ক্ষমতাচ্যুত প্যারাগুয়ের প্রেসিডেন্ট পেনা গৃহবন্দি, নতুন দায়িত্বে আলিয়ানা

ব্যাংক কেলেঙ্কারি ও গ্রাহকদের আমানত আটকা পড়ার তীব্র সংকটের জেরে প্যারাগুয়ের প্রেসিডেন্ট সান্তিয়াগো পেনাকে অভিশংসনের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত ও গৃহবন্দি করা হয়েছে। শুক্রবার (৬ নভেম্বর) সরকারি ব্যাংকের পতনের ঘটনায় দায়িত্বে অসদাচরণের অভিযোগে সিনেট তাকে পদ থেকে অপসারণ করে। পরে বার্তা সংস্থা এপির প্রতিবেদন অনুযায়ী তাকে গৃহবন্দি রাখার নির্দেশ দেয়া হয়।

বিজ্ঞাপন

এর মাত্র তিন দিন আগে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো ‘উয়েনো ব্যাংক’ জব্দ করে। এর ফলে প্যারাগুয়ের আর্থিক ব্যবস্থায় চরম উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে এবং এক দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে দেশটিতে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সংকটের সৃষ্টি হয়। এপি জানিয়েছে, ব্যাংক ধসের কারণে দেশটির ৬০ লাখ জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক মানুষই নিজেদের সঞ্চয় উত্তোলনের সুযোগ হারিয়েছেন।

শুক্রবার সিনেটের ৪৪ জন সদস্যই পেনাকে অপসারণের পক্ষে ভোট দেন। ১৯৮৯ সালে জেনারেল আলফ্রেদো স্ত্রোসনারের ৩৫ বছরের স্বৈরশাসনের অবসানের পর অভিশংসনের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত হওয়া দ্বিতীয় প্যারাগুয়ের প্রেসিডেন্ট হলেন তিনি। রায় ঘোষণার পর কংগ্রেসের বাইরে উল্লাসে ফেটে পড়েন আমানতকারী, অবসরপ্রাপ্ত নাগরিক ও শিক্ষার্থীরা। এ সময় প্যারাগুয়ের পতাকা হাতে তারা একে অপরকে জড়িয়ে ধরে ‘আর কখনো স্বৈরশাসন নয়!’ বলে স্লোগান দেন।

পেনাকে রাজধানী আসুনসিওনে তার একটি বাসায় অবরুদ্ধ থাকার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। শনিবার সকালে সরকারি কৌঁসুলিদের সামনে হাজির হওয়ার আগ পর্যন্ত তাকে সেখানেই থাকতে হবে। তার বিরুদ্ধে আস্থার অপব্যবহার, প্রভাব খাটানো এবং ব্যক্তিগত সুবিধার জন্য সরকারি পদ ব্যবহারের গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে, যেগুলোর বিচারে সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড হতে পারে।

আইনপ্রণেতাদের অভিযোগ, রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে তিনি উয়েনো ব্যাংকে সরকারি তহবিলের শত শত কোটি ডলার বিনিয়োগের ব্যবস্থা করেছিলেন। এ সময় নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো ব্যাংকটির ঝুঁকিপূর্ণ অভ্যন্তরীণ ঋণ দেয়ার বিষয়গুলো এড়িয়ে যায়। তবে পেনা সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। শুক্রবার রাতে তার বাসভবনের চারপাশে পুলিশ মোতায়েন করা হয়। বাইরে অবস্থান নেওয়া সাধারণ মানুষ যাতে তিনি পালিয়ে যেতে না পারেন, সেজন্য সারারাত পতাকা হাতে পাহারা দেয়ার ঘোষণা দেন।

এদিকে, সরকারি কৌঁসুলিরা কার্লোস কারভাল্লোকেও গ্রেপ্তারের নির্দেশ দিয়েছেন। ২০২৩ সালে পেনা তাকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন, যিনি পরবর্তীতে ‘উয়েনো ব্যাংক’-এ রূপান্তরিত হওয়া আর্থিক প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনা করতেন। কারভাল্লোকে ইতিমধ্যে আটক করা হয়েছে কি না, তা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

শুক্রবার ভাইস প্রেসিডেন্ট পেদ্রো আলিয়ানা দেশটির ৫৩তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। ২০২৩ সালে পেনার মেয়াদ শুরুর পর থেকেই তিনি আলিয়ানার অধীনে ভাইস প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। নতুন প্রেসিডেন্ট হিসেবে ২০২৮ সালের আগস্টে মেয়াদ শেষ হওয়া পর্যন্ত তিনি দায়িত্ব পালন করবেন। রায় ঘোষণার আগে বিদায়ী বার্তায় পেনা লেখেন, ‘আমি কৃতজ্ঞতা নিয়ে বিদায় নিচ্ছি, তবে যারা আজ উত্তরের অপেক্ষায় আছেন, তাদের যন্ত্রণার কথা আমি উপেক্ষা করছি না। আমি চাই না আমার উপস্থিতি আরও বেশি বিভাজন বা অস্থিতিশীলতার কারণ হয়ে দাঁড়াক।’

জনরোষ দিন দিন আরও তীব্র আকার ধারণ করছে। শুক্রবার সিনেটে আলোচনা চলাকালেই আসুনসিওন শহরের কেন্দ্রস্থলে বিক্ষোভ মিছিল করেন সাধারণ মানুষ। আটকে থাকা সঞ্চয় ফেরত ও উয়েনো ব্যাংকের ব্যর্থতার জন্য কঠোর জবাবদিহিতা চেয়ে তারা স্লোগান দেন, ‘সান্তি পেনাকে টাকুম্বুতে পাঠাও!’ (তাকুম্বু হলো রাজধানীর প্রধান কারাগার, যেখানে উয়েনোর প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক প্রধান নির্বাহী মিগুয়েল ভাজকুয়েজ বর্তমানে আটক রয়েছেন)।

ব্যাংকটি জব্দ করার পর থেকে উয়েনোর গ্রাহকরা কোনো নগদ অর্থ তুলতে পারছেন না এবং কার্ড ব্যবহার করে কেনাকাটার সুযোগও বন্ধ। আকর্ষণীয় সুপারমার্কেট ছাড়ের অফার দিয়ে দরিদ্র ও ব্যাংকিং সেবার বাইরে থাকা মানুষের মাঝে দ্রুত জনপ্রিয়তা পাওয়া এই ডিজিটাল ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানে এক মিলিয়নেরও বেশি প্যারাগুয়েন নাগরিক তাদের জীবনের প্রথম ব্যাংক হিসাব খুলেছিলেন।

এই ধসের প্রভাব কেবল আমানতকারীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; উয়েনোর ওপর নির্ভরশীল একটি যাত্রী পরিবহন অ্যাপ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তিন হাজার চালক কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। পাশাপাশি, রাষ্ট্রীয় বিদ্যুৎ কোম্পানির জনকল্যাণমূলক কাজের জন্য আন্তঃআমেরিকান উন্নয়ন ব্যাংক ও তাইওয়ানের কাছ থেকে নেওয়া ২ কোটি ১০ লাখ ডলারের ঋণও আটকে গেছে।

মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে অখ্যাত অবস্থা থেকে প্যারাগুয়ের অন্যতম বৃহৎ আমানতের ব্যাংকে পরিণত হয়েছিল উয়েনো। সরকারি ৮০ কোটি ডলারের বেশি অর্থ প্রতিষ্ঠানটির সম্প্রসারণে বড় ভূমিকা রেখেছিল এবং দেশটির দুই-তৃতীয়াংশের বেশি প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের হিসাব ছিল এই ব্যাংকটিতে।

পড়ুন : ৭ নভেম্বর: যে ইতিহাসে মিশে আছে একটি জাতির স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষা

সা/

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন