বিজ্ঞাপন

নায়করাজ রাজ্জাকের আসল রাজত্ব ছিল নিজের ঘরে

একজন মানুষকে কতভাবে চেনা যায়?
কেউ তাঁকে চেনেন অভিনেতা হিসেবে, কেউ নায়ক হিসেবে, কেউ চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি হিসেবে। কেউ তাঁর চোখের চাহনিতে খুঁজে পান প্রেম, কেউ তাঁর সংলাপে খুঁজে পান জীবনের গল্প। আবার কারও কাছে তিনি শুধুই একটি নাম—রাজ্জাক।

কিন্তু একটি নাম যখন কয়েক প্রজন্মের আবেগ, ভালোবাসা ও স্মৃতির সঙ্গে মিশে যায়, তখন সেই মানুষটি আর শুধু ব্যক্তি থাকেন না; তিনি হয়ে ওঠেন একটি সময়ের প্রতীক।
আবদুর রাজ্জাক ঠিক তেমনই একজন।

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে তিনি ‘নায়করাজ রাজ্জাক’। অথচ আমার কাছে তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় গল্পটি সিনেমার পর্দায় নয়, ঘরের ভেতরে। যে মানুষটিকে লাখো-কোটি মানুষ পর্দায় নায়ক হিসেবে দেখেছে, সেই মানুষটির ব্যক্তিগত জীবনের সবচেয়ে কোমল অধ্যায়গুলো লেখা হয়েছিল স্ত্রী খায়রুন্নেসা লক্ষ্মী, সন্তান এবং পরিবারকে ঘিরে।

আর তাই আজ রাজ্জাককে নিয়ে লিখতে বসলে বারবার মনে হয়—নায়করাজের আসল রাজত্ব কি আদৌ চলচ্চিত্রের পর্দায় ছিল? নাকি তাঁর আসল রাজত্ব ছিল ঘরে?

‘নায়করাজ’ নামটির শুরুটাও কম চমকপ্রদ নয়।
অনেকেই প্রশ্ন করেন, রাজ্জাককে ‘নায়করাজ’ উপাধি কে দিয়েছিলেন? ইতিহাসের তথ্য বলছে, বাংলা চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় পত্রিকা চিত্রালী-এর সম্পাদক আহমদ জামান চৌধুরী—যিনি চলচ্চিত্রাঙ্গনে আজাচৌ নামে পরিচিত ছিলেন—রাজ্জাককে এই উপাধিতে অভিহিত করেন। তখন রাজ্জাক জনপ্রিয়তার তুঙ্গে। আজাচৌ তাঁর লেখায় বারবার ‘নায়করাজ’ শব্দটি ব্যবহার করতে থাকেন। ধীরে ধীরে শব্দটি পাঠকের কাছে পরিচিত হয়, চলচ্চিত্রাঙ্গনে ছড়িয়ে পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত রাজ্জাকের নামের সঙ্গে স্থায়ীভাবে মিশে যায়।

একটি উপাধি একজন মানুষের সঙ্গে স্থায়ীভাবে যুক্ত হতে পারে, কিন্তু সেটিকে মানুষের মুখে মুখে বাঁচিয়ে রাখার জন্য প্রয়োজন হয় কাজের স্বীকৃতি। রাজ্জাক সেই স্বীকৃতি পেয়েছিলেন তাঁর অভিনয় দিয়ে।

১৯৪২ সালের ২৩ জানুয়ারি কলকাতার নাকতলায় জন্ম নেওয়া রাজ্জাক শৈশবেই অভিনয়ের প্রতি আকৃষ্ট হন। স্কুলে মঞ্চনাটকে অভিনয় দিয়ে তাঁর যাত্রা শুরু। পরে কলকাতার চলচ্চিত্রে কাজ করেন, বোম্বের ফিল্মালয়া ফিল্ম ইনস্টিটিউটেও প্রশিক্ষণ নেন। কিন্তু জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মোড় আসে ১৯৬৪ সালে—যখন স্ত্রী লক্ষ্মী ও শিশুপুত্রকে নিয়ে তিনি কলকাতা থেকে ঢাকায় চলে আসেন।

ঢাকায় এসে তাঁর সামনে ছিল না কোনো নিশ্চিত ভবিষ্যৎ। ছিল না আজকের নায়কোচিত জৌলুশ। ছিল সংগ্রাম।

রাজ্জাকের স্ত্রী লক্ষ্মীর স্মৃতিচারণে জানা যায়, ঢাকায় স্থায়ী হওয়ার সিদ্ধান্তে তাঁরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। আট মাসের সন্তানকে নিয়ে তাঁরা ঢাকায় এসেছিলেন। শুরুতে পরিচিতজনের বাসায়, পরে ভাড়া বাসায় থেকেছেন। রাজ্জাকের মনে কলকাতায় ফিরে যাওয়ার ভাবনা এলেও লক্ষ্মী ঢাকায় থাকার ব্যাপারে দৃঢ় ছিলেন। শেষ পর্যন্ত কলকাতার সম্পদ বিক্রি করে ঢাকাকেই তাঁদের স্থায়ী ঠিকানা বানানো হয়।

এখানে রাজ্জাকের গল্পের সঙ্গে লক্ষ্মীর গল্পটিও অবিচ্ছেদ্য।
কারণ মহানায়করা একা তৈরি হন না।

পর্দায় একজন মানুষকে আমরা একা দেখি, কিন্তু বাস্তব জীবনের পেছনে তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটির গল্পটি সাধারণত আড়ালেই থেকে যায়। রাজ্জাকের ক্ষেত্রেও তাই। লক্ষ্মী ছিলেন সেই আড়ালে থাকা মানুষ, যিনি শুধু স্ত্রী ছিলেন না; তাঁর জীবনের দীর্ঘ সংগ্রামের সঙ্গী ছিলেন।

রাজ্জাক-লক্ষ্মীর বিয়েটাও ছিল খুব অল্প বয়সে। ১৯৬২ সালে তাঁদের বিয়ে হয়। তখন রাজ্জাকের বয়স বিশের কাছাকাছি, লক্ষ্মীও ছিলেন কিশোরী। সময়ের সঙ্গে সেই সম্পর্কই পরিণত হয় পাঁচ দশকেরও বেশি সময়ের এক দাম্পত্যে।

দাম্পত্যজীবনের সৌন্দর্য বোধ হয় এখানেই—প্রেমের শুরুটা যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো দীর্ঘ পথ একসঙ্গে হাঁটতে পারা।
রাজ্জাক ও লক্ষ্মী সেই পথ হেঁটেছেন।

চলচ্চিত্রের দুনিয়ায় রাজ্জাক যখন ধীরে ধীরে নিজের অবস্থান তৈরি করছেন, তখন সংসারে একে একে আসছে সন্তান। তাঁদের পাঁচ সন্তান—বাপ্পারাজ, নাসরিন পাশা শম্পা, বাপ্পি, ময়না ও সম্রাট।

একজন তারকার জীবনে সবচেয়ে কঠিন কাজ হয়তো জনপ্রিয়তা ধরে রাখা নয়; পরিবারের মানুষদের কাছে নিজের স্বাভাবিক পরিচয় ধরে রাখা। রাজ্জাক সেটি পেরেছিলেন বলেই মনে হয়।

পর্দায় তিনি ছিলেন অসংখ্য নায়িকার নায়ক। সুচন্দা, কবরী, ববিতা, শাবানা—বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের একের পর এক জনপ্রিয় অভিনেত্রীর সঙ্গে তাঁর জুটি দর্শকের মনে স্থায়ী জায়গা করে নিয়েছে। তাঁর ক্যারিয়ারে তিন শতাধিক চলচ্চিত্রে অভিনয়ের উল্লেখ পাওয়া যায়। তিনি শুধু অভিনেতাই ছিলেন না; পরিচালক ও প্রযোজক হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ১৯৭৬ সালে ‘আকাঙ্ক্ষা’ দিয়ে প্রযোজনায় এবং ১৯৭৭ সালে ‘অনন্ত প্রেম’ দিয়ে পরিচালনায় আত্মপ্রকাশ করেন।

পাঁচবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে শ্রেষ্ঠ অভিনেতা হওয়া, ২০১৩ সালে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে আজীবন সম্মাননা, ২০১৫ সালে স্বাধীনতা পুরস্কার—রাজ্জাকের শিল্পীজীবনের সাফল্যের তালিকা দীর্ঘ। তিনি ছিলেন প্রথম বাংলাদেশি অভিনেতা যিনি জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের (UNFPA) শুভেচ্ছাদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

কিন্তু এসব পুরস্কারের কোনোটিই হয়তো তাঁর কাছে সন্তানের পায়ের নূপুরের শব্দের সমান ছিল না।
এখানেই আসি শম্পার গল্পে।

রাজ্জাকের প্রথম কন্যা নাসরিন পাশা শম্পা। বাবার কাছে ছোট্ট মেয়েটি ছিল ভীষণ আদরের। পারিবারিক স্মৃতিতে আছে, মেয়ের জন্য তিনি সোনার নূপুর কিনে এনেছিলেন। ছোট্ট শম্পা যখন হাঁটতে শিখল, তার পায়ের নূপুরের শব্দে ঘর ভরে উঠত। নায়করাজ সেই শব্দ ভালোবাসতেন।

একজন মানুষ সারাজীবন কত শব্দ শুনেছেন!
ক্যামেরার ক্লিক। পরিচালকের ‘অ্যাকশন’। ‘কাট’। দর্শকের করতালি। প্রেক্ষাগৃহের উল্লাস। সাংবাদিকের প্রশ্ন। সহশিল্পীদের হাসি।

কিন্তু বাবার কানে সন্তানের পায়ের নূপুরের শব্দের মতো আর কোনো শব্দ কি এতটা মধুর হতে পারে?
সম্ভবত নয়।

আর সেই নূপুরের শব্দই একদিন থেমে গেল।
১৯৯৩ সালে শম্পার অকালমৃত্যু রাজ্জাকের জীবনে এমন এক আঘাত নিয়ে আসে, যা তাঁকে ভেতর থেকে ভেঙে দিয়েছিল। ২০২৬ সালের ডেইলি স্টার-এর একটি সাম্প্রতিক পারিবারিক স্মৃতিচারণে তাঁর ছেলে সম্রাট জানিয়েছেন, শম্পার অসুস্থতার খবর পেয়ে শুটিং থেকে রাজ্জাক দ্রুত ঢাকায় ফিরে এসেছিলেন। হাসপাতালে শম্পা নাকি বাবার আসার কথা জানতে চেয়েছিল। রাজ্জাক পৌঁছে মেয়েকে জড়িয়ে ধরেছিলেন; কিছুক্ষণের মধ্যেই শম্পা মারা যায়। সম্রাটের স্মৃতিতে, মেয়েকে হারানোর পর তাঁর বাবা বারবার কেঁদেছেন; সেই মৃত্যু তাঁকে গভীরভাবে ভেঙে দিয়েছিল।

এখানে ‘নায়করাজ’ শব্দটি কেমন যেন অচেনা হয়ে যায়।

কারণ একজন নায়ক কখনো সন্তানের মৃত্যুর সামনে নায়ক থাকতে পারেন না।

সেখানে তিনি শুধু বাবা।

একজন ভেঙে পড়া বাবা।

সন্তান হারানোর শোক একজন মায়ের জন্য কেমন, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। লক্ষ্মীর ক্ষেত্রেও নিশ্চয়ই তা ছিল অসহনীয়। কিন্তু একজন স্ত্রীর জীবনে কখনো কখনো এমন মুহূর্ত আসে, যখন নিজের কান্নার চেয়েও বড় হয়ে ওঠে স্বামীর কান্না। তখন নিজের বুকের ভেতরকার ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে অন্য মানুষটিকে ধরে রাখতে হয়।

লক্ষ্মীর জীবনেও এমন সময় এসেছিল।

রাজ্জাকের ব্যক্তিজীবনের সবচেয়ে শক্তিশালী ছবি সম্ভবত এখানেই—একজন স্বামী ও স্ত্রীর সম্পর্ক, যেখানে দুজনই একই শোকের মানুষ, অথচ একজনকে অন্যজনের জন্য শক্ত হতে হয়।

রাজ্জাক তাঁর স্ত্রীকে শুধু ভালোবাসতেন না; নিজের জীবনের নানা গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও প্রতিষ্ঠানের নামেও লক্ষ্মীর উপস্থিতি রেখেছিলেন। গুলশানের তাঁদের বাড়ির নাম ‘লক্ষ্মীকুঞ্জ’। ২০২৬ সালে দ্য ডেইলি স্টার সেই বাড়ি নিয়ে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানায়, রাজ্জাক ১৯৬৯ সালে জমি কিনে সেখানে বাড়ি নির্মাণ শুরু করেছিলেন; ১৯৮৪ সালে নতুন করে বাড়িটি নির্মিত হয়। স্ত্রী লক্ষ্মীর নামেই বাড়িটির নামকরণ।
কী আশ্চর্য!
যে মানুষটির নাম কোটি মানুষ জানত, নিজের ঘরের নাম তিনি রেখেছিলেন প্রিয় স্ত্রীর নামে।

খ্যাতিমান মানুষদের জীবনে কখনো কখনো অহংকার খুব সহজেই ঢুকে পড়ে। কিন্তু রাজ্জাকের পারিবারিক স্মৃতিতে পাওয়া যায় অন্য এক মানুষকে। তিনি পরিবারের সবাইকে নিয়ে খেতে পছন্দ করতেন। শুটিংয়ের সময়সূচি অনুমতি দিলে পরিবারের সঙ্গে একসঙ্গে বসে খাবার খাওয়ার চেষ্টা করতেন। যৌথ পরিবারের বন্ধনকে গুরুত্ব দিতেন। তাঁর সন্তানরা এখনও সেই পারিবারিক ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন বলে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

এমনকি তাঁর বাড়ির বারান্দা ও ছাদও ছিল পারিবারিক আড্ডার জায়গা। সেখানে বন্ধু, সহকর্মী, সন্তান ও নাতি-নাতনিদের নিয়ে সময় কাটাতেন। ছাদের দোলনাটি ছিল তাঁর প্রিয় জায়গাগুলোর একটি।

চলচ্চিত্রের বাইরে রাজ্জাক ছিলেন বইপাগল মানুষ। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের লেখার প্রতি তাঁর বিশেষ আকর্ষণ ছিল। বিদেশে গেলেও বইয়ের দোকান খুঁজতেন। কলকাতায় গেলে বইয়ের বাজারে ঘুরতেন। তাঁর বই পড়ার অভ্যাস সন্তান ও নাতি-নাতনিদের মধ্যেও ছড়িয়ে দিতে চেয়েছেন। এমনকি সাহিত্য থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি চলচ্চিত্রও নির্মাণ করেছেন।

এখানে নায়করাজের আরেকটি পরিচয় পাওয়া যায়—তিনি শুধু সিনেমা করতেন না, সিনেমাকে বুঝতেন।
পোশাক নিয়েও তাঁর সচেতনতা ছিল। চরিত্র অনুযায়ী পোশাক কেমন হবে, সেটি তিনি গুরুত্ব দিয়ে দেখতেন। তাঁর ছেলে সম্রাটের স্মৃতিচারণে এমন কথাও এসেছে যে, রাজ্জাক মনে করতেন চরিত্র নির্মাণে পোশাকের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে।

আর এখানেই ফিরে আসে সেই শাড়ির গল্প।
এফডিসিতে শাবানার সঙ্গে শুটিং। শাবানার পরনে সুন্দর একটি শাড়ি। রাজ্জাকের চোখে পড়ল। কিন্তু তাঁর ভাবনায় পর্দার নায়িকা নয়—ঘরের লক্ষ্মী।

রাজ্জাক নায়িকাদের পরনের কোনো শাড়ি পছন্দ হলে তার নাম জেনে রাখতেন, কখনো নোট করে রাখতেন, পরে স্ত্রী লক্ষ্মীর জন্য সেই ধরনের শাড়ি কিনতেন। কলকাতার নিউ মার্কেট থেকেও স্ত্রীকে নিয়ে কেনাকাটা করতেন।

একজন তারকার প্রেমের ভাষা যদি এমন হয়, তাহলে তাঁর ঘরটা কেমন ছিল?

সম্ভবত খুব সাধারণ।

খুব আপন।

খুব ব্যক্তিগত।

আর হয়তো সেখানেই তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয়।
রাজ্জাকের ঘরের নাম ‘লক্ষ্মীকুঞ্জ’ হওয়াটা তাই আমার কাছে কেবল একটি বাড়ির নাম নয়। এটি যেন তাঁর জীবনের একটি ঘোষণা—পর্দায় আমি যত বড়ই হই, ঘরে আমার পৃথিবী অন্য কারও নামে।
লক্ষ্মীর নামে।

রাজ্জাকের চলচ্চিত্রজীবন ছিল দীর্ঘ, কিন্তু তাঁর পারিবারিক জীবনও ছিল কম ঘটনাবহুল নয়। তিনি শুধু অভিনয় করেননি, নিজের প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন, চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন, নতুনদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। সাম্প্রতিক পারিবারিক এক স্মৃতিচারণে তাঁর ছেলে সম্রাট জানিয়েছেন, রাজ্জাক অনেক মানুষকে নীরবে সাহায্য করতেন; কখনো পারিশ্রমিক ছাড়াই চলচ্চিত্রে কাজ করতেন, সংকটে থাকা সহকর্মীদের পাশে দাঁড়াতেন।

একজন মানুষের মহত্ত্ব সবসময় তাঁর পুরস্কারে লেখা থাকে না।

কখনো থাকে তিনি কাকে বিনা পারিশ্রমিকে সাহায্য করেছিলেন, কার দুঃসময়ে পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, কার সন্তানকে নিজের সন্তানের মতো দেখেছিলেন—সেসব অপ্রকাশিত গল্পে।

রাজ্জাক ধর্মীয় জীবনেও ছিলেন সচেতন। ১৯৮৩ সালে প্রথম হজ পালন করেন এবং জীবনে একাধিকবার হজ করেন। গুলশান সোসাইটি মসজিদ প্রতিষ্ঠার সঙ্গেও তাঁর সম্পৃক্ততার কথা জানা যায়।

তাঁর জীবনে আরও অনেক শখ ছিল—বই, বাগান, মাছ ধরা, গাড়ি, প্রাণী। ১৯৬৭ সালে তিনি প্রথম গাড়ি কেনেন। তাঁর বাড়িতে কুকুর পোষারও অভ্যাস ছিল। বাগান করতেন, নাতি-নাতনিদের সঙ্গে সময় কাটাতেন।

অর্থাৎ পর্দার বাইরে রাজ্জাকের জীবন ছিল বহুমাত্রিক।
তিনি শুধু নায়ক ছিলেন না।
তিনি পাঠক ছিলেন।
তিনি বাগানপ্রেমী ছিলেন।
তিনি গাড়িপ্রেমী ছিলেন।
তিনি আড্ডাবাজ ছিলেন।
তিনি ধর্মপ্রাণ ছিলেন।
তিনি বাবা ছিলেন।
তিনি স্বামী ছিলেন।
আর এই শেষ দুটি পরিচয়ই হয়তো তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় পরিচয়।

২০১৭ সালের ২১ আগস্ট রাজ্জাক চলে গেলেন। হাসপাতাল থেকে যখন তাঁর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ল, তখন বাংলাদেশের চলচ্চিত্র অঙ্গন যেন হঠাৎ করেই নিজের একটি অধ্যায় হারিয়ে ফেলেন।

কিন্তু লক্ষ্মীর জন্য সেটি ছিল শুধু চলচ্চিত্রের একজন কিংবদন্তির মৃত্যু নয়।

সেটি ছিল তাঁর জীবনসঙ্গীর চলে যাওয়া।

দীর্ঘ প্রায় ৫৫ বছরের দাম্পত্যের পর যে মানুষটি একদিন তাঁকে কলকাতা থেকে ঢাকায় নিয়ে এসেছিলেন, যাঁর সঙ্গে সংগ্রাম করেছেন, সংসার করেছেন, সন্তান বড় করেছেন, সাফল্য দেখেছেন, সন্তান হারিয়েছেন—সেই মানুষটি একদিন নিঃশব্দে চলে গেলেন।

রাজ্জাক-লক্ষ্মীর দীর্ঘ দাম্পত্যকে চলচ্চিত্রাঙ্গনের বিরল সফল দাম্পত্য হিসেবে দেখা হয়। রাজ্জাক তাঁর বাড়ি, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান এমনকি প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের নামেও লক্ষ্মীর নাম রেখেছিলেন।

এই জায়গায় এসে ‘নায়করাজ’ উপাধিটাও আমার কাছে নতুন অর্থ পায়।

রাজা হওয়ার অর্থ কি শুধু সিংহাসনে বসা?
না।

কখনো রাজা হওয়া মানে নিজের প্রিয় মানুষটিকে সম্মান দেওয়া।

কখনো রাজা হওয়া মানে সন্তানদের সঙ্গে মাটিতে বসে খাওয়া।

কখনো রাজা হওয়া মানে শুটিংয়ের ব্যস্ততার মাঝেও অসুস্থ স্ত্রীর খবর নেওয়া।

কখনো রাজা হওয়া মানে সন্তানের পায়ের নূপুরের শব্দে আনন্দ পাওয়া।

আবার কখনো রাজা হওয়া মানে সন্তানের মৃত্যুর পর কোনো রাজকীয় মুখোশ না রেখে শিশুর মতো কাঁদতে পারা।
রাজ্জাকের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য সম্ভবত এখানেই।

তিনি মানুষের সামনে নায়ক ছিলেন, কিন্তু নিজের ঘরে মানুষ ছিলেন।
আর মানুষ হওয়াটাই সবচেয়ে কঠিন।

আজ তাঁর মৃত্যুর প্রায় এক দশক পরও ‘নায়করাজ’ নামটি বেঁচে আছে। তাঁর সিনেমা আছে। তাঁর অভিনয় আছে। তাঁর ছবি আছে। তাঁর সংলাপ আছে। তাঁর গান আছে। নতুন প্রজন্ম তাঁকে হয়তো নতুনভাবে আবিষ্কার করছে।
কিন্তু তাঁর ঘরের স্মৃতিগুলো আরও গভীর।

‘লক্ষ্মীকুঞ্জু’র বইয়ের তাক, ছাদের দোলনা, পরিবারের একসঙ্গে খাওয়ার অভ্যাস, স্ত্রীকে ঘিরে তাঁর ভালোবাসা, সন্তানদের প্রতি মমতা—এসবের ভেতর যে রাজ্জাককে পাওয়া যায়, তিনি চলচ্চিত্রের রাজ্জাকের চেয়েও বড়।

কারণ সিনেমার নায়ককে পরিচালক তৈরি করেন।

কিন্তু একজন ভালো স্বামী, একজন ভালো বাবা,
একজন ভালো মানুষ—তাকে তৈরি করে জীবন।
রাজ্জাক সেই পরীক্ষায় কেমন ছিলেন, তার সবচেয়ে বড় সাক্ষী তাঁর পরিবার।

আজ যদি আমাকে কেউ প্রশ্ন করেন—রাজ্জাক কেন ‘নায়করাজ’?
আমি বলব, তাঁর অভিনয়ের জন্য, তাঁর জনপ্রিয়তার জন্য, তাঁর দীর্ঘ চলচ্চিত্রযাত্রার জন্য—এসব তো আছেই।
কিন্তু আরও একটি কারণ আছে।
তিনি পর্দার বাইরে নিজের ভালোবাসার মানুষদের জন্য যে মানুষটি ছিলেন, সেটিও তাঁর নায়কত্বের অংশ।

যে মানুষ নায়িকার শাড়ি দেখে স্ত্রীর কথা ভাবতেন—স্মৃতিচারণের সেই গল্প সত্য হোক কিংবা ভালোবাসার অতিরঞ্জিত কিংবদন্তি হোক, তার ভেতরে আমরা যে রাজ্জাককে দেখতে পাই, তিনি অসাধারণ।

যে মানুষ সন্তানের পায়ের নূপুরের শব্দ মনে রাখতেন, সেই বাবা অসাধারণ।

যে মানুষ সন্তান হারিয়ে কাঁদতে পেরেছিলেন, সেই বাবা সত্যিকারের মানুষ।

আর যে মানুষ নিজের বাড়ির নাম রেখেছিলেন স্ত্রীর নামে, সেই স্বামীর ভালোবাসা ইতিহাসের ফুটনোটে আটকে থাকে না।

তাই রাজ্জাককে নিয়ে আমার শেষ কথাটি খুব সহজ।
তিনি ছিলেন বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের নায়করাজ।
কিন্তু তাঁর সবচেয়ে বড় সিংহাসন ছিল না কোনো স্টুডিওতে।
ছিল না কোনো প্রেক্ষাগৃহে।
ছিল না পুরস্কারের মঞ্চে।
ছিল তাঁর ঘরে।
সেই ঘরের নাম—লক্ষ্মীকুঞ্জ।

আর সেই রাজ্যের সবচেয়ে আপন মানুষ—খায়রুন্নেসা লক্ষ্মী।

পর্দার আলো একদিন নিভে যায়। ক্যামেরা থেমে যায়। করতালির শব্দও একসময় স্তব্ধ হয়ে আসে। কিন্তু ভালোবাসার গল্পের কোনো শেষ দৃশ্য থাকে না।
তাই আজও হয়তো কোথাও, কোনো পুরোনো স্মৃতির ভেতর, কোনো ছবির অ্যালবামের পাতায়, কোনো পরিবারের কথোপকথনে শোনা যায় ছোট্ট শম্পার পায়ের নূপুরের শব্দ—

ঝুমুর… ঝুমুর…

সেই শব্দের কাছে নায়করাজও একদিন শুধু একজন বাবা হয়ে যান।

আর হয়তো সেখানেই তাঁর সবচেয়ে বড় নায়কত্ব।

লেখক পরিচিতি: সিনিয়র সাংবাদিক ও সভাপতি বাংলাদেশ অনলাইন জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন।

বিজ্ঞাপন

পড়ুন : মা-ছেলের ৫ হাজার টাকার সিনেমা বানিয়ে আয় ২৫ কোটি

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন