুরাসু’, সর্বশেষ যা জানা গেল
ইমি/


