রাজশাহী বিভাগের ৮টি জেলা সদর হাসপাতাল ও ৬৭টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে দালাল ও ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিমুক্ত করতে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন রাজশাহী বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) ডা. মো. হাবিবুর রহমান। দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে তিনি যেভাবে মাঠে নেমে কাজ করছেন, তাতে পুরো রাজশাহী বিভাগের স্বাস্থ্যসেবার চিত্রই পাল্টে যেতে শুরু করেছে। তিনি এসি রুমে বসে নির্দেশ দেওয়ার কর্মকর্তা নন। তিনি একজন মাঠের যোদ্ধা।
প্রতি মাসে তিনি নিজে ছুটে যাচ্ছেন এক জেলা থেকে আরেক জেলা, এক উপজেলা থেকে আরেক উপজেলায়। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত হাসপাতালের জরুরি বিভাগ, বহির্বিভাগ, ওয়ার্ড, অপারেশন থিয়েটার, ওষুধের ভান্ডার ঘুরে ঘুরে দেখছেন। কোথায় সমস্যা, কোথায় রোগীরা ভোগান্তিতে পড়ছে, তা নিজ চোখে দেখে তাৎক্ষণিক সমাধান দিচ্ছেন।
তার সবচেয়ে বড় এবং সবচেয়ে প্রশংসিত উদ্যোগ হলো হাসপাতালগুলোকে দালালমুক্ত করা। তিনি স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন, সরকারি হাসপাতাল চত্বরে কোনো দালালের ঠাঁই হবে না এবং অফিস সময়ে কোনো ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধি ভেতরে প্রবেশ করতে পারবে না। তার এই কঠোর ও সাহসী নির্দেশের পর এখন রাজশাহী, নাটোর, পাবনা, সিরাজগঞ্জ, বগুড়া, জয়পুরহাট, নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার প্রায় সকল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স দালালমুক্ত। বিশেষ করে রাজশাহী জেলার পবা, দুর্গাপুর, মোহনপুর, চারঘাট, পুঠিয়া, বাঘা, গোদাগাড়ী, তানোর ও বাগমারা এখন মডেল হিসেবে পরিণত হয়েছে। সাধারণ গরিব মানুষ এখন নির্ভয়ে, কোনো হয়রানি ও অতিরিক্ত টাকা ছাড়াই সেবা নিতে পারছেন।
শুধু দালাল তাড়ানোই নয়, তিনি হাসপাতালের সার্বিক পরিবেশ বদলে দিয়েছেন, যা দীর্ঘদিনের জঞ্জাল দূর করেছে, ১. প্রতিটি হাসপাতালে সিসি ক্যামেরা মনিটরিং ও রোস্টার অনুযায়ী চিকিৎসকের উপস্থিতি জোরদার করা হয়েছে। এখন সকাল ৮টার মধ্যে সকল চিকিৎসক হাসপাতালে উপস্থিত থাকছেন ২. সরকারি ওষুধ যাতে শতভাগ রোগীর হাতে পৌঁছায় তা নিশ্চিত করা হয়েছে। ওষুধ চুরি ও অপচয় বন্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। ৩. হাসপাতালগুলোর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এখন চোখে পড়ার মতো। ওয়ার্ডে দুর্গন্ধ নেই, টয়লেট পরিষ্কার, যা আগে কল্পনাও করা যেত না। ৪. রোগীদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার এবং দ্রুত সেবা নিশ্চিত করতে তিনি নিজে রোগীদের সঙ্গে কথা বলছেন।
এ বিষয়ে রাজশাহী জেলার দুর্গাপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) মেহেদী হাসান সোহাগ বলেন, স্বাস্থ্যের রাজশাহী বিভাগীয় পরিচালক স্যারের অনুপ্রেরণা ও সাহসী নেতৃত্বে আমরা হাসপাতালকে সম্পূর্ণ দালালমুক্ত করতে পেরেছি।
তিনি আমাদের শিখিয়েছেন, রোগীই সবার আগে, রোগীর সন্তুষ্টিই আমাদের সার্থকতা। নাটোর জেলা সিভিল সার্জন ডা. মুহাম্মদ মশিউর রহমান বলেন, স্যারের নির্দেশনা অনুযায়ী আমরা নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছি। সম্প্রতি নাটোর সদর হাসপাতালে জেলা প্রশাসনের সহায়তায় এক দালালকে এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে ১৫ দিনের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এই অভিযান পুরো বিভাগ জুড়ে চলমান থাকবে।
এ প্রসঙ্গে স্বাস্থ্যের রাজশাহী বিভাগীয় পরিচালক ডা. মো. হাবিবুর রহমান বলেন, সরকারি হাসপাতাল হবে গরিব ও অসহায় মানুষের শেষ ভরসার জায়গা। এখানে দালালদের কোনো স্থান নেই। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সবার জন্য স্বাস্থ্য এবং মাননীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর স্মার্ট স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার স্বপ্ন বাস্তবায়নে আমরা নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছি। জনগণের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে এবং সেবার মান বাড়াতে আমাদের অভিযান অব্যাহত থাকবে। একজন সৎ, মানবিক, নির্লোভ ও অত্যন্ত পরিশ্রমী কর্মকর্তা হিসেবে ডা. মো. হাবিবুর রহমানের এই বৈপ্লবিক উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছেন সুশীল সমাজ ও সাধারণ মানুষ। সকলের মতে, তিনি প্রমাণ করে দিয়েছেন সদিচ্ছা ও কঠোর নেতৃত্ব থাকলে সরকারি হাসপাতালেও বিশ্বমানের ও মানসম্মত সেবা দেওয়া সম্ভব।


