মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংঘাত চলাকালে সৌদি আরব ইরানের ভেতরে একাধিক গোপন বিমান হামলা চালিয়েছে বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। দুইজন পশ্চিমা কর্মকর্তা ও দুইজন ইরানি কর্মকর্তার বরাতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, সৌদি ভূখণ্ডে হামলার জবাব হিসেবেই এসব অভিযান পরিচালনা করা হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে জানা গেল যে সৌদি আরব সরাসরি ইরানের ভূখণ্ডে সামরিক অভিযান চালিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী ইরানের বিরুদ্ধে আত্মরক্ষায় রিয়াদ এখন আগের তুলনায় আরও আক্রমণাত্মক কৌশল গ্রহণ করছে।
পশ্চিমা কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, মার্চের শেষ দিকে সৌদি বিমান বাহিনী এসব হামলা চালায়। তবে কোন স্থাপনাকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছিল, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এক কর্মকর্তা জানান, সৌদি আরবে ইরানি হামলার প্রতিক্রিয়াতেই পাল্টা এই আঘাত হানা হয়।
এ বিষয়ে সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা সরাসরি হামলার বিষয়টি স্বীকার বা অস্বীকার করেননি। অন্যদিকে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর দীর্ঘদিন নির্ভরশীল সৌদি আরব সাম্প্রতিক ১০ সপ্তাহের সংঘাতে নিজেকে ক্রমবর্ধমান ঝুঁকির মুখে দেখতে শুরু করে। কারণ, ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা মার্কিন নিরাপত্তা বলয় ভেদ করে উপসাগরীয় অঞ্চলের সামরিক ঘাঁটি, বিমানবন্দর ও তেল স্থাপনায় আঘাত হানে। একই সময়ে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বৈশ্বিক বাণিজ্যেও বড় ধরনের প্রভাব পড়ে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, সংযুক্ত আরব আমিরাতও ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান পরিচালনা করেছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল সোমবার এ তথ্য প্রকাশ করে। সৌদি আরব ও আমিরাতের এসব পদক্ষেপে স্পষ্ট হয়েছে যে, ইরানি হামলার শিকার উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্রগুলো এবার সরাসরি পাল্টা জবাব দেওয়া শুরু করেছে।
তবে দুই দেশের কৌশলে পার্থক্যও ছিল। আমিরাত তুলনামূলক কঠোর অবস্থান নিয়ে ইরানের ওপর সরাসরি চাপ বাড়ানোর চেষ্টা করে। অন্যদিকে সৌদি আরব প্রকাশ্যে উত্তেজনা কমানোর আহ্বান জানিয়ে তেহরানের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত রাখে। রিয়াদে নিযুক্ত ইরানি রাষ্ট্রদূতের মাধ্যমেও দুই দেশের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ চলছিল বলে জানা গেছে।
পশ্চিমা ও ইরানি সূত্রগুলোর দাবি, হামলার পর সৌদি আরব ইরানকে বার্তা দেয় যে প্রয়োজন হলে আরও কঠোর জবাব দেওয়া হবে। এরপর দুই দেশের মধ্যে নিবিড় কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু হয় এবং শেষ পর্যন্ত উত্তেজনা প্রশমনে একটি অনানুষ্ঠানিক সমঝোতা গড়ে ওঠে।
বিশ্লেষক আলি ভাইজ বলেন, পাল্টাপাল্টি হামলার পর উত্তেজনা কমানোর এই সমঝোতা প্রমাণ করে যে উভয় পক্ষই বুঝতে পেরেছে, নিয়ন্ত্রণহীন সংঘাত পুরো অঞ্চলকে ভয়াবহ যুদ্ধে ঠেলে দিতে পারে।
এই অনানুষ্ঠানিক সমঝোতা কার্যকর হয় এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে। পরে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যেও যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠিত হয়।
দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বী সৌদি আরব ও ইরান মধ্যপ্রাচ্যে যথাক্রমে সুন্নি ও শিয়া শক্তির প্রধান প্রতিনিধি হিসেবে পরিচিত। বিভিন্ন আঞ্চলিক সংঘাতে তারা বরাবরই বিপরীত পক্ষকে সমর্থন দিয়ে এসেছে। তবে ২০২৩ সালে চীনের মধ্যস্থতায় দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের পর উত্তেজনা কিছুটা কমে আসে।
সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মার্চের শেষ সপ্তাহে সৌদি আরবে ১০৫টির বেশি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনা ঘটে। তবে এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে সেই সংখ্যা কমে প্রায় ২৫-এ নেমে আসে। পশ্চিমা সূত্রগুলোর ধারণা, পরবর্তী হামলাগুলোর বেশিরভাগই ইরাকভিত্তিক গোষ্ঠীগুলো চালায় এবং তেহরান সরাসরি হামলা কমিয়ে আনে।
এদিকে যুদ্ধবিরতির শুরুর দিকেও সৌদি আরবের দিকে আবার ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হলে রিয়াদ নতুন করে পাল্টা হামলার বিষয়টি বিবেচনা করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পাকিস্তান সৌদি আরবে যুদ্ধবিমান মোতায়েন করে এবং সব পক্ষকে সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানায়।
পড়ুন: ঈদুল আজহা: ট্রেনের অগ্রিম টিকিট বিক্রি শুরু
আর/


