বিজ্ঞাপন

বহুমুখী সংকট: দেশের পোশাক খাত কি ভেঙ্গে পরবে?

বিজ্ঞাপন

গ্যাস, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকটের পাশাপাশি ব্যাংকিং অসহযোগিতা, ঋণের চাপ ও ক্রয়াদেশের ঘাটতিতে ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে দেশের পোশাকশিল্পের টিকে থাকা। ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসেই বিজিএমইএর সদস্য অন্তত ৮০টি কারখানায় প্রায় ১৯ হাজার ১৮৮ শ্রমিক চাকরিচ্যুত বা ছাঁটাই হয়েছেন। এর মধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে ২৭টি কারখানা। শিল্প পুলিশ, বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর তথ্য বলছে, সংকট শুধু কারখানা বন্ধেই থেমে নেই; উৎপাদন ব্যাহত হওয়া ও শ্রমিক ছাঁটাইয়ের চাপও বাড়ছে। তাহলে কি বহুমুখী এই সংকট দেশের পোশাক খাতকে আরও বড় বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছে?

আগেও তিন শিল্পাঞ্চলে বন্ধ হয়েছিল ৯৫ কারখানা

কারখানা বন্ধের ঘটনা নতুন নয়। ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সাত মাসে গাজীপুর, সাভার-আশুলিয়া এবং নারায়ণগঞ্জ-নরসিংদী—এই তিন শিল্পাঞ্চলে স্থায়ীভাবে ৯৫টি কারখানা বন্ধ হয়েছিল। এতে কর্মরত ৬১ হাজার ৮৮১ শ্রমিক-কর্মচারী কর্মসংস্থান হারান। শিল্প পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ওই সময়ে গাজীপুরে ৫৪টি, নারায়ণগঞ্জ-নরসিংদী অঞ্চলে ২৩টি এবং সাভার-আশুলিয়া-ধামরাই এলাকায় ১৮টি তৈরি পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে যায়।

গাজীপুরে বন্ধ হওয়া ৫৪টি কারখানার প্রায় সবই তৈরি পোশাক ও বস্ত্র খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। শুধু এই জেলাতেই এসব কারখানায় কর্মরত প্রায় ৪৫ হাজার ৭৩২ শ্রমিক-কর্মচারী চাকরি হারিয়েছেন। এর মধ্যে বেক্সিমকো শিল্পপার্কের কারখানাগুলো বন্ধ হওয়ার কারণে বিপুলসংখ্যক শ্রমিক কর্মহীন হয়েছেন।

নতুন সংকট গ্যাস-বিদ্যুতের ঘাটতি

স্থায়ীভাবে বন্ধ হওয়া কারখানার বাইরে শিল্প খাতে এখন নতুন করে সংকট তৈরি হয়েছে। গ্যাস ও বিদ্যুতের ঘাটতির কারণে কোথাও উৎপাদন বন্ধ রাখতে হচ্ছে, কোথাও কমিয়ে দিতে হচ্ছে। আগস্টের শুরুতে গাজীপুরে দীর্ঘস্থায়ী গ্যাস সংকটের কারণে প্রায় ১৭ থেকে ২০ শতাংশ শিল্পকারখানা তিন থেকে চার দিনের জন্য উৎপাদন বন্ধ বা ছুটি ঘোষণা করে। বিভিন্ন সূত্রে এসব কারখানার সংখ্যা ৭০০ থেকে ৮০০ পর্যন্ত বলা হয়েছে।

সরকারি ছুটির সঙ্গে অতিরিক্ত ছুটি যুক্ত করে অনেক কারখানা কার্যত উৎপাদন বন্ধ রাখে। এতে হাজার হাজার শ্রমিক বাড়ির উদ্দেশে রওনা হন। এসব ছুটিকে স্থায়ী বন্ধ বলা না গেলেও দীর্ঘ সময় গ্যাস সংকট চলতে থাকলে উৎপাদন কমে যাওয়া, অতিরিক্ত ছুটি এবং শেষ পর্যন্ত শ্রমিক ছাঁটাইয়ের ঝুঁকি বাড়তে পারে।

সর্বশেষ ময়মনসিংহের ভালুকা শিল্পাঞ্চলে তীব্র গ্যাস সংকটে ২০টি কারখানার শ্রমিকদের ছুটি দেওয়া হয়েছে। বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) সকালে শ্রমিকরা কাজে যোগ দিলেও উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় দুপুরের খাবারের সময়ের মধ্যে ধাপে ধাপে তাদের ছুটি দেওয়া হয়।

শিল্প পুলিশ-৫ এর পুলিশ সুপার মো. আনছার উদ্দিন বলেন, ‘‘সকাল থেকে গ্যাস সংকট তীব্র হওয়ায় কারখানাগুলোতে উৎপাদন চালানো সম্ভব হয়নি। শিল্পাঞ্চলের প্রধান কারখানাগুলোতে উৎপাদন গড়ে ৫০ শতাংশে নেমে এসেছে। ভালুকা পৌর এলাকা ও তিতাস কার্যালয়ের আশপাশে গ্যাসের কিছুটা চাপ থাকলেও দূরবর্তী কারখানাগুলোতে প্রায় গ্যাস নেই।’’

শিল্প পুলিশের হিসাব অনুযায়ী ময়মনসিংহ শিল্পাঞ্চলে ২৯৩টি কারখানার মধ্যে ৯৯টি গ্যাসচালিত। বর্তমানে প্রায় সব গ্যাসচালিত কারখানাই সংকটে পড়েছে। জেনারেটর ও বিদ্যুৎ ব্যবহার করে সীমিত উৎপাদন সচল রাখার চেষ্টা করা হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। ফলে শিল্পাঞ্চলজুড়ে উৎপাদনব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

জ্বালানি সংকট নিয়ে বিকেএমইএর উদ্বেগ

বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুত ও রফতানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘কারখানা বন্ধের প্রকৃত চিত্র বুঝতে হলে স্থায়ী বন্ধ, সাময়িক ছুটি এবং উৎপাদন কমিয়ে দেওয়ার ঘটনাগুলো আলাদা করে দেখতে হবে। গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকটের কারণে সাম্প্রতিক সময়ে কিছু কারখানা কয়েক দিনের জন্য ছুটি দিলেও এটিকে স্থায়ী বন্ধ বলা ঠিক হবে না। তবে দীর্ঘদিন ধরে জ্বালানি সংকট চলতে থাকলে উৎপাদন ব্যাহত হবে, কারখানার আর্থিক চাপ বাড়বে এবং শেষ পর্যন্ত কর্মসংস্থানও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।’’

তিনি বলেন, ‘‘গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকটে অনেক কারখানা পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। উৎপাদন কমে যাওয়ার পরও শ্রমিকদের বেতন, ব্যাংকঋণের কিস্তি, গ্যাস-বিদ্যুতের বিলসহ অন্যান্য স্থায়ী খরচ বহন করতে হচ্ছে। অন্যদিকে বিকল্প জ্বালানি হিসেবে ডিজেল, এলপিজি বা সিএনজি ব্যবহার করলে উৎপাদন ব্যয় আরও বেড়ে যাচ্ছে। অথচ আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের সঙ্গে আগেই নির্ধারিত দামের কারণে এই অতিরিক্ত ব্যয় সব সময় পণ্যের দামের সঙ্গে সমন্বয় করা সম্ভব হচ্ছে না।’’

মোহাম্মদ হাতেম আরও বলেন, ‘‘কারখানা টিকিয়ে রাখা এবং শ্রমিকের কর্মসংস্থান রক্ষা এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। জ্বালানি সংকট দ্রুত স্বাভাবিক না হলে অনেক দুর্বল ও আর্থিক সংকটে থাকা কারখানা আরও বেশি চাপে পড়বে। তাই শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি সংকটে থাকা, আংশিক বা সম্পূর্ণ বন্ধ কারখানাগুলো পুনরায় চালুর জন্য আর্থিক সহায়তা ও নীতিগত উদ্যোগ প্রয়োজন।’’

কারখানা বন্ধ মানে শুধু উৎপাদন বন্ধ নয়

একটি কারখানা বন্ধ হওয়ার প্রভাব শুধু মালিকের ব্যবসার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে হাজার হাজার শ্রমিকের পরিবার, বাড়িভাড়া, সন্তানের পড়াশোনা, ব্যাংক ও এনজিও ঋণ, স্থানীয় দোকানপাট এবং আশপাশের ক্ষুদ্র অর্থনীতি।

গাজীপুর, সাভার ও আশুলিয়ার শিল্পাঞ্চলে কোনো কারখানা বন্ধ হলে এর প্রভাব দ্রুত আশপাশের বাসা, দোকান, পরিবহন ও স্থানীয় বাজারে ছড়িয়ে পড়ে। সবচেয়ে বড় সংকট তৈরি হয় তখনই, যখন চাকরি হারানোর পরও শ্রমিককে বকেয়া বেতন ও আইনগত পাওনা পেতে মাসের পর মাস অপেক্ষা করতে হয়।

পড়ুন: সন্তানের নামে সম্পত্তি, বাবা-মায়ের আজীবন ভোগ—নতুন আইনে কী বদলাল?

আর/

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন