ফ্রান্সজুড়ে বিক্ষোভ ও ধর্মঘট কয়েক শহরে ফের সংঘর্ষ

জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, মজুরি সংকট ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের প্রতিবাদে ফ্রান্সজুড়ে ব্যাপক ধর্মঘট ও বিক্ষোভ করেছেন লাখো মানুষ। গত বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত এ কর্মসূচিতে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, চিকিৎসক, পরিবহনকর্মী, ডাককর্মীসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ অংশ নেন। বেশির ভাগ শহরে বিক্ষোভ শান্তিপূর্ণ থাকলেও কয়েকটি স্থানে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাঁদানে গ্যাস ছুড়েছে পুলিশ। এ ঘটনায় শত শত মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

শ্রমিক সংগঠনগুলোর দাবি, গত বৃহস্পতিবারের বিক্ষোভে সারা দেশে প্রায় ১৬ লাখ মানুষ অংশ নিয়েছেন। তবে ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা ছিল ৫ লাখ ৭৫ হাজার। এর মধ্যে শুধু রাজধানী প্যারিসেই বিক্ষোভ করেছেন প্রায় ৬০ হাজার মানুষ।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত সংঘর্ষের ঘটনায় ৪৪৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আহত হয়েছেন ৫৩ জন পুলিশ কর্মকর্তা। প্যারিসের বিক্ষোভে শ্রমিক সংগঠন সিজিটির নেতা সোফি বেনে বলেন, ‘আজ প্রশ্নটা এই নয় যে, আমরা জিতব কিনা; বরং প্রশ্ন হলো, আমরা কতটা আদায় করতে পারব।’

ইউরোজোনের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি ফ্রান্স বর্তমানে গভীর আর্থিক সংকট মোকাবিলা করছে। এর মধ্যে সামনে দেশটির প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁর উত্তরসূরি নির্বাচনের ভোটের আর মাত্র ছয় মাস বাকি। জনমত জরিপে কট্টর ডানপন্থিরা এগিয়ে থাকায় রাজনৈতিক পরিস্থিতিও বেশ উত্তপ্ত।

গত কয়েক সপ্তাহ ধরে তরুণদের নেতৃত্বে দেশটিতে বিক্ষোভ চলছে। শিক্ষার নিম্নমান, প্রতিকূল শিক্ষার পরিবেশ, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও সামাজিক বৈষম্য নিয়ে ক্ষোভ থেকে এ আন্দোলনের সূত্রপাত। এর ধারাবাহিকতায় শ্রমিক সংগঠনগুলো সব খাতে মজুরি বৃদ্ধি, করব্যবস্থার সংস্কার এবং বিক্ষোভের ওপর পুলিশের বিধিনিষেধ প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে।

এর আগে গত ১৭ অক্টোবরের বিক্ষোভ একপর্যায়ে সহিংস দাঙ্গায় রূপ নেয়। কয়েক বছরের মধ্যে সেটিই ছিল ফ্রান্সের অন্যতম ভয়াবহ দাঙ্গার ঘটনা। ইউরোপের অন্যান্য দেশেও তরুণদের মধ্যে একই ধরনের অসন্তোষ দেখা যাচ্ছে। জার্মানি, স্পেন, গ্রিস ও ইতালিতেও শিক্ষার্থী ও তরুণেরা বিভিন্ন দাবিতে বিক্ষোভ করেছেন।

গত বৃহস্পতিবারের কর্মসূচিতে ফ্রান্সের বিভিন্ন খাতের শ্রমিকেরা যোগ দেন। শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের পাশাপাশি রেলকর্মী, সরকারি হাসপাতাল, ডাক বিভাগ, চিকিৎসক, ফার্মাসিস্ট ও পরিবহনকর্মীদের সংগঠনগুলোও ধর্মঘটের ডাক দেয়।

সরকারি হিসাবে, দেশটির ৩ হাজার ৭০০টি উচ্চবিদ্যালয়ের মধ্যে ৮১টিতে অবরোধ করা হয়। তবে শিক্ষার্থী সংগঠনগুলোর দাবি, প্রায় এক হাজার মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ক্লাস বন্ধ ছিল। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশজুড়ে প্রায় ১৬ শতাংশ শিক্ষক ধর্মঘটে অংশ নেন।

ধর্মঘটের প্রভাব পড়েছে রেল চলাচলেও। কয়েকটি ট্রেন বাতিল ও বিলম্বিত হওয়ায় যাত্রীদের দুর্ভোগে পড়তে হয়েছে। রাজধানীর মন্টপারনাস রেলস্টেশনে জেন নামের এক মনোবিজ্ঞানী বলেন, সকালে অপেক্ষা করার পর ট্রেন বাতিল হলে বিরক্ত লাগাটাই স্বাভাবিক। তবে ধর্মঘটের কারণও তিনি বুঝতে পারছেন।

অন্যদিকে, লিওঁর বিক্ষোভে অংশ নেওয়া আঙুর চাষি মার্টিন থিবার্জে বলেন, এই আন্দোলন ফরাসি সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে একত্র করেছে। তাঁর ভাষায়, ‘আমরা আমাদের কাজের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করতে চাই। আমরা মর্যাদাপূর্ণ মজুরি চাই।’

মার্সেইয়ে ৩১ বছর বয়সী সমাজকর্মী লেয়া এএফপিকে বলেন, প্রতিটি পয়সার হিসাব করে জীবন চালাতে চালাতে তিনি ক্লান্ত। তাঁর মতে, এই সামাজিক আন্দোলন মানুষের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করেছে।

বিক্ষোভ ঘিরে নিরাপত্তা জোরদার করেছিল ফরাসি সরকার। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ জানিয়েছিলেন, দেশজুড়ে ৭০ হাজার পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হবে। সহিংসতা ও বিশৃঙ্খলা ঠেকাতে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলেছিলেন তিনি।

তবে বিক্ষোভ দমনে পুলিশের অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগ উঠেছে। কয়েকজন কিশোরসহ বেশ কয়েকজন বিক্ষোভকারী গুরুতর আহত হয়েছেন। এ নিয়ে পুলিশের অভ্যন্তরীণ তদন্তও শুরু হয়েছে। গত শনিবার প্যারিসে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের লক্ষ্য করে পেট্রোল বোমা নিক্ষেপের ঘটনায় হত্যাচেষ্টার অভিযোগে পৃথক তদন্ত চলছে।

এদিকে, পুলিশের অতিরিক্ত বলপ্রয়োগে আহত অন্তত ১৮ জনের আইনজীবী গত শুক্রবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজের বিরুদ্ধে মামলা করার ঘোষণা দিয়েছেন। আইনজীবী আরি আলিমি বলেন, গুরুতর শারীরিক ক্ষতি ও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির জন্য দায়ীদের আইনের আওতায় আনা প্রয়োজন। এ বিষয়ে তাঁরা রিপাবলিকের বিচার আদালতের দ্বারস্থ হচ্ছেন।

সব মিলিয়ে জীবনযাত্রার ব্যয়, মজুরি সংকট ও পুলিশের ভূমিকা নিয়ে ফ্রান্সে অসন্তোষ ক্রমেই বাড়ছে। আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে এই আন্দোলন দেশটির রাজনৈতিক পরিস্থিতিতেও বড় প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

পড়ুন:ক্ষমতাচ্যুত প্যারাগুয়ের প্রেসিডেন্ট পেনা গৃহবন্দি, নতুন দায়িত্বে আলিয়ানা

ইমি/

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন