ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যতদিন জীবিত আছেন, ততদিন পর্যন্ত দেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির চক্রান্ত অব্যাহত থাকতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার বিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে জানান, এ ধরণের প্রতিটি চেষ্টা সরকার অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে প্রতিহত করবে।
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) সচিবালয়ে সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমের অগ্রগতিবিষয়ক প্রেস ব্রিফিং এবং সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে উপদেষ্টা এসব তথ্য তুলে ধরেন। সংবাদ সম্মেলনে তথ্য অধিদপ্তরের প্রধান তথ্য অফিসার সৈয়দ আবদাল আহমদ উপস্থিত ছিলেন।
ভারতে অবস্থানরত শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে তিনি জানান, পাসপোর্টের নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি এখানে বড় কোনো প্রশ্ন নয়। ভারতের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে এবং এক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সব প্রক্রিয়া ও আনুষ্ঠানিকতা অনুসরণ করা হবে। শেখ হাসিনার দেশে ফেরা কিংবা ট্রাভেল পাস পাওয়ার প্রসঙ্গে উপদেষ্টা বলেন, “তিনি নিজে আসুন অথবা তাকে আমরা ধরে নিয়ে আসি আমাদের চাওয়া তো একই। যদি এটার সঙ্গে মিলে যায়, সরকার সে অনুযায়ী যে কোনো পদক্ষেপ নিতে পারে।” শেখ হাসিনা মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত আসামি হলেও এখনও বাংলাদেশের নাগরিক উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, “তিনি আসার যোগ্য। তিনি যদি আসার সিদ্ধান্ত নেন বা আমাদের যদি তাকে ধরে আনার প্রক্রিয়া করতে হয়, সেটি পাসপোর্টের প্রশ্ন নয়।”
বিরোধী দলকে উদ্দেশ্যহীন দোষারোপের বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, “জনগণের কাছে আমরা যদি কোনো মিথ্যা কথা বলি, এটার কনসিকোয়েন্স আমাদের নিতে হবে। সেই কারণে আমি বলছি, আমরা যে কথাটা বলছি, সেটার ভিত্তি আছে বলেই বলছি। এটা হাসিনার মতো বিরোধী দলকে শুধু দোষারোপ করার জন্য নয়।”
সাম্প্রতিক সময়ে পোশাক শ্রমিকদের আন্দোলন প্রসঙ্গে উপদেষ্টা উল্লেখ করেন, জীবনযাত্রার ব্যয় ও মূল্যস্ফীতির কথা ভেবে সরকার আগেই মজুরি বোর্ড গঠন করেছে। প্রাথমিকভাবে শ্রমিকরা তাদের ন্যায্য দাবি নিয়ে মাঠে নামলেও বর্তমানে কমিশন গঠন হওয়ায় আন্দোলন শেষ হওয়ার কথা ছিল। তবে এই পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে অন্য কোনো পক্ষ সহিংসতা উসকে দিচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে সীমান্তে ওপার থেকে নাশকতার চেষ্টার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, পোশাকশ্রমিকরা মাঠে না নামলে বহিরাগতদের প্রবেশের সুযোগ থাকবে না।
আওয়ামী লীগ সম্পর্কে মন্তব্য করে তিনি জানান, “আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক দল হিসেবে কিছু করতে পারবে, সেটা আমরা বিশ্বাস করি না। কিন্তু যেহেতু তাদের কাছে প্রচুর লুটের টাকা আছে, তারা তা দিয়ে কোথাও কোথাও কোনো না কোনো ফর্মে নাশকতা সৃষ্টির চেষ্টা করতে পারে। সেটার সঙ্গে এটার সংযোগ থাকতে পারে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর যেহেতু বলেছেন তার কাছে নিশ্চয়ই তথ্য আছে। সেটার (আন্দোলনের) সঙ্গে তাদের (আওয়ামী লীগ) লিংক থাকতেই পারে।” তবে এর সাথে ডিসেম্বরের সংযোগ বা শেখ হাসিনার ডিসেম্বরে ফেরার কোনো পরিবেশ তৈরি হচ্ছে বলে সরকার মনে করে না। ১৯৯১ সালের প্রসঙ্গ টেনে তিনি মনে করিয়ে দেন, সেসময় নির্বাচনে হেরে যাওয়ার পর শেখ হাসিনা বলেছিলেন—সরকারকে একদিনও শান্তিতে থাকতে দেবেন না; এখনও তিনি সেই চেষ্টা করবেন।
আন্দোলন দমনে বর্তমান সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরে ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, বাংলাদেশের পুলিশ আর কখনো শেখ হাসিনার শাসনামলের পুলিশের মতো ভূমিকা রাখবে—এমনটা প্রত্যাশিত নয়। তৎকালীন সরকারের মতো বলপ্রয়োগ না করে জনগণের ভোগান্তি কমিয়ে পরিস্থিতি সামাল দিতে চায় বর্তমান সরকার।
পুলিশের গুলি চালানো ও আইনি সীমা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আইনের নিয়মানুযায়ী পরিস্থিতি সাপেক্ষে পুলিশ প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করতে পারে। তবে সেটি আইন ও বিধি মেনে করা অবধারিত ছিল কি না, তা প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে দেখা হবে। এছাড়া বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা তাহসিফ সাউরি হত্যা মামলার প্রসঙ্গে তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের গুজবে কান না দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে নিশ্চিত করেন যে, যেকোনো নাগরিকের মৃত্যুর ঘটনায় নিরপেক্ষ ও প্রকৃত তদন্ত সম্পন্ন করা হবে।
এলপিজির মূল্যবৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি প্রসঙ্গে উপদেষ্টা জানান, দীর্ঘমেয়াদি কল্যাণের কথা ভেবেই এই কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। বর্তমানে দ্বিগুণেরও বেশি দামে (প্রতি ইউনিট ৩০ ডলার) এলএনজি কিনতে হচ্ছে, যার ফলে সরকারের ভর্তুকির সক্ষমতা কমছে। চলতি অর্থবছরে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ৪৮ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকির পরিকল্পনা থাকলেও মাত্র আড়াই মাসেই ২৪ হাজার কোটি টাকা খরচ হয়ে গেছে। তিনি আরও ব্যাখ্যা করেন, এই খাতে অতিরিক্ত ভর্তুকি দিতে গেলে সরকারকে ঋণ নিতে হবে, যা দেশের মুদ্রাস্ফীতি আরও বাড়াবে। তাই সার্বিক বৈশ্বিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়েই দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে।
পড়ুন : রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে পোশাকশিল্পে অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা চলছে : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
সা/


