জনপ্রিয় গ্রাফিক ডিজাইন ও কনটেন্ট তৈরির প্ল্যাটফর্ম ক্যানভা তাদের কর্মী ও সাংগঠনিক কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তন আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির মোট কর্মীর প্রায় ২২ শতাংশ বা ১ হাজার ২৭১টি পদ এ পুনর্গঠনের আওতায় আসছে। গত এক দশকের মধ্যে প্রথমবারের মতো প্রবৃদ্ধির গতি কমে যাওয়ায় প্রতিষ্ঠানটি এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে পুনর্গঠনের আওতায় থাকা সব কর্মীকেই চাকরি হারাতে হচ্ছে না। এর মধ্যে চাকরি থেকে অব্যাহতি, দায়িত্ব পরিবর্তন এবং অন্য কর্মস্থলে স্থানান্তরের বিষয়ও রয়েছে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে দ্রুত প্রবৃদ্ধি অর্জন করে আসা ক্যানভা সম্প্রতি ব্যবসায়িক প্রবৃদ্ধির গতি কমতে দেখেছে। এ পরিস্থিতিতে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালন পদ্ধতি আরও কার্যকর করা এবং কাজের গতি বাড়ানোর লক্ষ্যে সাংগঠনিক কাঠামো পুনর্বিন্যাস করা হচ্ছে। কর্মীদের দায়িত্ব, বিভিন্ন বিভাগের কার্যক্রম এবং ব্যবস্থাপনার স্তরেও পরিবর্তন আনা হবে।
ক্যানভার সহপ্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মেলানি পারকিনস জানিয়েছেন, প্রতিষ্ঠানের কাজের ধরন আরও সহজ, দ্রুত ও কার্যকর করতেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তাঁর মতে, বিভিন্ন বিভাগের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো এবং কাজের ক্ষেত্রে অপ্রয়োজনীয় জটিলতা কমানো এখন গুরুত্বপূর্ণ। এ পরিবর্তনের মাধ্যমে কর্মীরা যেন নিজেদের দায়িত্ব আরও ভালোভাবে বুঝতে পারেন এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে বেশি ভূমিকা রাখতে পারেন, সেটিও নিশ্চিত করতে চায় প্রতিষ্ঠানটি।
পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে পণ্য উন্নয়ন, প্রবৃদ্ধি এবং প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্ম-সংশ্লিষ্ট দলগুলোকে একীভূত করে একটি সমন্বিত পণ্য বিভাগ গঠন করা হবে। বর্তমানে এসব বিভাগ আলাদাভাবে কাজ করায় বিভিন্ন পর্যায়ে কাজ হস্তান্তর ও সমন্বয়ের প্রয়োজন হয়। নতুন কাঠামোয় এসব ধাপ কমিয়ে আনার পরিকল্পনা রয়েছে। এতে পণ্য উন্নয়নের কাজ দ্রুত এগিয়ে নেওয়া এবং বিভিন্ন দলের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানো সম্ভব হবে বলে মনে করছে প্রতিষ্ঠানটি।
এ ছাড়া ব্যবস্থাপনার স্তর কমিয়ে আনা এবং বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পুনর্বণ্টনের পরিকল্পনা করেছে ক্যানভা। প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া আরও দ্রুত করা, কর্মীদের জবাবদিহি বাড়ানো এবং কাজের ক্ষেত্রে স্পষ্ট দায়িত্ব নির্ধারণ এ উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য। প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ কার্যক্রমে দীর্ঘসূত্রতা কমিয়ে কর্মীদের উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর দিকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
কর্মীদের কর্মস্থল নিয়েও পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে ক্যানভা। প্রতিষ্ঠানটি তাদের পণ্য উন্নয়ন দলের প্রধান কর্মস্থল হিসেবে অস্ট্রেলিয়ার সিডনিকে আরও বেশি গুরুত্ব দিতে চায়। এ কারণে কিছু কর্মীকে সিডনিতে স্থানান্তরিত হওয়ার জন্য বলা হবে। এর মাধ্যমে পণ্য উন্নয়ন-সংশ্লিষ্ট কর্মীদের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ ও সমন্বয় বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
পাশাপাশি কর্মীদের অফিসে উপস্থিতির নিয়মেও পরিবর্তন আসছে। আগামী জানুয়ারি থেকে হাইব্রিড পদ্ধতিতে কাজ করা অধিকাংশ কর্মীকে সপ্তাহে দুই থেকে তিন দিন অফিসে উপস্থিত থাকতে হবে। বর্তমানে অনেক কর্মী বাসা থেকে কাজ করার সুযোগ পেলেও নতুন নিয়মে অফিসকেন্দ্রিক কাজের পরিমাণ বাড়বে। প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন দলের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ এবং দলগতভাবে কাজের পরিবেশ উন্নত করতেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে পুনর্গঠনের কারণে যেসব কর্মীকে প্রতিষ্ঠান ছাড়তে হবে, তাঁদের জন্য আর্থিক সহায়তার পরিকল্পনাও করেছে ক্যানভা। প্রতিষ্ঠান ছাড়তে বাধ্য হওয়া কর্মীদের প্রত্যেককে ভবিষ্যতে নতুন উদ্যোগ বা ব্যবসা শুরু করার জন্য ১০ হাজার ডলার করে অনুদান দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। চাকরি হারানো কর্মীদের পরবর্তী কর্মজীবন কিংবা নিজস্ব উদ্যোগ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে এ অর্থ সহায়ক হতে পারে।
বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তি খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতি এবং পরিবর্তিত ব্যবসায়িক পরিস্থিতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিজেদের কার্যক্রম পুনর্বিন্যাস করছে। বিশেষ করে ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্যে অনেক প্রতিষ্ঠান কর্মীসংখ্যা কমানো ও সাংগঠনিক কাঠামোয় পরিবর্তন আনছে। ক্যানভার এই সিদ্ধান্তও প্রযুক্তি খাতের বৃহত্তর পরিবর্তনের ধারার সঙ্গে সম্পর্কিত।
এর আগে গত মার্চে সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠান অ্যাটলাসিয়ান এআই খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ১ হাজার ৬০০ কর্মী ছাঁটাইয়ের সিদ্ধান্ত নেয়। প্রতিষ্ঠানটি ভবিষ্যতের প্রযুক্তিগত চাহিদা বিবেচনায় নিজেদের কর্মী ও ব্যবসায়িক কার্যক্রমে পরিবর্তন আনছে। একইভাবে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে অস্ট্রেলিয়ার আরেক প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান ওয়াইজটেক গ্লোবাল দুই বছর মেয়াদি পুনর্গঠন পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বিশ্বজুড়ে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কর্মী কমানোর ঘোষণা দেয়।
প্রযুক্তি খাতের এসব সিদ্ধান্ত থেকে বোঝা যায়, প্রতিষ্ঠানগুলো এখন শুধু কর্মীসংখ্যা বাড়ানোর পরিবর্তে দক্ষতা, প্রযুক্তিনির্ভরতা এবং কার্যক্রমের কার্যকারিতার ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। বিশেষ করে এআইয়ের ব্যবহার বাড়ার ফলে প্রচলিত কাজের ধরন ও কর্মী ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আসছে।
ক্যানভার ক্ষেত্রেও পুনর্গঠনের মূল লক্ষ্য শুধু কর্মীসংখ্যা কমানো নয়; বরং প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন বিভাগকে আরও সমন্বিত করা, সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া সহজ করা এবং পণ্য উন্নয়নের গতি বাড়ানো। তবে ১ হাজার ২৭১টি পদ পুনর্গঠনের আওতায় আসায় প্রতিষ্ঠানটির কর্মীদের মধ্যে পরিবর্তনের প্রভাব পড়বে। নতুন কাঠামো বাস্তবায়নের পর ক্যানভা কীভাবে প্রবৃদ্ধি ধরে রাখে এবং প্রযুক্তি খাতের প্রতিযোগিতায় নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
পড়ুন:সুলতান’স ডাইন অ্যাকাউন্টস বিভাগে অ্যাসিস্ট্যান্ট এক্সিকিউটিভ
ইমি/


