বিজ্ঞাপন

সিলেট ট্রিপল মার্ডার: মামলা দায়ের, মেয়ে সেলিনা সুলতানার এজহার

সিলেট নগরের রায়নগরে তিনজনকে হত্যার ঘটনায় অবশেষে কোতোয়ালি মডেল থানায় এজহার দিয়েছেন নিহত দম্পতির মেয়ে ও যুক্তরাজ্যপ্রবাসী সেলিনা সুলতানা। শুক্রবার রাতে তিনি এজহারটি দাখিল করেন। এর আগে পিতা-মাতার জানাজা ও দাফন সম্পন্ন করেন তিনি। এজহারে বাবুল মিয়াকে আসামী করা হয়নি।

কোতোয়ালি মডেল থানার ওসি খান মোহাম্মদ মাইনুল জাকির বলেন, এজহার পেয়েছি। মামলা রেকর্ড প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। ভিকটিমের মেয়ে অজ্ঞাত আসামী করে মামলার এজহার দায়ের করেছেন।

এজহার সূত্রে জানা যায়, সেলিনা সুলতানা তাঁর বাবা এম এ সাত্তার ও মা সুরাইয়া বেগম হত্যার ঘটনায় আইনজীবী সিরাজুল ইসলামসহ আরও কয়েকজনকে ঘিরে সন্দেহের কথা উল্লেখ করেছেন। একই সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের পেছনে তাঁর পরিবারের সঙ্গে চলমান ভূমি-সংক্রান্ত বিরোধ এবং একাধিক মামলার বিষয় তুলে ধরেছেন তিনি।

এজহারে সেলিনা উল্লেখ করেন, ১৯৯৭ সালে তিনি ও তাঁর বাবা পুলিশ লাইন লুসাই গির্জা সমিতি, সিলেটের কাছ থেকে রিকাবীবাজারের সরষপুর এলাকায় আনুমানিক ১২ শতক জমি লিজ নিয়ে সেখানে বাড়ি নির্মাণ করে বসবাস করে আসছিলেন। ২০০৬ সালে ইম্পালস বিল্ডার্স লিমিটেডের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট সিরাজুল ইসলাম তাঁদের লিজ নেওয়া জমিসহ পুলিশ লাইন লুসাই গির্জা সমিতির প্রায় ৮০ শতক জমি তাঁর প্রতিষ্ঠানের নামে দলিল করার পর মালিকানা দাবি করেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।

এ নিয়ে তাঁর বাবা ২০১৬ সালে সিরাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে স্বত্ব মামলা করেন। এজহারে বলা হয়, ওই মামলার পর তাঁর বাবাকে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হলে তিনি সাধারণ ডায়েরি করেন। পরবর্তী সময়ে মামলাটি স্বত্ব-২১১/২০২৩ নম্বরে রূপান্তরিত হয়ে যুগ্ম জেলা জজ অতিরিক্ত আদালতে বিচারাধীন রয়েছে।

সেলিনার অভিযোগ, মামলাটি প্রত্যাহারের জন্য সিরাজুল ইসলাম বিভিন্ন সময় তাঁকে ও তাঁর বাবাকে হুমকি দিয়ে আসছিলেন। এ ছাড়া তাঁদেরসহ আরও কয়েকজনের বিরুদ্ধে সিরাজুল ইসলাম টাকা আদায়ের মামলা করেন, যা আদালতে বিচারাধীন রয়েছে।

এজহারে ২০২৫ সালের ২৯ জানুয়ারির একটি ঘটনারও উল্লেখ করেছেন সেলিনা। তাঁর দাবি, ওই দিন বিকেল ৫টার দিকে সিরাজুল ইসলাম, আমিন হোসেনসহ আরও কয়েকজন তাঁদের পৈতৃক বাড়িতে গিয়ে স্বত্ব মামলা প্রত্যাহারের জন্য হুমকি দেন। তাঁরা মামলা প্রত্যাহারে অস্বীকৃতি জানালে উভয় পক্ষের মধ্যে কথা-কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে সিরাজুল ইসলাম মামলা নিয়ে তাঁদের দেখে নেওয়ার হুমকি দিয়ে চলে যান। এ ঘটনায় সেলিনা থানায় সাধারণ ডায়েরি করেছিলেন বলে এজহারে উল্লেখ করেন।

এরপর ২০২৫ সালের ১৮ মে সিলেট জেলা ও দায়রা জজ আদালত ভবনের সামনে তাঁর বাবা এম এ সাত্তার ও মুহাম্মদ তৌহিদুল ইসলামকে মারধরের অভিযোগও করেন সেলিনা। তাঁর দাবি, আদালত প্রাঙ্গণে সিরাজুল ইসলাম তাঁর বাবাকে স্বত্ব মামলা প্রত্যাহারের জন্য চাপ দেন। তাঁরা রাজি না হওয়ায় তৌহিদুল ইসলামকে হত্যার উদ্দেশ্যে মাথার পেছনে কিল-ঘুষি মেরে রক্তাক্ত করা হয়। তাঁর বাবা বাধা দিতে গেলে তাঁকেও মারধর করা হয়।

এ ঘটনায় তৌহিদুল ইসলাম থানায় অভিযোগ করেন এবং পরে আদালতে মামলা করেন বলে এজহারে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে ভূমি-সংক্রান্ত বিরোধ নিয়ে তাঁর বাবা সিরাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে আরও কয়েকটি মামলা করেছিলেন বলেও উল্লেখ করেন সেলিনা।

এজহারে সাম্প্রতিক সময়ের আরও দুটি ঘটনার কথা তুলে ধরেছেন নিহতের মেয়ে। তাঁর দাবি, গত ২৮ জুলাই যুগ্ম জেলা জজ দ্বিতীয় আদালতে ভূমি-সংক্রান্ত একটি মামলার শুনানির সময় তাঁর বাবার নিয়োজিত আইনজীবীকে প্রকাশ্যে হুমকি দেওয়া হয়। ৩০ জুলাই তাঁর বাবা আদালতে গেলে তাঁকেও আবার মামলা প্রত্যাহারের জন্য হুমকি দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।

সেলিনা এজহারে বলেন, এসব ঘটনার ধারাবাহিকতায় তাঁর বাবার দায়ের করা স্বত্ব মামলা থেকে ১৮৫২২/০৬ নম্বর সাফকবলা দলিলটি রক্ষা করার উদ্দেশ্যে পূর্বপরিকল্পিতভাবে পেশাদার ভাড়াটে খুনিদের ব্যবহার করে তাঁর বাবা এম এ সাত্তার, মা সুরাইয়া বেগম এবং গৃহকর্মী তাহমিনা বেগমকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে।

এজহারে তাঁর অভিযোগ, গত ১২ আগস্ট সকাল আনুমানিক ৯টার দিকে নগরের রায়নগর মিতালী আবাসিক এলাকার ১১১ নম্বর বাসার দ্বিতীয় তলায় নিজ বাসভবনে তিনজনকে হত্যা করে হত্যাকারীরা বাসা থেকে মামলা ও ভূমি-সংক্রান্ত কাগজপত্র, জিডির কপি এবং দলিলপত্র নিয়ে যায়।

সেলিনা জানান, ১৩ আগস্ট যুক্তরাজ্য থেকে বাংলাদেশে আসার পর পিতা-মাতার জানাজা ও দাফন সম্পন্ন করেন। পরে আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে আলোচনা করে থানায় এজহার দিতে কিছুটা বিলম্ব হয়েছে।

এজহারের শেষাংশে তিনি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সব অপরাধীকে শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা এবং তাঁর বাসা থেকে নিয়ে যাওয়া কাগজপত্র ও দলিলাদি উদ্ধারের জন্য পুলিশের কাছে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার আবেদন করেছেন।

রায়নগরের মিতালী আবাসিক এলাকার ওই বাসা থেকে গত ১২ আগস্ট সকালে এম এ সাত্তার, তাঁর স্ত্রী সুরাইয়া বেগম ও গৃহকর্মী তাহমিনা বেগমের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় পরে বাবুল মিয়া নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশের পক্ষ থেকে বাবুলের জবানবন্দি ও হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে একটি প্রাথমিক বর্ণনা দেওয়া হলেও নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে দেওয়া এই এজহারে হত্যাকাণ্ডের পেছনে ভূমি-সংক্রান্ত বিরোধের একটি ভিন্ন সম্ভাবনার কথা তুলে ধরা হয়েছে।

এখন নতুন এজহারে ওঠে আসা অভিযোগ, ভূমি-সংক্রান্ত মামলার নথি ও দলিলপত্র খোয়া যাওয়ার বিষয় এবং হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে এর কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না; তা তদন্তে স্পষ্ট হবে।

বিজ্ঞাপন

পড়ুন : নরসিংদীতে ট্রেনের ধাক্কায় ষাটোর্ধ্ব বৃদ্ধের মৃত্যু

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন