তৈরি পোশাকশিল্পে অস্থিরতা সৃষ্টিতে সংশ্লিষ্টতার সন্দেহে দুই শতাধিক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাবের তথ্য চেয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এর মধ্যে প্রায় ১০০ ব্যক্তির ব্যাংক হিসাব জব্দের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে এই তালিকায় শুধু ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক সংসদ সদস্য বা রাজনৈতিকভাবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাই নন, দেশের শীর্ষস্থানীয় ও ব্যবসায়ী মহলে ইতিবাচক ভাবমূর্তির বেশ কয়েকজন উদ্যোক্তার নামও রয়েছে। এমনকি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই, এমন ব্যবসায়ীরাও পড়েছেন এই তালিকায়। ফলে এনবিআরের এ উদ্যোগ নিয়ে ব্যবসায়ী মহলে আলোচনা-সমালোচনার পাশাপাশি তৈরি হয়েছে উদ্বেগ।
এনবিআরের ব্যাংক হিসাব জব্দের তালিকায় রয়েছেন শেলটেক গ্রুপ ও এনভয় লিগ্যাসি গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) তানভীর আহমেদ এবং তাঁর মা রাশিদা আহমেদ। ব্যবসায়ী মহলে ইতিবাচক ভাবমূর্তি রয়েছে তরুণ উদ্যোক্তা তানভীর আহমেদের। তৈরি পোশাক, বস্ত্র, সিরামিক ও আবাসনসহ বিভিন্ন খাতে ব্যবসা রয়েছে তাঁদের। তাঁর বাবা বিশিষ্ট শিল্পোদ্যোক্তা ও এনভয় টেক্সটাইলের চেয়ারম্যান কুতুবউদ্দিন আহমেদ।
একসময় ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য আবদুস সালাম মুর্শেদীর মালিকানাধীন এনভয় গ্রুপের সঙ্গে ব্যবসায়িক অংশীদারত্ব ছিল কুতুবউদ্দিন আহমেদ ও তাঁর ছেলের। প্রায় সাড়ে চার বছর আগে তাঁরা ব্যবসায়িকভাবে আলাদা হয়ে গেলেও পুরোনো অংশীদারত্বের সূত্র ধরে তানভীর আহমেদ ও তাঁর মায়ের ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
এ বিষয়ে তানভীর আহমেদ বলেন, যথাযথ যাচাই-বাছাই করে তালিকা তৈরি করা হলে হয়রানির পরিস্থিতি তৈরি হতো না। একটি প্রতিষ্ঠানকে বর্তমান অবস্থানে নিয়ে আসতে প্রায় ৪০ বছর সময় লেগেছে। কোনো অভিযোগ থাকলে তাঁদের সঙ্গে আলোচনা করে বিষয়টি যাচাই করা যেত। দ্রুত তদন্তের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
অন্যদিকে এনভয় গ্রুপের পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব তলব করেছে এনবিআর। একই সঙ্গে গ্রুপটির সাবেক সংসদ সদস্য সালাম মুর্শেদী, তাঁর স্ত্রী শারমিন সালাম ও মেয়ে শেহরীন সালামের ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়েছে। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর সালাম মুর্শেদী গ্রেপ্তার হলে তাঁর দুই সন্তান শেহরীন সালাম ঐশী ও ইশমাম সালাম বর্তমানে ব্যবসা দেখভাল করছেন।
পোশাক খাতের আরেক শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা এ কে এম মোশাররফ হোসেন, তাঁর পরিবারের সদস্য ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক হাসনাত মোশাররফসহ আটজনের ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়েছে। গ্রুপটির তিনটি প্রতিষ্ঠানের হিসাবও তলব করা হয়েছে। তবে ব্যবসায়ী মহলের দাবি, মোশাররফ হোসেন ও তাঁর সন্তানদের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা নেই।
স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপের এমডি হাসনাত মোশাররফ অভিযোগ করেন, কোনো ধরনের যথাযথ যাচাই ছাড়াই তাঁদের নাম তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তাঁর ভাষ্য, কারখানার শ্রমিকেরা আন্দোলনে অংশ নিলেই মালিকপক্ষ তাঁদের উসকানি দিয়েছে, এমন অভিযোগ করা যৌক্তিক নয়।
এনবিআরের তালিকায় রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে এমন ব্যবসায়ী ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানও রয়েছে। পোশাক খাতের অন্যতম বড় শিল্পগোষ্ঠী মণ্ডল গ্রুপের ২৮টি প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব তলব করা হয়েছে। পাশাপাশি গ্রুপটির চেয়ারম্যান আবদুল মমিন মণ্ডল, ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুল আলিম মণ্ডল, পরিচালক জোবায়ের মণ্ডল ও আসাদুর রহমানসহ ১৯ জনের ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়েছে।
মণ্ডল গ্রুপের চেয়ারম্যান আবদুল মমিন মণ্ডল ২০১৮ ও ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে সিরাজগঞ্জ-৫ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক মামলা হয়েছে। বর্তমানে তিনি আত্মগোপনে রয়েছেন। গ্রুপটি গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৫৬ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে। প্রতিষ্ঠানটিতে কাজ করেন প্রায় ৫০ হাজার কর্মী।
চট্টগ্রামের ওয়েল গ্রুপের তিনটি প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব তলবের পাশাপাশি চেয়ারম্যান আবদুস সালাম ও তাঁর পরিবারের সদস্যসহ ১১ জনের হিসাব জব্দ করা হয়েছে। আবদুস সালাম চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ ছিলেন এবং দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তাঁর ভাই সৈয়দ নুরুল ইসলাম আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগের উপদেষ্টা ছিলেন। বর্তমানে তিনি কারাবন্দী। তৈরি পোশাক, বস্ত্র ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্য খাতে ব্যবসা রয়েছে ওয়েল গ্রুপের।
এ ছাড়া গিভেন্সি গ্রুপের পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব তলব এবং চেয়ারম্যান খতিব আবদুল জাহিদসহ চারজনের হিসাব জব্দ করা হয়েছে। উত্তরার নিপা গ্রুপের তিনটি প্রতিষ্ঠানের হিসাব তলবের পাশাপাশি চেয়ারম্যান খসরু চৌধুরীসহ চারজনের ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়েছে। খসরু চৌধুরী আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং ২০২৪ সালে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
তুসুকা গ্রুপের ঘটনাটি নিয়েও ব্যবসায়ী মহলে উদ্বেগ রয়েছে। গ্রুপটির একজন উদ্যোক্তা ফয়জুর রহমান আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য ছিলেন। তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়ের সূত্র ধরে গ্রুপটির অন্য উদ্যোক্তাদেরও ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়েছে। গ্রুপের ১০টি প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব তলব এবং পরিচালক ফয়জুর রহমান, আরশাদ জামাল, রেফায়েত উল্লাহ ও ফিরোজ আলমসহ নয়জনের হিসাব জব্দ করা হয়েছে।
অন্য উদ্যোক্তাদের মধ্যে আরশাদ জামাল বিজিএমইএর সাবেক সহসভাপতি। ব্যবসায়ী মহলে তাঁর ইতিবাচক ভাবমূর্তি রয়েছে। গ্রুপটির অন্য তিন উদ্যোক্তার রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা নেই বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
তুসুকা গ্রুপের একজন পরিচালক জানান, ব্যাংক হিসাব জব্দের কারণে কর্মীদের বেতন পরিশোধেও সমস্যা তৈরি হয়েছে। গ্রুপটির কারখানায় ২০ থেকে ২৫ হাজার শ্রমিক কাজ করেন। এক দিন উৎপাদন বন্ধ থাকলে এক থেকে দেড় কোটি টাকার ক্ষতি হতে পারে। এ ধরনের পদক্ষেপ বিদেশি ক্রেতাদের কাছেও নেতিবাচক বার্তা দিতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
পোশাকশ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে শিল্পাঞ্চলে অস্থিরতা চলছে। এর মধ্যে শ্রমিকদের আন্দোলনে তৃতীয় পক্ষের ইন্ধনের অভিযোগ তুলেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তাঁর বক্তব্যের পরই দুই শতাধিক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাবের তথ্য চায় এনবিআর। গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যের ভিত্তিতে এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন এনবিআরের কর্মকর্তারা।
এনবিআরের আয়কর গোয়েন্দা ও তদন্ত ইউনিট (আইটিআইআইইউ) এবং কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেল (সিআইসি) পৃথকভাবে তালিকা তৈরি করেছে। আইটিআইআইইউর একটি তালিকায় ১১০ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নাম রয়েছে। এর মধ্যে ৬৭ জন ব্যবসায়ী। তাঁদের মধ্যে ছয়জন সাবেক সংসদ সদস্য এবং দুজন আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের পদে ছিলেন। এ ছাড়া তাঁদের স্ত্রী, ভাই ও ব্যবসায়িক অংশীদারদের নামও তালিকায় রয়েছে।
এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক ফজলুল হক বলেন, শ্রমিকদের আন্দোলনে তৃতীয় পক্ষের ইন্ধন থাকতে পারে। তবে প্রকৃত দোষীদের সুনির্দিষ্ট তদন্তের মাধ্যমে শনাক্ত করে শাস্তি দেওয়া উচিত। ঢালাওভাবে ব্যাংক হিসাব জব্দ ও তলবের উদ্যোগ ব্যবসায়ীদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করতে পারে এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষতি করতে পারে।
বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খানও কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আগে যথাযথ তদন্তের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি বলেন, পুরো তালিকা তাঁদের হাতে না এলেও বিষয়টি নিয়ে সরকারের উচ্চপর্যায়ে যোগাযোগ করবেন।
ব্যবসায়ী নেতাদের মতে, পোশাকশিল্প দেশের রপ্তানি আয় ও কর্মসংস্থানের অন্যতম প্রধান খাত। তাই অস্থিরতা সৃষ্টির সঙ্গে প্রকৃতপক্ষে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি নিরপরাধ উদ্যোক্তাদের হয়রানি বন্ধ করা জরুরি। অন্যথায় ব্যাংক হিসাব জব্দের কারণে শ্রমিকদের বেতন, উৎপাদন ও রপ্তানি কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
পড়ুন:শীতের সবজির সরবরাহ বাড়ায় স্বস্তি ক্রেতাদের, চড়া মাছ-মাংসের বাজার
ইমি/


