বিলিয়ন ডলার আত্মসাত, প্রতারণা ও অর্থ পাচারের মামলায় চীনা ধনকুবের গুও ওয়েনগুইকে ৩০ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের একটি আদালত। একসময় চীনের অন্যতম ধনী ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত গুও রিয়েল এস্টেট ব্যবসার মাধ্যমে বিপুল সম্পদের মালিক হন। পরে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ ওঠার পর ২০১৭ সালে তিনি চীন ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক আশ্রয় নেন। খবর বিবিসির।
আদালতের রায়ে বলা হয়েছে, গুও ওয়েনগুই তার রাজনৈতিক পরিচিতি ও চীনা কমিউনিস্ট পার্টিবিরোধী অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে হাজার হাজার সমর্থকের কাছ থেকে বিপুল অর্থ সংগ্রহ করেন। তিনি দাবি করেছিলেন, সংগৃহীত অর্থ চীনে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও রাজনৈতিক আন্দোলনের জন্য ব্যয় করা হবে। কিন্তু তদন্তে দেখা যায়, ওই অর্থের বড় অংশ তিনি ব্যক্তিগত বিলাসী জীবনযাপনের পেছনে ব্যয় করেছেন।
মামলার বিচারক অ্যানালিসা টরেস রায়ে উল্লেখ করেন, গণতন্ত্রের প্রত্যাশায় গুওর ওপর আস্থা রাখা বহু মানুষের বিশ্বাসের অপব্যবহার করা হয়েছে। সমর্থকদের কাছ থেকে সংগৃহীত অর্থ তিনি ব্যক্তিগত সম্পদ বাড়াতে এবং বিলাসবহুল জীবনযাপনে ব্যবহার করেছেন, যা গুরুতর প্রতারণার শামিল।
গুও ওয়েনগুই যুক্তরাষ্ট্রে এসে নিজেকে চীনা সরকারের কঠোর সমালোচক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন। অনলাইনে তার বিপুলসংখ্যক অনুসারী তৈরি হয় এবং তিনি ‘মাইলস গুও’ ও ‘হো ওয়ান কোয়োক’সহ বিভিন্ন নামে পরিচিতি পান। এই জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়ে ২০১৮ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে তিনি অনুসারীদের কাছ থেকে এক বিলিয়ন বা ১০০ কোটি মার্কিন ডলারেরও বেশি অর্থ সংগ্রহ করেন।
তদন্তে উঠে এসেছে, সেই অর্থ দিয়ে গুও প্রায় ৫০ হাজার বর্গফুট আয়তনের একটি বিলাসবহুল প্রাসাদ, প্রায় ১০ লাখ ডলারের একটি ল্যাম্বরগিনি গাড়ি এবং ৩ কোটি ৭০ লাখ ডলারের একটি বিলাসবহুল ইয়ট কিনেছেন। আদালত বলেছে, রাজনৈতিক আন্দোলনের নামে সংগৃহীত অর্থ ব্যক্তিগত সম্পদে রূপান্তর করাই ছিল তার প্রতারণার মূল উদ্দেশ্য।
তবে গুও ওয়েনগুই শুরু থেকেই তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন। তার দাবি, সমর্থকদের কাছ থেকে পাওয়া অর্থ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং চীনে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টায় ব্যয় করা হয়েছে। আদালত অবশ্য সেই দাবি গ্রহণ করেননি।
রায়ের পর বাদীপক্ষের আইনজীবী শন এস. বাকলি বলেন, গুও লোভের বশবর্তী হয়ে হাজার হাজার মানুষের বিশ্বাসকে কাজে লাগিয়েছেন। এই রায় প্রমাণ করেছে যে, সম্পদ, খ্যাতি বা রাজনৈতিক পরিচিতি কাউকে আইনের ঊর্ধ্বে রাখতে পারে না। প্রতারণার মাধ্যমে মানুষের ক্ষতি করলে তার জবাবদিহি করতেই হবে।
চীন ছাড়ার আগে গুও ওয়েনগুইয়ের সঙ্গে দেশটির ক্ষমতাসীন মহলের সুসম্পর্ক ছিল বলে জানা যায়। আবাসন খাতে ব্যবসা করে তিনি দ্রুত সম্পদের পাহাড় গড়েন। কিন্তু পরবর্তীতে তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ আনে চীনা কর্তৃপক্ষ। এরপর তিনি যুক্তরাষ্ট্রে পালিয়ে গিয়ে রাজনৈতিক আশ্রয় চান এবং নিজেকে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির বিরোধী হিসেবে তুলে ধরেন।
যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানকালে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাবেক উপদেষ্টা স্টিভ ব্যাননের সঙ্গে গুওর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। দুজনকে একাধিক অনলাইন অনুষ্ঠানে একসঙ্গে দেখা যায়। ২০২০ সালে তারা ‘নিউ ফেডারেল স্টেট অব চায়না’ নামে একটি প্রচারণা শুরু করেন, যার লক্ষ্য ছিল চীনা কমিউনিস্ট পার্টির শাসনের বিরোধিতা করা।
একই বছর কানেকটিকাটে গুওর বিলাসবহুল ইয়ট থেকে স্টিভ ব্যাননকে গ্রেপ্তার করা হয়। যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো সীমান্তে দেয়াল নির্মাণের জন্য অর্থ সংগ্রহে প্রতারণার অভিযোগে তার বিরুদ্ধে মামলা হয়। পরে ব্যানন প্রতারণার অভিযোগে দোষ স্বীকার করেন এবং শর্তসাপেক্ষে মুক্তি পান। যদিও এর আগে ফেডারেল পর্যায়ের একটি মামলায় সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদের শেষ দিকে ব্যাননকে ক্ষমা করে দেওয়ায় সেই বিচারপ্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে যায়।
গুও ওয়েনগুইয়ের বিরুদ্ধে দেওয়া এই রায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচিত একটি মামলার গুরুত্বপূর্ণ পরিণতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, রাজনৈতিক আদর্শ ও গণতন্ত্রের নামে মানুষের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করে তা ব্যক্তিগত বিলাসিতায় ব্যয় করার মতো অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর বার্তা দেবে এই রায়।
পড়ুন:বিধ্বস্ত ভেনেজুয়েলায় নিহত বেড়ে ১৭০০, নিখোঁজদের উদ্ধারের আশা ক্ষীণ
দেখুন:জয়ের পর শহর জুড়ে চলছে ব্রাজিল সমর্থকদের উল্লাস! |
ইমি/


