বিজ্ঞাপন

নথি জালিয়াতি ও অবৈধ বিয়ের প্রশ্নে তদন্তের আগেই চীনা নাগরিককে সরিয়ে দিল পুলিশ?

মেহেরপুরে আলোচিত চীনা নাগরিক জাং ডং শেং ওরফে মোহাম্মদ আলীর বিয়ে, ধর্মান্তর ও পরিচয়সংক্রান্ত নথিপত্র নিয়ে যখন একের পর এক তথ্য সামনে আসছে, ঠিক তখনই কোনো আইনি সুরাহা কিংবা আনুষ্ঠানিক তদন্ত ছাড়াই পুলিশের ‘সহযোগিতায়’ মেহেরপুর ছেড়েছেন তিনি ও তার দাবি করা বাংলাদেশী স্ত্রী কেয়া খাতুন। আইনি বৈধতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন ওঠার পরও আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার এমন তড়িঘড়ি ভূমিকা নিয়ে এখন স্থানীয় মহলে নানামুখী গুঞ্জন ও ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

বিশ্বস্ত একটি সূত্র থেকে পাওয়া তথ্যে জানা যায় পুলিশের সহযোগিতায় মেহেরপুর ছেড়েছে চীনা নাগরিক ও তার দাবি করা স্ত্রী কেয়া। যার সত্যতা মেলে প্রতিবেদকের হাতে আসা সিসিটিভি ফুটেজে। সেখানে দেখা যায়, পুলিশের ইউনিফর্ম পরিহিত এক সদস্য এবং পুলিশের সেফটি ভেস্ট পরা আরেক ব্যক্তি ওই দম্পতিকে মেহেরপুর শহরের পুরাতন পোস্ট অফিসপাড়ায় তাদের ভাড়া নেওয়া বাসা থেকে বেশ তৎপরতার সাথে বের করে আনছেন। এরপর নিজ দায়িত্বে তাদের একটি ভাড়া করা মাইক্রোবাসে তুলে দিচ্ছেন। এর কিছুক্ষণ পরই গাড়িটি মেহেরপুর ত্যাগ করে।

জানা যায়, বুধবার রাতে কেয়া ও তার স্বামী দাবি করা চীনা নাগরিক জাং ডং শেং শহরের ঘোষপাড়ায় তার বাবার বাড়িতে আসেন। বিষয়টি নিয়ে এলাকায় নানা আলোচনা-সমালোচনা শুরু হলে তারা ঢাকায় যাওয়ার কথা বলে সকালে এলাকা ত্যাগ করেন। বিষয়টি জানতে

গণমাধ্যমকর্মীরা কেয়াদের বাড়িতে গেলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয় তারা ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছেন। এসময় কেয়ার সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলো কেয়া নিজেও দাবি করেন তারা ঢাকায় ফিরে যাচ্ছেন। বিষয়টি নিয়ে সন্দেহ তৈরি হলে বিশ্বস্ত একটি সূত্র থেকে জানা যায় শহরের পুরাতন পোস্ট অফিসপাড়ার একটি পাঁচতলা ভবনে গোপনে ভাড়া নিয়ে আত্মগোপনে আছেন তারা। পরে সেখানে গিয়ে গণমাধ্যমকর্মীরা তাদের খুঁজে বের করেন।

এসময় তাদের সঙ্গে কথা বলে তাদের বিয়ে, ধর্মান্তর ও পরিচয়সংক্রান্ত এফিডেভিট, ম্যারেজ সার্টিফিকেট ও নিকাহনামাসহ বিভিন্ন নথি পর্যালোচনা করেন। তখনই এসব নথিতে একাধিক অসঙ্গতি ধরা পড়ে।

তাদের উপস্থাপিত হলফনামায় মেহেরপুর জজ আদালতের আইনজীবী অ্যাড. রুতশোভা মণ্ডলের নাম, সিল ও স্বাক্ষর ব্যবহার করা হয়েছে। তবে তিনি স্পষ্টভাবে জানান, গত তিন বছরে তিনি কোনো বিদেশি নাগরিকের বিয়ে-সংক্রান্ত হলফনামা সম্পাদন করেননি। তার নাম, সিল ও স্বাক্ষর জালিয়াতির মাধ্যমে ব্যবহার করা হয়ে থাকতে পারে বলেও তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।

অন্যদিকে সদর উপজেলার নিকাহ রেজিস্ট্রার আব্দুল মাবুদ নান্নু জানান, বিদেশি নাগরিকের সঙ্গে বাংলাদেশি নাগরিকের বিয়ের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দেশের দূতাবাস থেকে অনাপত্তিপত্র (এনওসি) নেওয়া বাধ্যতামূলক। কিন্তু ওই দম্পতি কোনো বৈধ এনওসি দেখাতে পারেননি। একই সঙ্গে তারা চীনে তিন মাস অবস্থানের দাবি করলেও কারও কাছে পাসপোর্ট ও ভিসা প্রদর্শন করতে পারেননি।

এসব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের কোনোটিরই উত্তর মেলার আগেই বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় পুলিশ সহযোগিতা করে তাদের তড়িঘড়ি করে ওই ভবন থেকে সরিয়ে দেয়।

ভবনের দেখাশোনাকারী বেল্টু নাগরিক টিভি অনলাইনকে জানান, বৃহস্পতিবার দুপুরে তারা ফ্ল্যাট ভাড়া নেওয়ার পর সাংবাদিকরা এসে কথা বলেন। এরপর সদর থানার এসআই আনিসুর রহমান এসে তাদের সঙ্গে কথা বলেন এবং নিজ দায়িত্বে একটি ভাড়া গাড়ি ঠিক করে মাগরিবের নামাজের আগেই তাদের এখান থেকে সরিয়ে দেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সদর থানার এসআই আনিসুর রহমান নাগরিক টিভি অনলাইনকে বলেন, তিনি কাগজপত্র যাচাই করতে যাননি। কিছু লোক তাদের কাছে চাঁদা দাবি করছে, এমন অভিযোগ পেয়ে সেখানে গিয়েছিলেন। কাগজপত্র যাচাই করতে গিয়েছিলেন এসআই অরুণ। চীনা নাগরিক ও তার স্ত্রী নিরাপত্তাজনিত কারণে এলাকা ছাড়তে চাইলে তিনি শুধু গাড়ির ব্যবস্থা করে দিয়েছেন।

তবে এসআই অরুণ বলেন ভিন্ন কথা। তিনি জানান, তিনি কাগজপত্র যাচাইয়ের জন্য গেলেও মূল দায়িত্ব ছিল ডিএসবি সদস্যদের। বিদেশি নাগরিকের গতিবিধি সম্পর্কে পুলিশকে জানানোর জন্য বাড়ির কেয়ারটেকারকে নির্দেশ দিয়ে তিনি চলে আসেন। তিনি আরও বলেন, যদি কাগজপত্র জাল হয়ে থাকে, তবে এটি অবশ্যই গুরুতর বিষয়।

এখানেই দেখা দিয়েছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—যাদের উপস্থাপিত নথির সত্যতা নিয়ে গুরুতর সন্দেহ রয়েছে এবং যাদের বিয়ের আইনি বৈধতাও প্রশ্নবিদ্ধ, তাদের বিষয়ে তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই কেন জেলা ছাড়তে সহযোগিতা করা হলো? তারা বর্তমানে কোথায় অবস্থান করছেন, এ প্রশ্নেরও সুনির্দিষ্ট কোনো উত্তর দিতে পারেনি পুলিশ।

এ বিষয়ে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জামিনুর রহমান খানের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য চাওয়া হলেও তিনি কোনো মন্তব্য করেননি।

একইভাবে পুলিশ সুপারের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

পরে বিষয়টি খুলনা রেঞ্জের ডিআইজি মোস্তাফিজুর রহমানকে জানানো হলে তিনি নাগরিক টিভি অনলাইনকে বলেন, বিষয়টি স্থানীয় পর্যায়ের। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট জেলার পুলিশ সুপার বা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার বক্তব্য দেবেন, রেঞ্জ ডিআইজির বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ নেই।

পড়ুন: বিশ্বকাপ ফাইনালের আগে ইয়ামালের প্রশংসায় মেসি

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন