তাপপ্রবাহের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দেশজুড়ে বেড়েছে লোডশেডিং। সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন গ্রামাঞ্চলের পল্লী বিদ্যুতের গ্রহকরা। মনগড়া মিটার রিডিং লিখে ভূতুড়ে বিদ্যুৎ বিলের আভিযোগও কম নয়। বিভিন্ন জেলায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের দাবিতে বিক্ষোভ হয়েছে। কোথাও কোথাও বিদ্যুৎ অফিসের কর্মকর্তা অবরুদ্ধসহ অফিস ঘেরাও, হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটেছে। একদিকে ঘনঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটে জনজীবন বিপর্যস্ত, অন্যদিকে বিলের অস্বাভাবিকতার অভিযোগে চরম ক্ষোভ জমছে গ্রাহকদের মধ্যে। তারই জেরে দেশের বিভিন্ন জেলায় রাস্তায় নামে বিক্ষুব্ধ মানুষ।
বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিগুলোর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জ্বালানি সংকট, বিদ্যুৎকেন্দ্রের কারিগরি ত্রুটি, বৈরী আবহাওয়া, রাতে ব্যাটারিচালিত রিকশা চার্জিং এবং ফুটবল বিশ্বকাপ উপলক্ষে বিদ্যুতের বাড়তি চাহিদার কারণে লোডশেডিং বৃদ্ধি পেয়েছে।
পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি বাংলাদেশ (পিজিসিবি) ও বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) তথ্য অনুযায়ী, কয়েক সপ্তাহ ধরে সারাদেশেই লোডশেডিং বাড়ছে। ছুটির দিনেও বিদ্যুৎ বিভ্রাট অব্যাহত রয়েছে। গত তিন সপ্তাহে গড়ে দুই হাজার মেগাওয়াটের বেশি লোডশেডিং হয়েছে। দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ২৮ হাজার মেগাওয়াটের বেশি হলেও জ্বালানি সংকটের কারণে বাস্তবে উৎপাদন হচ্ছে ১৩ থেকে ১৪ হাজার মেগাওয়াট। অন্যদিকে জাতীয় গ্রিডে চাহিদা ১৭ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যাওয়ায় প্রতিদিন আড়াই থেকে তিন হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত লোডশেডিং করতে হচ্ছে।
পিজিসিবির তথ্য বলছে, আগে মধ্যরাতের পর বিদ্যুতের চাহিদা কমে গেলেও এখন রাত ১০টার পর থেকে লোডশেডিং বেড়ে যায় এবং মধ্যরাত থেকে ভোর পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি বিদ্যুৎ ঘাটতি দেখা দিচ্ছে। বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তাদের ভাষ্য, সবচেয়ে বেশি বৈষম্যের শিকার হচ্ছে গ্রামাঞ্চল। তবে কয়েক দিন ধরে রাজধানীসহ বড় শহরেও লোডশেডিং এড়ানো যাচ্ছে না। ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় দিনে দুই থেকে তিন দফায় এক থেকে দেড় ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন থাকার তথ্য পাওয়া গেছে।
বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (আরইবি) আওতাধীন এলাকায় অনেক গ্রাহক জানিয়েছেন, দিনে ৫ থেকে ৬ ঘণ্টার বেশি বিদ্যুৎ মিলছে না। গত দুই সপ্তাহের মধ্যে শনিবার রাত ২টায় সর্বোচ্চ তিন হাজার ৪৩১ মেগাওয়াট লোডশেডিং রেকর্ড করা হয়। সে সময় বিদ্যুতের চাহিদা ছিল প্রায় ১৭ হাজার মেগাওয়াট। রোববার রাত ৮টায় ১৭ হাজার ১৪৬ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে এক হাজার ৯৮৩ মেগাওয়াট ঘাটতির তথ্য দিয়েছে পিজিসিবি।
লোডশেডিংয়ের প্রতিবাদে টাঙ্গাইল, ঝালকাঠি, নেত্রকোনা, রাজশাহী, শেরপুর, সিলেট ও ঢাকার দোহারে বিক্ষোভ হয়েছে। নেত্রকোনার কেন্দুয়ায় আর্জেন্টিনা-জর্ডান ম্যাচ চলাকালে বিদ্যুৎ না থাকায় পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কার্যালয়ে হামলার ঘটনা ঘটে। টাঙ্গাইলের জামুর্কীতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের দাবিতে পল্লী বিদ্যুতের সাবস্টেশনের সামনে মহাসড়ক অবরোধ করেন স্থানীয়রা। এতে ঢাকা-টাঙ্গাইল-যমুনা সেতু মহাসড়কে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। ক্ষুব্ধ জনতা সাবস্টেশন ভাঙচুরেরও চেষ্টা করে।
ঢাকার দোহারে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কার্যালয় ঘেরাও করে সড়ক অবরোধ ও মানববন্ধন করা হয়। ঝালকাঠিতে মানববন্ধন, সিলেটের কোম্পানীগঞ্জে সড়ক অবরোধ এবং রাজশাহীর বাগমারায় পল্লী বিদ্যুতের প্রচার গাড়ি আটকে বিক্ষোভ করেন স্থানীয়রা। শেরপুরের নকলা ও ঝিনাইগাতীতেও বিশ্বকাপের ম্যাচ দেখতে না পেরে বিক্ষুব্ধ লোকজন পল্লী বিদ্যুৎ অফিসে গিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। শেরপুর পল্লী বিদ্যুতের কর্মকর্তারা জানান, ৭০ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে তারা মাত্র ৩৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পেয়েছেন।
সংশ্লিষ্টরা জানান, মধ্যরাতে চাহিদা বেড়ে যাওয়ার পেছনে দুটি কারণ রয়েছে। রাত ১০টার পর সারাদেশে বিপুলসংখ্যক ব্যাটারিচালিত রিকশা চার্জ দেওয়া শুরু হয়। পাশাপাশি ফুটবল বিশ্বকাপের অধিকাংশ ম্যাচ গভীর রাতে অনুষ্ঠিত হওয়ায় বিদ্যুতের ব্যবহার কমছে না। ফলে মধ্যরাতের পর উৎপাদন কমানোর প্রচলিত ব্যবস্থাপনা কার্যকর থাকছে না।
এর পাশাপাশি গ্যাসের স্বল্পতা, দুটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন কমে যাওয়া এবং বিপুল বকেয়া বিল সংকটকে আরও জটিল করেছে। পায়রা ও বাঁশখালী বিদ্যুৎকেন্দ্রে কয়লা সংগ্রহেও বকেয়া অর্থের কারণে সমস্যা তৈরি হয়েছে। কয়েক বছর ধরে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের বিল নিয়মিত পরিশোধ না হওয়ায় পিডিবির মোট বকেয়া প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে।
পিডিবির সদস্য (উৎপাদন) জহুরুল ইসলাম জানান, গত কয়েক দিন গ্যাসের সরবরাহ কম থাকায় ৫০০ থেকে ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কম উৎপাদন হয়েছে। তবে মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানোয় গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলোতে উৎপাদন কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছে। অন্যদিকে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট কারিগরি ত্রুটির কারণে বন্ধ রয়েছে।
লোডশেডিংকে কেন্দ্র করে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। শেরপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি তাদের অফিস ও সাবস্টেশনসহ ১১টি স্থাপনার নিরাপত্তা চেয়ে পুলিশ সুপারের কাছে চিঠি দিয়েছে। বিদ্যুৎ বিভাগের সূত্র জানিয়েছে, দেশের আরও বিভিন্ন এলাকা থেকেও নিরাপত্তা চেয়ে আবেদন করা হয়েছে এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, তাৎক্ষণিকভাবে এই সংকট কিছুটা কমার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো বৃষ্টি। কারণ তাপমাত্রা কমলে বিদ্যুতের চাহিদাও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে।
ফরিদগঞ্জের পল্লী বিদ্যুৎ অফিসে হামলায় আহত ২৫, অবরুদ্ধ ডিজিএম
চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ জোনাল অফিসে এক নজিরবিহীন ও থমথমে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। গ্রাহকদের হামলায় সহকর্মীদের আহত হওয়ার ঘটনায় নিরাপত্তাহীনতা ও দায়িত্বহীনতার অভিযোগ তুলে নিজ কার্যালয়ে ডিজিএম মো. সাইফুল আলমকে অবরুদ্ধ করে রেখেছেন বিক্ষুব্ধ বিদ্যুৎ কর্মীরা। রোববার (২৯ জুন) দুপুরে ফরিদগঞ্জ জোনাল অফিসে এ ঘটনা ঘটে। এ সময় ২০ থেকে ৩০ জন কর্মী ‘এক দফা, এক দাবি—ডিজিএমের অপসারণ চাই’ স্লোগানে উত্তাল বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন।
দোহারে ‘ভুতুড়ে বিলের’ প্রতিবাদে পল্লী বিদ্যুৎ অফিস ঘেরাও
ঢাকার দোহার উপজেলায় অস্বাভাবিক বিদ্যুৎ বিলের প্রতিবাদে পল্লী বিদ্যুৎ কার্যালয় ঘেরাও করে বিক্ষোভ ও মানববন্ধন করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। রোববার (২৮ জুন) দুপুরে উপজেলার দোহার পল্লী বিদ্যুৎ অফিসের সামনে কয়েকশ গ্রাহক এই কর্মসূচিতে অংশ নেন। বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, তাদের অনেকের বাড়িতে এসি বা ফ্রিজের মতো উচ্চ বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী কোনো যন্ত্র নেই, তবুও প্রতি মাসে অস্বাভাবিক ‘ভুতুড়ে’ বিল পাঠানো হচ্ছে। সাধারণ গ্রাহকদের পক্ষ থেকে অভিযোগ জানানো হলেও কর্তৃপক্ষ কোনো গুরুত্ব দিচ্ছে না বলে দাবি করেন তারা। এ সময় তারা পল্লী বিদ্যুতের ডিজিএমের পদত্যাগ দাবি করে বিভিন্ন স্লোগান দেন।
নেত্রকোনায় কার্যালয় হামলা
নেত্রকোনার কেন্দুয়ায় পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আঞ্চলিক কার্যালয়ে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। আজ রোববার সকাল সোয়া আটটার দিকে উপজেলা সদরের সাউথপাড়া এলাকায় পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জোনাল কার্যালয়ে এ ঘটনা ঘটে। পরে পুলিশ ও স্থানীয় লোকজন উত্তেজিত জনতাকে বুঝিয়ে পরিস্থিতি শান্ত করে।
শেরপুরে হামলার হুমকির অভিযোগ
শেরপুরে বিশ্বকাপের সময় বিদ্যুৎ সরবরাহ না থাকলে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কার্যালয়ে হামলার হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনার পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে নিরাপত্তা চেয়ে রোববার পুলিশ সুপার ও থানার ওসিদের কাছে চিঠি দিয়েছে পল্লী বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ।
ঝালকাঠিতে মানববন্ধন
ঘন ঘন লোডশেডিং, গ্রাহক হয়রানি ও অনিয়মের প্রতিবাদে ঝালকাঠিতে মানববন্ধন করেছেন গ্রাহকেরা। রোববার বেলা ১১টার দিকে ঝালকাঠি প্রেসক্লাবের সামনে এ মানববন্ধনের আয়োজন করে ‘মানবকল্যাণ সোসাইটি’ নামের একটি সামাজিক সংগঠন।
প্রচার গাড়ি আটকে দিলেন জনতা
রাজশাহীর বাগমারায় লোডশেডিংয়ের বিষয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রচারের সময় পল্লী বিদ্যুতের একটি গাড়ি আটকে দিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। রোববার বিকেলে উপজেলার শুভডাঙ্গা ইউনিয়নের বাজারে এ ঘটনা ঘটে।
এদিকে চলমান পরিস্থিতি নিয়ে জাতীয় সংসদে বক্তব্য দিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। তিনি বলেন, একটি বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রের বয়লারের টিউবে লিকেজ ধরা পড়ায় কেন্দ্রটি জরুরি ভিত্তিতে বন্ধ করতে হয়েছে। একই সময়ে বঙ্গোপসাগরের বৈরী আবহাওয়ার কারণে একটি বড় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে কয়লা খালাস ব্যাহত হওয়ায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ইউনিট উৎপাদনের বাইরে রয়েছে। এ দুটি কারণে জাতীয় গ্রিডে একসঙ্গে প্রায় তিন হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে গেছে। ফলে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে লোডশেডিং করতে হচ্ছে। তিনি পরিস্থিতি মোকাবিলায় সবাইকে ধৈর্য ধরার আহ্বান জানান।
পড়ুন: সংঘাত থামিয়ে মুখোমুখি যুক্তরাষ্ট্র-ইরান, সৌদি-কাতার নিয়ে চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদন
আর/


