দিনের আলোয় যেখানে কোমলমতি শিশুদের কলকাকলি আর বই পড়ার শব্দে মুখর থাকার কথা, রাতের আঁধার নামলেই সেই বিদ্যাপীঠ পরিণত হয় মাদকের অভয়ারণ্যে। যে মানুষটির ওপর বিদ্যালয় পাহারা দেওয়ার দায়িত্ব, খোদ সেই রক্ষকই যখন ভক্ষক হয়ে ওঠেন, তখন শিক্ষার পরিবেশ নিয়ে প্রশ্ন ওঠাটাই স্বাভাবিক। এমনই এক উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে নেত্রকোনার খালিয়াজুরী উপজেলার চাকুয়া ইউনিয়নের লেপসিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে।
বিদ্যালয়টির দপ্তরি কাম নৈশপ্রহরী নৃপেন্দ্র সূত্রধরের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে খোদ স্কুল ভবনের ভেতরেই ইয়াবা সেবন ও মাদক কারবার পরিচালনার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। শুধু একাই নন, রাতের বেলায় বহিরাগত মাদকসেবীদের ডেকে এনে বিদ্যালয়ের ভেতরেই মাদকের আসর বসানোর অভিযোগ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। পবিত্র শিক্ষাঙ্গনে এমন অনৈতিক ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে পুরো এলাকায় তীব্র ক্ষোভ ও অভিভাবকদের মধ্যে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও বিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, চাকরির সুবাদে রাতের বেলা বিদ্যালয়ে অবস্থানের সুযোগকে দীর্ঘদিন ধরেই অপব্যবহার করে আসছিলেন নৃপেন্দ্র সূত্রধর। বিদ্যালয়ের ভেতরে নিয়মিত ইয়াবা সেবনের পাশাপাশি তিনি সেখানে মাদকের খুচরা কারবারও গড়ে তোলেন। এলাকার সচেতন মানুষ বিষয়টি টের পেয়ে তাকে একাধিকবার সতর্ক করলেও তিনি তা কানে তোলেননি।
এমনকি বিদ্যালয়ের অভ্যন্তরেও তার এই কর্মকাণ্ড অজানা ছিল না। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিদ্যালয়ের এক সহকারী শিক্ষক জানান, এর আগে খোদ প্রধান শিক্ষকের টেবিলের ড্রয়ারে ইয়াবা রাখার মতো ধৃষ্টতা দেখিয়েছিলেন নৃপেন্দ্র। সে সময় তাকে মৌখিকভাবে সতর্ক করা হলেও তিনি নিজেকে শোধরাননি; বরং আগের মতোই মাদক সেবন ও কারবার চালিয়ে যান।
দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটে গত ৩১ অক্টোবর রাতে। ওই দিন রাত আনুমানিক ১০টার দিকে বিদ্যালয়ের ভেতরে মাদক সেবনের অভিযোগে স্থানীয় জনতা নৃপেন্দ্র সূত্রধরকে হাতেনাতে আটক করে। উত্তেজিত জনতার রোষানলে পড়ে এ সময় তিনি মারধরেরও শিকার হন।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ও চাকুয়া ইউনিয়ন মাদক নির্মূল কমিটির সভাপতি মো. জামাল মিয়া সেদিনের ঘটনার বিবরণ দিয়ে বলেন, “গত শনিবার (৩১ অক্টোবর) রাত ১০টার দিকে আমাদের মাদক নির্মূল কমিটির সদস্যদের সন্দেহ হলে নৃপেন্দ্রকে জিজ্ঞাসাবাদের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু জিজ্ঞাসাবাদের মুখে তিনি দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করেন। তখন স্থানীয়রা ধাওয়া দিয়ে তাকে আটক করে এবং উত্তেজনার বশে মারধরের ঘটনা ঘটে। পরবর্তীতে তার আত্মীয়স্বজনদের বিশেষ অনুরোধ এবং নৃপেন্দ্র নিজে স্বেচ্ছায় অপরাধ স্বীকার করে মুচলেকা দেওয়ায় তাকে স্বজনদের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হয়।”
তবে নিজের আত্মপক্ষ সমর্থন করে প্রধান শিক্ষকের কাছে ভিন্ন গল্প দাঁড় করিয়েছেন অভিযুক্ত নৃপেন্দ্র। প্রধান শিক্ষক অমিয় ধর জানান, নৃপেন্দ্র তাকে বলেছেন- স্থানীয় কয়েকজনের কাছে পুরোনো একটি মারধরের বিচার চাইতে গিয়ে ফেরার পথে তার পথরোধ করা হয়। ভয়ে তিনি দৌড় দিলে তাকে ধরে মারধর করা হয়েছে।
অন্যদিকে, এসব অভিযোগের বিষয়ে নৃপেন্দ্র সূত্রধরের সরাসরি বক্তব্য জানার জন্য তার মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়।
একটি সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন ধরে এমন গুরুতর অপরাধ চললেও বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে প্রধান শিক্ষকের অফিসকক্ষে ইয়াবা রাখার পূর্ববর্তী অভিযোগ এবং অফিসকক্ষে বসে ইয়াবা সেবনের ছবি বা ভিডিও থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে প্রধান শিক্ষক অমিয় ধর তা কৌশলে এড়িয়ে যান। তিনি বলেন, “বিষয়টি আমার মনে নেই। আর অফিসকক্ষে ইয়াবা সেবনের ছবি বা ভিডিও থাকার বিষয়টিও আমার চোখে পড়েনি।”
এত বড় ঘটনার পরও অভিযুক্ত কর্মচারীর বিরুদ্ধে কেন কোনো দাপ্তরিক বা বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি- এমন প্রশ্নের জবাবে প্রধান শিক্ষক অমিয় ধর বলেন, “তাকে আপাতত বিদ্যালয়ে আসতে নিষেধ করা হয়েছে। তবে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো শোকজ (কারণ দর্শানোর নোটিশ) করা হয়নি। মূলত লজ্জার কারণেই বিষয়টি উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাকে জানানো হয়নি।”
একজন প্রতিষ্ঠান প্রধানের এমন ‘লজ্জা’র কারণে অপরাধী পার পেয়ে যেতে পারে কি না, তা নিয়ে সচেতন মহলে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। তবে বিষয়টি জেনে কড়া হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন খালিয়াজুরী উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) আবু রায়হান। তিনি বলেন, “এটি অত্যন্ত ভয়ানক ও অমার্জনীয় অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড, যা কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কখনোই বরদাশত করা যায় না। আমরা বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। দ্রুত তদন্ত সাপেক্ষে বিস্তারিত জেনে অভিযুক্ত কর্মচারীর বিরুদ্ধে কঠোর ও প্রয়োজনীয় বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
শিশুদের নৈতিক ও মানবিক ভিত্তি গড়ে ওঠার প্রথম সূতিকাগার হলো প্রাথমিক বিদ্যালয়। সেই বিদ্যাপীঠকে মাদকের কালো থাবা থেকে মুক্ত রাখতে কেবল মৌখিক আশ্বাস নয়, বরং দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক আইনি পদক্ষেপ দেখতে চান লেপসিয়া গ্রামের সাধারণ মানুষ ও অভিভাবকরা।
পড়ুন : পূর্বধলায় ভ্রাম্যমাণ আদালতে মদ্যপ অবস্থায় যুবকের সাজা


