চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান দমনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নির্বিচার গুলির ঘটনায় প্রাণ হারান প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষ এবং আহত হন হাজারো আন্দোলনকারী। সেই রক্তাক্ত ঘটনার স্থায়ী ক্ষত বয়ে বেড়ানোদের একজন আহত জুলাই যোদ্ধা মোজাম্মেল হক। মোজাম্মেল হক বলেন, ‘আমার একটি চোখ পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে। অন্য চোখ দিয়ে আংশিক দেখতে পাই। সামনে একজন মানুষ দাঁড়িয়ে আছে বুঝতে পারি, কিন্তু তাকে চিনতে পারি না।’
তিনি জানান, চোখের গুরুতর ক্ষতির কারণে স্বাভাবিক জীবনযাপনও কঠিন হয়ে পড়েছে। ‘চশমা পরলে চোখ থেকে নিজে থেকেই পানি পড়ে, চোখে চাপ অনুভব হয়। গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর আর পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারিনি। আমরা এমন একটি দেশের স্বপ্ন দেখেছিলাম, যেখানে মানুষ অবৈধ কাজ থেকে দূরে থাকবে। কিন্তু এখন শুধু অবৈধ কাজই নয়, আমাদের জীবনও অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে।’
চিকিৎসার জন্য প্রতি মাসে অন্তত দুবার রাজধানীর জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে যেতে হয় তাকে।
জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক ডা. যাকিয়া সুলতানা নীলা বলেন, ‘চোখের ভেতরে রক্তক্ষরণ হয়েছে, রেটিনা ছিঁড়ে গেছে। ১৮ জুলাইয়ের পরিস্থিতি ছিল ভয়াবহ। অনেকের চোখে পেলেট লেগেছিল। যেসব ফরেন বডি আমরা বের করতে পেরেছি, সেগুলো মেটালিক পেলেট ছিল।’
তথ্য অনুযায়ী, মোজাম্মেলের মতো দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন ৪৪৩ জন। আর আহতের সংখ্যা ১৫ হাজারেরও বেশি।
আরেক আহত জুলাই যোদ্ধা হাবিবুর রহমান মোল্লা বলেন, ‘আগে স্বপ্ন ছিল ভালো একটি অবস্থানে যাব, পুলিশ বা সেনাবাহিনীতে যোগ দেব। এখন সেই স্বপ্ন আর নেই। ফাউন্ডেশন থেকেও বলা হচ্ছে, তাদের কাছে কোনো তহবিল নেই।’
যে আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল রক্তক্ষয়ী সেই জুলাইয়ে, সেখানে জীবন বাজি রেখে অংশ নেওয়া অনেক যোদ্ধাই এখন ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তায় রয়েছেন। তাদের প্রত্যাশা, রাষ্ট্র তাদের অবদান ও বর্তমান বাস্তবতার প্রতি আরও কার্যকরভাবে সাড়া দেবে।
বর্তমানে আহত জুলাই যোদ্ধাদের তিনটি ক্যাটাগরিতে মাসিক ভাতা দেওয়া হলেও, প্রাপ্ত অর্থ তাদের প্রয়োজনের তুলনায় কতটা কার্যকর—সে প্রশ্নও উঠে এসেছে।
এ বিষয়ে জুলাই ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী বলেন, ‘অনেকে এখনও ফলোআপ চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে গেলে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরতে বলা হয়। জুলাইয়ের বিরুদ্ধে একটি প্রতিরোধ রয়েছে। যারা এই পরিবর্তন চায়নি, তারা জুলাইয়ের চেতনাকে দুর্বল করতে এবং যোদ্ধাদের নানা পরিচয়ে আড়াল করতে চায়।’
মোজাম্মেলের বর্তমান জীবন তার পরিবারের জন্যও কঠিন বাস্তবতা তৈরি করেছে। তার মা মরিয়ম বেগম বলেন, ‘আমার মেয়েও পড়াশোনা করত। তার খরচ আমার ছেলেই চালাত। এখন মেয়ের লেখাপড়ার খরচ চালাতেও আমার কষ্ট হয়।’
রক্তাক্ত জুলাইয়ের স্মৃতি বয়ে চলা এসব আহত যোদ্ধার ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে। যাদের আত্মত্যাগ দেশের ইতিহাসের অংশ হয়ে আছে, নতুন বাস্তবতায় তাদের জীবনের নিরাপত্তা ও পুনর্বাসন কতটা নিশ্চিত হবে—সেই উত্তর এখনও অধরা। সূত্র: স্টার নিউজ
পড়ুন: স্বর্ণের দামে বড় লাফ, ভরিতে বাড়ল প্রায় ১০ হাজার টাকা
আর/


